ঢাকার ফুটপাতে সারি বেঁধে বসে থাকা মানুষগুলো কারা?

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

ফুটপাতজুড়ে বসে আছেন সারি সারি মানুষ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা নিম্নবিত্ত। প্রায় ফাঁকা সড়ক ধরে ছুটে আসা কোনো গাড়ি যদি কোনো কারণে গতি কমায়, তখনই দলে দলে গাড়িটির দিকে ছুটে আসছে মানুষগুলো। আশা কিছু একটা সাহায্য হয়তো জুটবে।লকডাউনের মধ্যে জরুরি প্রয়োজনে ঢাকার যেসব মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে হয়, তাদের হয়তো চোখে পড়ে থাকবে এমন দৃশ্য।

এমন ঘটনাও ঘটতে দেখা যাচ্ছে, হয়তো সত্যিই গাড়িতে করে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসেছেন কেউ, কিন্তু একেবারেই সামাজিক দূরত্ব না মানা এই মানুষগুলোর ধাক্কাধাক্কি সামাল দিতে না পেরে ত্রাণ বিতরণ বন্ধ রেখেই চলে যেতে হচ্ছে দাতাকে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর দুই মাস পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে এক মাসেরও বেশি সময় কার্যত অচল ছিল পুরো দেশ। এই সময়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি এই দৃশ্যটিও আজকাল আকছার চোখে পড়ছে।

এ ধরনের জমায়েত খুব বেশি দেখা যায়, সুপারশপ বা দোকানের সামনে, কিংবা রাস্তার মোড়গুলোতে।

সরেজমিন জাহাঙ্গীর গেট
মিরপুর থেকে গুলশানে অফিস যেতে আমাকে অতিক্রম করতে হয় ঢাকা সেনানিবাসের মূল ফটক, যেটি জাহাঙ্গীর গেট নামে ঢাকাবাসী চেনেন। অনতিদূরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিস এবং স্থাপনা আছে এই এলাকায়। সড়কটি ভিআইপি, অর্থাৎ যন্ত্রচালিত যানবাহনই শুধু চলতে পারবে। রিকশা-ভ্যানের মতো যানবাহন চলবার সুযোগ নেই।

প্রতিদিন অফিস যাওয়ার এবং বাসায় ফেরার পথে আমি দেখি এখানকার ফুটপাতে এমন মানুষের জটলা। যারা বসে আছেন তাদের সবাই নারী। দেখে কাউকেই ভিখিরি বলে মনে হলো না। করোনাভাইরাসের কারণে মাস্কও  পরেছেন বেশিরভাগ। তবে চোখে সাহায্যের আকুতি নজর এড়িয়ে যাওয়ার মতো না। কড়া রোদ উপেক্ষা করে রাস্তার ধারের দেয়াল ঘেঁষে বসে আছেন তারা। কৌতূহল থেকেই সিদ্ধান্ত নেই, গাড়ি থামিয়ে নামব। তাদের সাথে কথা বলব।

তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, গাড়ি দেখলেই তারা সাহায্য দাতা মনে করে সামাজিক দূরত্বের কথা ভুলে ছুটে আসেন। তাই একটু দূর থেকে নেমে হেঁটেই এগোলাম।

‘কাজ দেন নাইলে খাওন দেন’
কথা হচ্ছিল ফাতেমার সাথে। মধ্যবয়সী নারী। বাড়ি উত্তরাঞ্চলীয় নওগাঁ জেলায়। পেশায় গৃহপরিচারিকা। কে না জানেন, লকডাউন শুরু হতে না হতেই ঢাকায় যারা সবার আগে জীবিকা হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে আছেন খণ্ডকালীন গৃহপরিচারিকারা।

জানতে চাই, ফুটপাতে কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন ফাতেমা?
জবাব এলো, ‘৫-১০ টাকা দেয়, চাল দেয়, তাই আসছি।’

-ত্রাণ পান নাই, সরকার তো ত্রাণ দিচ্ছে?
ফাতেমা জানালেন, ত্রাণ পাননি তিনি। একজন ভোটার আইডি নিয়ে আসতে বললেও ত্রাণ দেয়নি।

একটু দূরে ওড়না দিয়ে মাথা আর মুখ ঢেকে বসে ছিলেন নাসিমা। নাসিমা তার ছদ্মনাম। নিজের নাম প্রকাশে ঘোরতর আপত্তি এই তরুণীর। তিনিও পেশায় গৃহপরিচারিকা। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় জড়িয়ে এলো তার কণ্ঠ। বরিশালের মেয়ে নাসিমার দুই সন্তান, মা আর ছোট ভাই থাকে গ্রামে। ঢাকা থেকেই খরচ পাঠাতে হয় তাদের জন্য। তার পাঠানো টাকায় গ্রামের সংসার আর সন্তানদের পড়াশোনা চলে। এখন নাসিমার কোনো কাজ নেই। বলছিলেন, সাহায্য চাইতে গিয়েও মারধরের শিকার হতে হচ্ছে।

‘আমরা তো কাজ করে খাইতে চাই, ভিক্ষা করতে চাই না। কাজ দেন, নাইলে খাওন দেন। দূরে থাকেন, কিন্তু খাওন দিয়া যান।’

নাসিমাকেও ত্রাণ দেবেন বলে পরিচয়পত্র আর মোবাইল নাম্বার নিয়েছিলেন একজন। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষা করেও নাসিমা পাননি সেই কাঙ্ক্ষিত ত্রাণ।

ফুটপাতে অপেক্ষা করে দিনে কত টাকা রোজগার হয়?
ছোট একটি ব্যাগ খুলে দেখান নাসিমা। দুই টাকা আর পাঁচ টাকার দু-তিনটি নোট। নাসিমা বলছিলেন বয়স অল্প বলে কেউ সাহায্য করতে চায়না।

‘আমারে ত্রাণ দেয় না। বলে কাজ করে খেতে। আমরা তো কাজ করতেই চাই। কাজ দেন। আমরা ভিক্ষা করতে চাই না। আপনারা কাজ দেন না, ত্রাণ দেন না, আমাদের কি ক্ষুধা নাই?’

চাকরি করেও যে সংসার চলে না
নাসিমার সাথে যখন কথা বলছিলাম তখন দূর থেকে হেটে আসছিলেন পেয়ারা বেগম। আমাকে নাসিমার সাথে কথা বলতে দেখে নিজেই কথা বলার আগ্রহ দেখালেন। পেয়ারা বেগম জানালেন, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রাস্তা ঝাড়ু দেয়ার কাজ করেন তিনি। অস্থায়ী এই চাকরির মাসিক বেতন ১২ হাজার টাকা। বাড়িতে অসুস্থ স্বামী, এক মেয়ে আর দুই ছেলে রয়েছে তার। পেয়ারা বেগম আর বড় ছেলের মিলিত আয়ে সংসার চলতো তাদের।

ধোলাইপাড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ভালোই কাটছিল দিন। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর, ছেলের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। একমাত্র আয় এখন পেয়ারা বেগমের মাসিক বেতন। কিন্তু তাতে সংসার চলে না। উপায় না দেখে সাহায্যের আশায় রাস্তায় নেমেছেন তিনি। তবে সেটিও জুটছে না ঠিকমতো।

‘আমি গেলে বলে আপনি তো সরকারি চাকরি করেন, আপনি পাবেন না। কিন্তু আমি বুঝাইতে পারি না যে, আমার সংসার চলে না। কেউ দেয় না, যা হয় তাই খাই। আমাদের কথা শোনার কি আর মানুষ আছে?’

কথা দিয়ে কী পেট ভরে?
নাসিমা বা পেয়ারা বেগম- কথা বলার সময় কেউই কান্না ধরে রাখতে পারেননি। কণ্ঠে কান্নার রেশ না তেমন একটা না থাকলেও চোখ গড়িয়ে ঠিকই নামছিল অশ্রু। জানান দিচ্ছিল, কতটা অনিচ্ছা নিয়ে ত্রাণের খোঁজে নেমেছেন তারা।

তবে, তারা ছাড়াও দেয়ালের ধার ঘেঁষে বসে থাকা আরও অনেকে ছিলেন যারা আমি সাংবাদিক জেনে আমার সাথে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছিলেন।

কেউ কেউ বলেই বসলেন, ‘ত্রাণ আনলে দেন। কথা দিয়ে তো আর পেট ভরবে না।’

শুধু জাহাঙ্গীর গেট নয়, রাজধানীর এমন অনেক এলাকায় এখন এ ধরণের জমায়েত সাধারণ ঘটনা। শুধু নারী নয়, পুরুষ, বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, শিশু-কেউই বাদ পড়েননি ত্রাণের আশায় থাকা এই জমায়েত থেকে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চেয়েও তাদের কাছে ক্ষুধার তাড়নাটা অনেক বেশি।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.