বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়ক এখন মৃত্যুকূপ- ১৭ বছরে ১ হাজারটি দুর্ঘটনাঃ ১৫৫০ জন নিহত, ২০০০ জন আহত

সংবাদটি পরতে 4 মিনিট সময় লাগবে
বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়ক এখন মৃত্যুকূপ- ১৭ বছরে ১ হাজারটি দুর্ঘটনাঃ ১৫৫০ জন নিহত, ২০০০ জন আহত

PHOTO- 09শাহজাদপুর প্রতিনিধিঃ সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের ছয়দাবাদ-নলকা এলাকার ১৭ কিলোমিটার সড়ক মৃত্যুকুপে পরণত হয়েছে। এ সড়কে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে পরিবহণ দুর্ঘটনা। এতে হতাহতের মিছিলে যোগ হচ্ছে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ। ফলে এ সড়ক দিয়ে চলাচল বিপদজনক তো বটেই এই সড়কটি এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বেপরোয়া ও দ্রুত গতিতে যানবাহন চলাচল, নিয়ম না মেনে হুটহাট ওভারটেক, চালকদের অসাবধানতাসহ, চালকদের তন্দ্রাচ্ছন্নতা, কড্ডার মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওভার বীজ না থাকা, ছোট ছোট সংযোগ সড়কে চলাচলকারী যানবাহন নিয়ম না মেনে সড়ক পারাপারসহ নানা কারণে ঘটছে একই দুর্ঘটনা। এ সড়কটি ৪ লেনে উন্নীত ও রোড ডিভাইডার স্থাপন করলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমবে বলে গাড়ীচালক, পুলিশ প্রশাসন ও মালিক-শ্রমিক নেতারা দাবী করেছেন।

এলাকাবাসী বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম এলাকা থেকে নলকা পর্যন্ত মহাসড়কটি ৪ লেনের দীর্ঘ দিনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে যোগাযোগ ও পরর্বতী সময়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যতবার সিরাজগঞ্জে এসেছেন ততবারই এ মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সে ঘোষণা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়নি। স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, ৪ লেনে উন্নীত না হওয়ায় একই স্থানে বার বার ভয়াবহ সড়ক র্দুঘটনা ঘটছে।

বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের কড্ডার মোড় পুলিশ ফাঁড়ির এক হিসাব মতে এই সড়ক দিয়ে প্রতি মিনিটে গড়ে ২৬টি যানবাহন চলাচল করে। তাতে সড়কের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী ৪ গুণ বেশী গাড়ী চলাচল করছে। অতিরিক্ত গাড়ী চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ। যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এই সংযোগ সড়কে কমপক্ষে ১ হাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১ হাজার ৫৫০ নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ২ হাজার মানুষ। এতে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে কমপক্ষে ৫০০জন। স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অন্তত ৫০০ পরিবার। তবে সরকারের হিসাবে এ সংখ্যা অনেক কম। চলতি মাসে এই সড়কে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ২০ জন।

এক সূত্রে জানা যায়, যমুনা সেতুর পূর্ব এবং পশ্চিমে থানা স্থাপিত হওয়ার আগে এসব এলাকা টাঙ্গাইল এবং সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন থানার অংশ ছিল। যে কারণে দুর্ঘটনায় হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই। এছাড়া দুর্ঘটনায় নিহত হলেও থানায় মামলা দায়ের করা হয়নি এমন ঘটনার সংখ্যাও অনেক। সড়ক জুড়ে নেই কোন সিগন্যাল লাইট কিংবা পারাপারের জন্য কোন জেব্রা ক্রসিং। এর পাশাপাশি চলাচলকারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ট্রাফিক ব্যবস্থাও অপ্রতুল। সয়দাবাদ, কড্ডার মোড়, সদানন্দপুর, সিরাজগঞ্জ রোড, নলকা এলাকায় গুটি কয়েক ট্রাফিককে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও তারা দায়িত্ব পালনের চেয়ে যানবাহন চালকদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণে বেশী ব্যস্ত থাকেন এমন জোরালো অভিযোগ চালকদের।

১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনা সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর তা যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। এক সময়ে উত্তরবঙ্গ-ঢাকা চলাচলকারী সব যানবাহন আরিচা-নগরবাড়ী ফেরী দিয়ে পাড়াপাড় হতো। সেতু চালুর পর থেকে অতি সহজে ও কম সময়ে চলাচলের জন্য উত্তরাঞ্চল-দক্ষিণাঞ্চলগামী সকল যানবাহন এই রুটকে বেছে নিয়েছে। এ কারণে উত্তরপদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী এই সড়কটি এখন অন্যতম ব্যস্ত সড়কে পরিণত হয়েছে। কিন্তু চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যানুপাতে প্রয়োজনীয় সিগন্যাল পদ্ধতি, স্প্রীড ব্রেকার নেই। অপ্রতুল ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রায় সময়ই।

১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সংযোগ সড়কের প্রশস্ততা বেশী হলেও মাঝখানে কোন রোড ডিভাইডার নেই । এ কারণে সেতু পাড় হয়েই যানবাহন চালকরা দ্রুত গতিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে বেপরোয়াভাবে গাড়ী চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসময় অন্যান্য গাড়ীকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীদমুখী যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এমনকি যমুনা সেতুর উপর দিয়ে একইভাবে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অনেক যানবাহন। সেতুর দুইপ্রাস্তে ওজন স্টেশনের ব্যবস্থা থাকলেও গাড়ীর গতি নিয়ন্ত্রণে কোন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া মহাসড়কের পাশাপাশি ঘনবসতি এবং হাট-বাজার সংলগ্ন এলাকায় স্প্রীড ব্রেকার না থাকায় পথচারী চাপা পড়ার ঘটনা বেড়ে গেছে।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কটি থেকে সিরাজগঞ্জ জেলা সদরের দূরত্ব অন্তত ১১ কিলোমিটার। এ কারণে দুর্ঘটনার খবর সঠিক সময়ে হাসপাতালসহ জেলা সদরে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তাছাড়া সংযোগ সড়কের আশেপাশে কোন হাসপাতাল না থাকায় দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক আহত যাত্রী হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা যান। এই সংযোগ সড়কে দুর্ঘটনা কবলিত যাত্রীদের দ্রুত চিকিৎসার নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে কড্ডার মোড়ে ট্রমা হাসপাতাল নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন দুর্ঘটনা কবলিত আহত যাত্রীরা। সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে দুর্ঘটনা কবলিতদের চিকিৎসার জন্য ট্রমা হাসপাতাল নির্মাণ করলে তা কোন কাজে আসছে না। দূরত্বের কারণে যাত্রীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে আহতদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েই চলছে। বর্তমানে ট্রামা হাসপাতালে কয়েকটি কক্ষে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের ক্লাস করানো হচ্ছে। এতে আহত রোগীদের জরুরী সেবা প্রদান কার্য ব্যহত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে কোনাবাড়ী, সিমান্ত বাজার, ও বাগবাড়ী এলাকায়। কোনাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-ঈশ্বরদী রেলপথ হওয়ায় এখানে রয়েছে সুবিস্তৃত একটি ফ্লাইওভার। এই ফ্লাইওভারের কারণে সমনের যানবাহনগুলো চালকদের দূর থেকে দেখতে সম্ভব হয় না। যে কারণে এই ওভার ব্রীজের দু’পাশে ঘটছে বেশী দুর্ঘটনা।

সিরাজগঞ্জ, কড্ডা-শাহজাদপুর জোনের ট্রাফিক পুলিশ ইন্সপেক্টর গোলাম কিবরিয়া জানান, কোণাবাড়ি ও সিমান্ত বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হচ্ছে এ সড়কের এ স্থানে একাধিক বাঁক রয়েছে। অধিকমাত্রায় এই বাঁক থাকার কারণে এবং তার পাশেই ৬ নং ব্রীজ অবস্থিত। এই ব্রীজটি অতি সংকীর্ণ হওয়ায় একই সাথে ২টির বেশি গাড়ি যাতায়াত করতে পারে না। যখনই ৩টি গাড়ী যাওয়ার চেষ্টা করে কখনই এ দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য ড্রাইভারদের সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন ১২টি কারণে এই সড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়েছিলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হল। সড়কের ধারে হাট বাজার বন্ধ, গাড়ীর গতি নিয়ন্ত্রণ, ফ্লাইওভার ও ডিভাইডার নির্মাণ করা হলে দুর্ঘটনার সংখ্যা হ্রাস পাবে। এই কাজগুলো অতি দ্রুত করা জরুরী বলে তিনি মনে করেন।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরো পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বশেষ

সর্বোচ্চ পঠিত

ছবিঃ প্রতীকী

যমুনায় নৌকাডুবি, ৩ জনের লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩০

সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিন জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ হয়েছেন ইঞ্জিনচালিত নৌকাটির...

ছবিঃ মোঃ সবুজ হোসেন

উল্লাপাড়ায় করোনায় ঈদ উদযাপন

মোঃ সবুজ হোসেন (পূর্ণিমাগাতী) উল্লাপাড়া প্রতিনিধিঃ সারা বিশ্বা যখন করোনায় কাতর, স্থবির হয়ে পরেছে অর্থনিতির চাকা ঠিক তখনই বিশ্বে আসলো...

বেতন ও বোনাসের দাবিতে দোকান কর্মচারীদের বিক্ষোভ

বেতন ও বোনাসের দাবিতে দোকান কর্মচারীদের বিক্ষোভ

সিরাজগঞ্জ শহরের শপিং মল খোলা থাকলে মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও নিজেদের লাভের কথা বিবেচনা করে দোকান, বিপনী বিতান,...

সিরাজগঞ্জে ট্রাক খাদে পড়ে স্বামী-স্ত্রীসহ নিহত ৪

উল্লাপাড়ায় সেতুর রেলিং ভেঙে ট্যাংক লরি খালে

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্বদেলুয়া পুরাতন সেতুর রেলিং ভেঙে তেলবাহী একটি ট্যাংক লরি খালে উল্টে পড়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের এই দুর্ঘটনায় লরির...

আফগানিস্তানের মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলা, নিহত ৮

আফগানিস্তানের মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলা, নিহত ৮

আফগানিস্তানের পারওয়ান প্রদেশে একটি মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবারের এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।...

x
%d bloggers like this: