বিমূর্তরীতি: নাট্যচর্চার জগতে অশনি সংকেত

সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, ইস্কাইলাস, মার্লো, শেক্সপিয়ার, গ্যাটে, ইবসেন, চেকভ, বার্ণার্ড শ, পিসকাটর, ব্রেশট, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সবাই বলেছেন নাট্য মঞ্চায়নের একটি উদ্দেশ্য থাকতে হবে। কিন্তু কিছু ব্যক্তিরা বলতে চান নাটক মানে শিল্পসাধনা। শিল্পসাধনা ছাড়া ভিন্ন লক্ষ্য থাকার দরকার নেই। নাট্যকার গার্সিয়া লোরকা সবকিছু দেখে শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারার নাট্যচিন্তা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলো নাট্যব্যক্তিত্বদের নিজেকে হাজির করবার ও দম্ভ প্রকাশ করবার জায়গা। দর্শকদের আনন্দদানের জন্য সেখানে কিছুই ছিল না। নিরীক্ষার নামে নাট্য প্রযোজনা একপর্যায়ে এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল শুধুই মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ এবং দর্শকদের ভুলে গিয়ে শিল্পীরা শুধু নিজেদের মধ্যে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে দুর্বোধ্য কথা বলতেন। নাট্যব্যক্তিত্বরা ধরে নেন তাঁরা যা বলবেন যা কিছু করবেন বা দেখাবেন দর্শক যেন তাই দেখতে বাধ্য থাকবে। রূপকধর্মী, নাটকীয় ভঙ্গি, প্রকাশবাদ, পরাবাস্তববাদ, ভবিষ্যতবাদ প্রভৃতি ভঙ্গি নাট্যকর্মীদের ক্রমশ অন্তর্মুখী করে তোলে। স্বভাবতই দর্শক এ ধরনের নাট্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো।

বিশ শতকের নাট্যপ্রচেষ্টার বিভিন্ন পর্ব সিম্বলিজম বা রূপকভঙ্গি, থিয়েট্রিক্যালিজম বা নাটকীয় ভঙ্গি, এক্সপ্রেসনিজম বা অভিব্যক্তিবাদ ও সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সময়ে, বিশের দশক থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের আপাতসুস্থ দেহে অবক্ষয়ের চিহ্ন দেখা গিয়েছিল। টাকা ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অসুস্থতা, উদার মানবতাবাদের অপমৃত্যু, বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ক্ষতিকর প্রভাব কিছু চিন্তাবিদ বা নাট্যকারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। কিন্তু তাঁরা সমাজের এইসব ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতে ব্যর্থ হলেন। নাটকে শুধু তাঁদের ক্ষোভ ধরা পড়লো। সেখান থেকেই নাট্যকারদের পুরানো ধ্যান-ধারণা বা বিশ্বাসের জগতে ভাঙন দেখা দেয়, ভাঙন থেকে বিভ্রান্তি; সেই বিভ্রান্তি থেকেই জন্ম নিলো স্বপ্নের জগতে পলায়নবাদিতা, বিমূর্ত অবাস্তবতার দরজায় প্রবেশ। কিছু কিছু শিল্প-সাহিত্য বা নাটক হয়ে উঠলো শিল্পীর বিচ্ছিন্নতাজনিত নিঃসঙ্গতার একান্ত প্রকাশ। সমাজের বৃহত্তর মানুষের সাথে যোগাযোগের যে দায়বদ্ধতা এতোদিন শিল্পের ছিল, সেটা হয়ে গেল তখন অপ্রাসঙ্গিক। বিমূর্তবাদীরা সমাজ-রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমশই তাঁরা অবাস্তব বা বাস্তব-বিপরীত সমাজ সম্পর্কহীন মানসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বিশ শতকের শুরুতে রূপকধর্মী, নাটকীয় ভঙ্গি, প্রকাশবাদ, পরাবাস্তববাদ, ভবিষ্যতবাদ, ডাডাইজম; এই যে বিভিন্ন ধারা দেখতে পাওয়া যায় এর সমর্থকরা সকলেই শেষ পর্যন্ত শিল্পের জন্য শিল্প তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং তার পক্ষে প্রচার চালাতে থাকেন নানারকম নিরীক্ষার নামে। ভবিষ্যতবাদীরা যাবতীয় পুরানো নাট্যরীতি ধ্বংস করে যুক্তিবিহীন, ঐতিহ্যহীন, নান্দনিকতাবিহীন যে নাট্যরীতি নির্মাণের কথা বলেছেন তার লক্ষ্য হবে দর্শকদের উত্তেজিত করা, দর্শকদের স্নায়ুকে নির্মমভাবে আঘাত করা। নাট্যশালাকে একটি ব্যায়ামাগারে পরিণত করা। গতি ও যান্ত্রিক কলাকৌশলে যে নাট্যধারা গড়ে উঠবে তার কোনো নির্দিষ্ট রূপ থাকবে না, অথবা হবে বহু রকমের সমন্বিত রূপ। ভবিষ্যতবাদীদের পাশাপাশি দেখা মিললো ডাডাইস্টদের। রাজনৈতিক নাট্যচিন্তার পথিকৃত পিসকাটর নিজেও প্রথম এই ডাডাইস্টদের সাথে ছিলেন। সবকিছুতেই অবিশ্বাস ছিল ডাডাইজমের দর্শন। ডাডাইস্টরা নিজেদের আদর্শ সম্পর্কে বলেছেন যে, ডাডা হচ্ছে যুক্তিকে বিলুপ্ত করা, স্মৃতিকে বিলুপ্ত করা, ভবিষ্যৎকে বিলুপ্ত করার জন্য। ডাডাইস্ট নাটকে ছিল না কোনো যুক্তিবহ আখ্যান, ছিল উদ্ভট, অর্থহীন ও অবোধ্য সংলাপ। মানুষের আত্মানুসন্ধানে খুবই নেতিবাচক পথ ধরে অগ্রসর হয়েছিল ভবিষ্যতবাদী ও ডাডাইস্টদের নাটকগুলো। পিসকাটর পরবর্তীকালে লিখেছেন, এদের নাটকগুলো ছিল ভীষণভাবে প্রতিক্রিয়াশীল।

বিমূর্ত যে নাট্যধারা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে ঝোঁকের সূত্রপাত, সে-ধারার নাটক নির্মাণের বিপুল জোয়ার দেখা যায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই শোনা যায় অস্তিত্ববাদী নাটক, ক্রুদ্ধ নাটক, যন্ত্রণার নাটক এবং অ্যাবসার্ড বা উদ্ভট বা কিমিতিবাদী নাটকের নতুন নতুন নাম। বর্তমান কাল পর্যন্ত তার বিস্তার। কিমিতিবাদ মূলত শিল্পীর বিচ্ছিন্নতাজনিত নিঃসঙ্গতার একান্ত ব্যক্তিগত প্রকাশ। সমাজের বৃহত্তর মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগের যে দায়বদ্ধতা এতোদিন শিল্পের ছিল, এখন সেটি অপ্রাসঙ্গিক। শিল্পী আর সমাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান না।

বিমূর্ত, বেখাপ্পা বা এই অসম্ভব নাটকটি আসলে কী? ইয়োনেস্কো যিনি এই নাট্যধারার পথিকৃতদের একজন, তিনি নিজে এই বেখাপ্পা বা অসম্ভব নাটকের একটি সংজ্ঞা দিতে চেষ্টা করেছেন। সে সংজ্ঞা অনুযায়ী, এঁরা প্রত্যেকেই নাটকের জগতে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণ দুটি ক্ষেত্রেই যাঁরা কোনো যৌক্তিকতার ধার ধারেন না। সেই বিশ্বাস থেকে বেখাপ্পা নাটকের দর্শন শূন্যতার দর্শন, অবক্ষয়ের দর্শন। উদ্দেশ্যহীনতাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার লিখছেন, ‘আমি কোনো দর্শকের কথা মনে রেখে নাটক লিখি না। আমি শুধু লিখি নিজের তাগিদে।…যদি কেউ আকস্মিকভাবে সেই নাটকে অংশগ্রহণ করে সেটা নেহাতই দুর্ঘটনা।’ নাটক এঁদের হাতে উদ্দেশ্যহীন অবাস্তবতায় পরিণত হলো।

দুটো বিশ্বযুদ্ধকে এঁরা দেখেছেন মৃত্যুর ইতিহাস হিসাবে। বিশ্বযুদ্ধগুলো শুধু মৃত্যুর ইতিহাসই ছিল না, সেটা ছিল মানুষের বেঁচে থাকারও ইতিহাস। কোটিকোটি মানুষের বাঁচার উদ্যমকে না দেখে তাঁরা শুধু তার মধ্যে মৃত্যু আর হতাশা খুঁজেছেন। বিশ্বের কোটিকোটি মানুষের মুক্তি সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। সমাজ বিজ্ঞানকে তাঁরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। বিমূর্ত রীতির নাট্যকাররা তাই মানুষের যে চিত্র এঁকেছেন সেখানে মানুষ খুব ক্ষুদ্র জীব, সর্বদা অনিশ্চিতের মধ্যে বিরাজমান। এডওয়ার্ড এলবীর “চিড়িয়াখানার গল্প” নাটকে দেখা যায় নায়ক মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে অবশেষে আত্মহননের বাসনায় উদ্বেল হয়। স্যামুয়েল বেকেট তাঁর “গডোর প্রতীক্ষায়” নাটকে দেখান, মানুষের জীবনে সত্যিকার কখনো কিছু ঘটে না, মানুষ যার জন্য অপেক্ষা করে সে আসে না। শুধুমাত্র এভাবে হতাশার কথাই ব্যক্ত করেছেন তাঁরা, ইতিবাচক দিকে দৃষ্টি ফেরাননি। ইতিবাচকভাবে মানুষ যে শ্রম দিয়ে, সংগ্রাম করে বিশ্বকে সচল রেখেছে; এই সত্য যেন তাঁদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। তাঁরা দেখতে পান না সে মানুষকে, যে মানুষ আপন ভাগ্যকে শ্রমের হাতে নির্মাণ করে চলেছে। স্যামুয়েল বেকেটের চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নাটক কিংবা মানবিক নাটক বলতে চায় মানুষের সুখ, স্বাধীনতা, সৃজনী প্রতিভা দিনে দিনে বিকশিত হচ্ছে। জীবন সেখানে অর্থহীন নয়।

মানুষ তার মেধা কর্ম শ্রম ও চিন্তার দ্বারাই গুহামানব থেকে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে, তথাপি বিমূর্ত ধারার নাট্যকারদের কাছে বিশ্ব এক সীমাহীন শূন্যতার মুখোমুখি দণ্ডায়মান। জর্জ টমসন মনে করেন, নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম সমাজের বিকাশকে না বোঝার ব্যর্থতা থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিবাদীরা এই নাট্যধারাকে সমর্থন করতে এগিয়ে এসেছিল এই লক্ষ্য থেকে যে, যদি নাট্যকাররা সমাজের সব ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন তাহলে সেটা পুঁজিবাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিণাম বয়ে আনবে। কারণ নাট্যকাররা ধনীকতন্ত্রের চরিত্র এবং চেহারা নাটকে প্রকাশ করতে থাকলে সমাজ বিপ্লব ঘটে যাবে। ফলে সমাজ বিপ্লবকে ঠেকাতে কিমিকিবাদী নাটককে তারা উৎসাহ জোগালেন, টাকা সরবরাহ করলেন। কিমিতিবাদীরা নাটকের নামে উদ্ভট সব বিষয়ের আমদানি করলেন, যার মধ্যে থাকলো যৌন সম্পর্ক নিয়ে বাড়াবাড়ি। কিমিতিবাদী নাটকের নামে এলো ভঙ্গি নিয়ে নানারকম চমক, বিশৃঙ্খলা, মঞ্চে দাপাদাপি।

যখন বিমূর্ত নাট্যধারার উদ্ভব ঘটে তখন সেটা ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত একটি প্রবণতা। যাঁরা সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারেননি, তাঁরাই হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছিলেন। বিমূর্ত ধারার উদ্ভব সেখান থেকেই। পুঁজিবাদীরা এই নাট্যধারাকে তাঁদের শ্রেণীস্বার্থে ব্যবহার করার কথা ভাবলেন। বিমূর্তবাদের উদ্ভট নাট্যরীতিকে যুক্তিবাদী ও রাজনৈতিক নাট্যধারার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইলেন। বিমূর্তধারা টাকা ও প্রচার দুটোই পেলো পুঁজিবাদী পৃষ্ঠপোষকতার বদৌলতে। সেজন্য কিছুদিন তারা শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারলো নাট্যাঙ্গনে, যদিও তাদের পেছনে বৃহৎ দর্শক গোষ্ঠীর কোনো সমর্থন ছিল না। সাধারণ দর্শকরা প্রথম থেকেই ঐসব দুর্বোধ্য নাটক বর্জন করলো। দর্শকদের ধরে রাখতে তাই বিমূর্ত নাটককে নিত্য নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হলো। সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিণামে বিমূর্ত নাট্যশালা যৌনতা-নগ্নতা আর মাদকদ্রব্যের আখড়ায় পরিণত হলো।

নাট্য ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের একটি গ্রন্থ থেকে বিমূর্ত নাট্যরীতির একটি বর্ণনা এখানে তুলে ধরা যাক। নাটকটি ফরাসী দেশের জ্যঁ-জাক লেবেল পরিচালিত। নাটকের ঘটনা হচ্ছে, দুটি নগ্ন নারী দেয়ালে ছবি আঁকছে আর পরিচালক লেবেল নিজে মেয়ে দুটির নিতম্বে ছবি আঁকছেন। টি-ডি-আর পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে লেবেল এটাকে বললেন, নতুন নাট্যশালার আবির্ভাব। ভিন্ন একটি নাটকের বর্ণনা পাওয়া যায় এই গ্রন্থেই। দর্শকদের বলা হলো, ঘণ্টা বাজলেই সবাই উঠে দাঁড়াবেন, সব কাপড়-জামা খুলে ফেলবেন, উলঙ্গ হয়ে নাচবেন, তারপর পাশের ঘরে যাবেন। দর্শকরা তাই করলেন। পাশের ঘরে গিয়ে দেখলেন পর্দায় একটি নগ্ন নারীর চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে আর কক্ষের মধ্যস্থলে সেই নারীই সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় নৃত্য করছে।

কিমিতিবাদীদের বিভিন্ন নাটকে এভাবেই যু‌ক্তিবাদ‌কে, মানবিকতাকে বাদ দিয়ে যৌনতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিমিতিবাদী নাট্যকারদের বিভিন্ন নাটকে তাঁর উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিমিতিবাদী নাট্যকার ইয়োনেস্কো তাঁর শিক্ষাদান নাটকে দেখাচ্ছেন যে, নায়ক তার ছাত্রীকে অসংলগ্নভাবে বিবিধ বিষয় পড়াতে পড়াতে তাকে উদভ্রান্ত করে তুলে সঙ্গমের পথে নিয়ে যায়, তাকে ভোগ করে এবং অতঃপর তাকে হত্যা করে পরবর্তী ছাত্রীর জন্য মঞ্চে অপেক্ষা করে। পিকাসোর “আঙুলবদ্ধ বাসনা” নাটকে দেখানো হয় নারীর স্বমৈথুন-ক্রিয়া। নাটকের দুটো চরিত্রের নাম, বুড়ো আঙুলের মাথা এবং হোঁৎকা উদ্বেগ। যবনিকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে তরুণী অভিনেত্রী এসে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বসে এবং পুরো পাঁচ মিনিট ধরে কোনো একান্ত গোপনীয় শরীরধর্ম পালন করে। উৎপল দত্তের মতে, এই হচ্ছে তাদের নাটক, যাদের কাছে বেশ্যালয় আর নাট্যশালায় কোনো পার্থক্য নেই। নাটকের নামে এভাবেই পুঁজিবাদী দুনিয়ায় চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সুস্থ মানুষের দেখা মেলে না এঁদের নাটকে। মানুষকে সুস্থভাবে চিন্তা করতে দিতে চায় না এরা। ইয়োনেস্কোদের উদ্দেশ্যে ছিলো সমাজতান্ত্রিক দেশের বলিষ্ঠ নাট্য আন্দোলনের পথ রোধ করা, যাতে পশ্চিম ইউরোপে ব্রেশটদের রাজনৈতিক নাটকের প্রভাব ছড়িয়ে না পড়ে। বিকৃত যৌনতা প্রদর্শন করে রাজনৈতিক নাটকের বিরুদ্ধে নিজেদের নাটকগুলিকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন। মনে করা হয়েছিল, যুব সমাজকে এভাবেই যৌনতায় মাতিয়ে রাজনীতি থেকে বিপথগামী করা যাবে। বাস্তবে ব্যাপারটা তেমন সাফল্য পায়নি। কথা হলো, নাটক আর ‘সেক্সসোপ’ তো একরকম হতে পারে না। নাটক নিশ্চয় ভিন্ন কিছু।

কিমিতি-জ্যামিতি-দুর্মতি প্রভৃতি নানা দুর্বোধ্য নামের আড়ালে বিমূর্তবাদীরা বলতে চাইলেন; নাটকের কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য থাকা উচিৎ নয়। ইয়োনেস্কোরা বলেছিলেন, নাটক অর্থহীন হবে, বেকরা বলেছেন নাটকে ভাষাই থাকবে না। তাঁরা বললেন যে, যুক্তিবাদ বা বিজ্ঞাননিষ্ঠার কারণে শিল্প স্বনিয়মে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না, তার ওপর আরোপিত হয় আনুশাসন বা নিয়ন্ত্রণ, হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাস ও কল্পনা থেকে শিল্প দূরে সরে যায়। বিমূর্তরীতির সমর্থক বেক ও মালিনা বলতে শুরু করলেন, নাটকের কথাই হচ্ছে শিল্পের বাধা, সুতরাং কথা বাদ। তার পরিবর্তে চিৎকার, গোঙানি, বিদঘুটে ঘোৎকার, এইসব হবে নাটকের ভাষা। আর অভিনেতারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে নানা আকৃতি সৃষ্টি করবেন মঞ্চে, সেটাই হবে অভিনয়। সেইজন্যই জুলিয়ান বেকের নাটকে দর্শক দেখতে পেল, মঞ্চে এক অভিনেতা দাঁড়িয়ে আছে এবং আধ ঘণ্টা সে নির্বাক নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো। মঞ্চ ভর্তি সব লাশ। জুলিয়ান বেকের দার্শনিক চিন্তা এক মঞ্চভর্তি মৃতদেহে পরিণত হোলো। নাটক এখানেই শেষ।

নাট্যকার বোঝাতে চাইলেন পৃথিবীতে মৃত্যুই সব, মানুষ মৃত্যুতে রূপান্তরিত হবে। মৃত্যুই বাঁচবার পথ, মৃত্যুই আনবে অনন্তর বার্তা। মানুষ চতুর্দিকে অসম্ভবের প্রাচীরে বন্দী, অসম্ভবের পায়ে সে মাথা খুঁড়ে মরছে। মৃত্যুই জীবনের একমাত্র সত্য স্বরূপ, মৃত্যুই হলো জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা। যার অর্থ দাঁড়ায় মানুষ যা কিছু করছে সব কিছু অর্থহীন। সব কর্মের ফল শূন্য। মৃত্যুই শুধু সত্যি। দুঃস্বপ্ন, ভয়, আতংক এবং মৃত্যু ছাড়া পৃথিবীতে এঁরা আর কিছুই দেখতে পান না। মানুষের বিশাল কর্মের জগতের প্রতি এঁদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। উদ্ভট নাটকের জগৎ জড়, নিষ্ক্রিয়, হতোদ্যম মানুষের জগৎ; বিরাট বিশ্বপ্রকৃতির মাঝখানে যারা জন্মসূত্রেই অভিশপ্ত, কোণঠাসা আর হতাশ। অস্তিত্বের জটিল ঘূর্ণাবর্তে যারা কক্ষচ্যুত জ্যোতিষ্কের মতো উদভ্রান্ত এবং অসহায়। মানুষকে এভাবেই বিচার করেন এঁরা। মানুষের বিপুল কর্মযজ্ঞ এঁদের চিন্তার বাইরে থাকে বলেই পৃথিবীতে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই এঁদের নজরে আসে না। সেজন্য মানুষকে তাঁরা মৃত লাশ বলেই মনে করেন এবং সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য সংগ্রাম থেকে মানুষের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখতে চান, যে কাজটি পূর্বে গির্জার মাধ্যমে ঘটতো।

গির্জা মানুষকে মনে করতো স্রষ্টার ক্রীড়নক এবং ধর্মীয় নাটকগুলোতে তখন তাই প্রচার করা হতো। স্রষ্টার ক্রীড়নক মানে মানুষের নিজের কোনো শক্তি নেই সকলকে সেটা বিশ্বাস করতে অনুপ্রাণিত করা। মানুষ‌কে সংগ্রাম থে‌কে বিমুখ ক‌রে রাখার প্র‌চেষ্টা ছিল সেটা। ম‌নে করা হ‌তো মানু‌ষের ভ‌বিষ্যত পূ‌র্বেই লি‌খিত হ‌য়ে অা‌ছে, মানু‌ষের ভা‌গ্যে ঈশ্ব‌রের বিধা‌নে ভালমন্দ কিছু একটা ঘট‌বে। মানু‌ষের নি‌জের যেন তার বিপরী‌তে কিছুই করার নেই। বিমূর্তরীতির নাট্যধারাও সেই একই কাজ করে চলছে। মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনাকে সে অস্বীকার করে বসে আছে। ধর্মীয় নাটকে তবু আশার বাণী ছিলো, এদের নাটকে সেটুকুও নেই। মৃত্যু ছাড়া মানব জন্মের পেছনে এঁরা আর কিছুই দেখতে পান না। কিন্তু মানুষের ইতিহাস কখনই আত্মহননের ইতিহাস নয়। কিমিতিবাদী নাটক-এর প্রবক্তারা যতোই অগ্রগামিত্বের দাবি করুন না কেন, এর মূল তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে এর মধ্যে ভাব এবং রূপ উভয় ক্ষেত্রেই যা প্রকট হয় তাকে অনিবার্যভাবেই প্রতিক্রিয়াশীলমনস্ক বলতে হয়। পশ্চিমী দুনিয়ার এই কিমিতিবাদী শিল্পীরা বলেন, বিচ্ছিন্নতাবোধ কি বাস্তব নয়, সত্য নয়? মানুষ কি আজ একা হয়ে পড়ছে না এই যন্ত্রসভ্যতায়?

রাজনৈতিক নাট্যচিন্তকরা মনে করেন, নাটকের লক্ষ্য হবে দর্শকের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনা সৃষ্টি নি‌জের ভাগ্য পাল্টাবার জন্য। বিমূর্ত নাটকের প্রধান চরিত্ররা মানুষ বটে, সেই মানুষ নির্জন নিঃসঙ্গ নির্বাসিত; যারা কামুর “আউটসাইডার”-এর চরিত্র। কোনো ধরনের সংগ্রামেই তাই তাঁদের আস্থা নেই। মৃত্যুই সেখানে বাঁচবার পথ। কিমিতিবাদের এই হচ্ছে মূল দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার। নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রেও তাদের বক্তব্য একই রকম, বিশেষ করে স্যামুয়েল বেকেট, ইউজীন ইয়োনেস্কো, আর্থার আদামভ, জাঁ জেন্যে এবং হ্যারল্ড পিন্টার; এরাঁ প্রত্যেকেই নাটকের জগতে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণ দুটি ক্ষেত্রেই তাঁদের চিন্তাধারাকে স্বাধীনতা দানে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। সে স্বাধীনতার অর্থ তাঁরা কোনো যৌক্তিকতার ধার ধারেন না, পূর্ব-অভিজ্ঞতারও কোনো মূল্য নেই তাঁদের কাছে। নিজেরা তাঁরা নাটকে কোনোরকম কোনো উদ্দেশ্য প্রচারের যেমন বিরোধী, তেমনি অন্যরা কিছু প্রচার করুক তারও তাঁরা বিরোধী। নিজেদেরকে তাঁরা প্রমাণ করতে চান নিরপেক্ষ।

মূল সত্য হচ্ছে প্লেখানভ যা বলেন, বক্তব্যবিহীন শিল্পকর্ম বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। কিংবা যে কথা লুনাচারস্কি বলেছিলেন, শিল্পকর্ম জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সর্বদা লেখকের শ্রেণী-মনস্তত্ত্ব‌কে প্রতিফলিত করে। মনে রাখতে হবে, বাণিজ্যিক স্বার্থে বা নিছক বিনোদন দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাস্য-কৌতুককে যখন নাটক হিসাবে চালানো হয়, নিশ্চয় শিল্প হিসাবে বিবেচিত হয় না। কিন্তু কিমিতিবাদীদের ক্ষেত্রে একথা খাটবে না। কারণ কিমিতিবাদীরা শিল্প সৃষ্টি তো করেই না, পাশাপাশি শিল্প সৃষ্টির বিরুদ্ধে এক ধরনের দর্শন প্রচার করে। খুব জোরেসরে তারা বলছে, নাটকের কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না। নাটক যদি কথা না বলে, নাটক যদি মুক হয়ে থাকে শাসকদের বিরুদ্ধে বা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হবে না। শাসকরা এবং ধনীকরা নিরাপদে থাকবে।

আমরা শোকাহত...


শাহজাদপরের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ কামরুদ্দীন এহিয়া খান মজলিশ আর আমাদের মাঝে নেই

শাহজাদপরের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ কামরুদ্দীন এহিয়া খান মজলিশ (সারোয়ার) আর নেই (ই্ন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহী রাজিউন)। তিনি আজ (২৯ জুন) রাত ২টা ৩০ মিনিটে ঢাকার ধানমন্ডি কিডনি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন । তিনি কিডনি ও ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর, তিনি দুই সন্তানের জনক।

তিনি শাহজাদপুর উপজেলার ২বারের সাবেক সংসদ সদস্য, অগ্রনী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মিল্ক ভিটার সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।

শাহজাদপুর সংবাদ ডটকম, শাহজাদপুর সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন সহ বিভিন্ন সংগঠন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে শোকাভিভূত, আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

রকীব আহমেদ
চেয়ারম্যান
বায়োভিস্তা লিমিটেড

করোনা প্রতিরোধে চীন, ভিয়েতনামের ভূমিকা এবং বাংলাদেশ

রাহমান চৌধুরীঃ করোনা আক্রমণ প্রথম ঘটে চীনে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষে। চীনে সম্ভবত প্রথম সনাক্তর খবরটি আসে ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু সংক্রামিত হওয়া রোগটি যে করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত তা নিশ্চিত হয় ডিসেম্বর মাসের একত্রিশ তারিখে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা চীনে। প্রায় এককোটি চুয়াল্লিশ লক্ষ। সেই চীন বর্তমানে আক্রান্তের শীর্ষ তালিকার একুশ নম্বরে রয়েছে। চীনের বহু বহু পরে যেসব দেশ আক্রান্ত হয় এবং চীনকে ছড়িয়ে যায় সেসব দেশের মধ্যে রয়েছে সর্বপ্রথমে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের লোক সংখ্যা তেত্রিশ কোটির সামান্য বেশি। সম্পদের দিক দিয়ে আবার বিশ্বের শীর্ষে। চীনে যেখানে মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজারের কম, যুক্তরাষ্ট্রে সেখানে মৃতের সংখ্যা প্রায় একলক্ষ বাইশ হাজার। সারা বিশ্বে যে পরিমাণ আক্রান্ত আর মৃত, দুই ক্ষেত্রেই তার মোট সংখ্যার এক চতুর্থাংশ য়ুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় নব্বই লক্ষ আর যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা তেইশ লাখের বেশি। বিশ্বে মৃতের সংখ্যা প্রায় চার লক্ষ সাতষট্টি হাজার, যুক্তরাষ্ট্রে একলক্ষ বাইশ হাজারের সামান্য কম। চীনের আক্রান্তের সংখ্যা প্রথম দুতিন মাসে আশি হাজারে পৌঁছে গিয়ে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান প্রথম করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কারণে পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে বুঝে উঠতে তাদের নিশ্চয় সময় লেগেছিল। কিন্তু তারপরে তারা দু-তিমাসের মধ্যে করোনা ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে কী কারণে? যা বিভিন্ন বড় বড় অনেক দেশই পারেনি? নিশ্চয় সেটা নিয়ে ভেবে দেখার আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডাঃ ব্রুস চীনের সাফল্য নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। তিনি পঁচিশ জন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের একটি দল নিয়ে চীন ঘুর আসার পর যে প্রতিবেদন দেন তা খুব মনে রাখাবার মতো আর শিখবার মতো। তিনি বলেন, চীন সার্সের পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে খুব দ্রুত সবকিছু সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। সময় ক্ষেপন না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই ছিল, চীনের সাফল্যের মূল কারণ। সার্সের দিনগুলিতেও চীন সাতহাজার লোককে নিয়োগ দিয়ে দ্রুত একটা হাসপাতাল বানিয়েছিল। ঠিক একইরকম কাজ করে করোনার সময়ে, মাত্র ছয় দিনে এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করে আর একটি হাসপাতাল নির্মাণ করে তেরশো শয্যারআর একটি হাসপাতাল সম্পন্ন হয় পনেরো দিনের মধ্যে। অন্যান্য অনেক ভবনকেও করোনার চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করার জন্য নতুনভাবে সাজানো হয়েছিল। নিজের দেখা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন ডাঃ ব্রুস। চব্বিশ থেকে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি টেনিং সেন্টার আর ঘরোয়া খেলার মাঠকে হাসপাতাল বানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, চীনের কাছ থেকে যা শেখার আছে তা হলো দ্রুততা। কতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কতো দ্রুত কাজ আরম্ভ করা যায়। চীন দেখিয়েছে কতো দ্রুত রোগ সনাক্ত করা সম্ভব আর কতো দ্রুত সনাক্তকারীকে আলাদা করে ফেলা যায়। যারা সেসব সনাক্ত রোগীদের সংস্পর্শে এসেছিল চীন খুব দ্রুত তাদের খুঁজে বের করে। কতো দ্রুত সংক্রামিতদের সন্ধান করে সব আলামতগুলিকে উপস্থিত করা যায় সেজন্য বহু সরকারি নজরদারিরা ছিল।
চীনের সনাক্ত আশি হাজার রোগীর সংস্পর্শে যারা এসেছিল সকলকে খুঁজে বের করা হয়েছিল। সকল রকমভাবে তাদের উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিল জানার জন্য তারা সংক্রামিত হয়েছে কিনা বা সংক্রমণ ছড়াতে পারে কিনা। কর্মকর্তারা সংক্রামিতদের খুঁজে বের করতে খুব আগ্রাসীভাবেই প্রচেষ্টা নিয়েছিল। যাতে সংক্রামিতরা কিছুতেই রোগ ছড়াতে না পারে তারজন্য দায়িত্ববানরা ভীষণভাবে সক্রিয় ছিল। কাউকে সামান্য ছাড় দেয়া হয়নি এসব ব্যাপারে। ব্রুস বলেন, প্রত্যেকটা কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটা কাজের সংযোগ রক্ষা করা হয়। চীনের সবরকম কর্মবাহিনী সকলে মিলে সমস্যা সমাধান করার ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করেছিল। ফলে ভয়াবহভাবে সংক্রমণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়াকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে তারা নানারকম ভুল তথ্য যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক ছিল। কিছু মানুষ যেমন বলতে শুরু করে, ‘রসুন   করোনা রোগ সারাতে পারে’; এসব ভুল প্রচারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেরাই জনগণকে সচেতন করে। উহানে সে সময়ে মুঠোফোনকে অনুসরণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখা হয় তারা যাতে ঘরের বাইরে যেতে না পারে। সবকিছু নজরদারি করার জন্য বহু মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিছু কিছু অভিজ্ঞতা তারা সার্স ভাইরাস সংক্রমণের সময় থেকে লাভ করে। চীন সরকারিভাবেই কঠোর ছিল যাতে কেউ ঘর থেকে বের হয়ে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে।
করোনাকালে উহানের বন্দী দশায় দেড়কোটি মানুষকে অনলাইনে খাবারের নির্দেশ দিতে হয়েছে। আর সেটা সরকারিভাবে করা হয়েছে। সকলের কাছে খাবার পৌঁছে গেছে। নিশ্চয় সেখানে কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। হয়তো প্যাকেট খোলার পর কখনো কখনো সবগুলো সামগ্রি পাওয়া যায়নি। করোনাকালে চীনের উহানের বন্ধের দিনগুলিতে কেউ কিছু কেনাকাটা করার জন্য বের হতে পারেনি। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে চল্লিশ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে পাঠানো হয়েছিল। যাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী। কর্মীবাহিনী, পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ সবকিছু নতুনভাবে সাজানো হয়েছিল। রাজধানী হিসেবে উহান নিউইয়র্কের চেয়ে এলাকায় বড়। রাতের বেলা তখন রাজধানী উহানকে মনে হতো ভূতের শহর। শুধু সারা শহরে আলো জ্বলছে। কিন্তু প্রত্যেকটি ঘরে মানুষ ছিল আর তাঁদের প্রত্যেকের প্রয়োজন মতো সাড়া দেয়া জন্য জনশক্তি নিয়োজিত ছিল। সরকার ফেসবুক বা গণমাধ্যমগুলিকে কোনো গল্প ছড়াতে দেয়নি। যাতে কেউ এসব ব্যাপারে ভুল তথ্য না দিতে পারে সে ব্যাপারে সরকার ছিল কঠোর। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো কতোটা স্বচ্ছতার সঙ্গে দরকারি কাজগুলি কতো দ্রুত করা করা যাচ্ছে সে ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া। স্বচ্ছতার প্রতি প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হয়ে দ্রুত সংক্রামিতদের খুঁজে বের করা গেলে আর সেই মতো প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া গেলে সব চেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য স্পেন, ইতালী ইত্যাকার বিশটি দেশের সংক্রমণ চীনকে ছাড়িয়ে গেল কেন? যদিও তাদের জনসংখ্যা কম আর আক্রান্ত হতে শুরু করে বহু পরে। বহুদেশের মৃতের সংখ্যাও চীনের চেয়ে বেশি। ভারত ছাড়া বর্তমানে শীর্ষে থাকা উল্লেখিত প্রতিটি দেশের মৃতের হার চীনের চেয়ে অনেক বেশি। নিশ্চয় গবেষণা করে এর কারণ কখনো হয়তো বের করা হবে। কিন্তু বিশ্বের অন্য দেশের কথা বাদ রেখে বাংলাদেশ নিয়ে কিছুটা ভাবনা চিন্তা করার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সতেরো কোটির কম। মানে চীনের আটভাগের মাত্র এক ভাগ। বাংলাদেশে প্রথম সংক্রমণের সংবাদ পাওয়া যায় মার্চ মাসের আর্ট তারিখে। বাংলাদেশের করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলি সহ সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছিল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে তাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু সেই বাংলাদেশ যেখানে চীনের নয় সপ্তাহ পরে প্রথম সংক্রমনের খবর পাওয়া যায় এবং যার জনসংখ্যা চীনের সাড়ে আট ভাগের এক ভাগ, সেই দেশ কী করে চীনকে ছাড়িয়ে গেল? ব্যাপারটা খুব বিস্ময়কর নয় কি? বহু মানুষ হয়তো বলবেন চীন ধনী দেশ, সম্পদ বা প্রযুক্তির জোরে সংক্রমণকে দ্রুত ঠেকাতে পেরেছে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের পক্ষে তা সম্ভব নয়। প্রথম প্রশ্নটি হলো, চীনের চেয়ে উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্র তাহলে চীনের মতো সাফল্য কেন লাভ করতে পারলো না? দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাংলাদেশে সরকার কি স্বীকার করে, বাংলাদেশ দরিদ্র বা পশ্চাদপদ একটি দেশ? বাংলাদেশকে নিজেকে কানাডা এবং সিঙ্গাপুরের সঙ্গে নাকি তুলনা দেয়।
বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণে ইতিমধ্যেই কানাডাকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান রচনাটি প্রস্তুতকালে বাংলাদেশ করোনা আক্রমণের শীর্ষ তালিকার সতেরো নম্বরে আর কানাডা আঠারো নম্বরে। সিঙ্গাপুরকে করোনা সংক্রমণে বাংলাদেশ ডিঙ্গিয়ে এসেছে অনেক আগেই। সিঙ্গাপুর এখন শীর্ষ তালিকার একত্রিশ নম্বরে। বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণে এখন কানাডার প্রায় সমান। কিন্তু সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের তুলনামূলক একটি আলোচনা হতে পারে। কারণ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সিঙ্গাপুর বিশেষ একটি চমক দেখিয়েছে। সিঙ্গাপুরে আক্রান্তের তুলনায় মৃতের হার সবচেয়ে কম। শূন্য দশমিক একও নয়। সিঙ্গাপুরে সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা আজকের দিন পর্যন্ত ৪২৩১৩। কিন্তু মৃতের সংখ্যা মাত্র ২৬। বাংলাদেশ নিজেকে সিঙ্গাপুরের সমকক্ষ হবার স্বপ্ন দেখিয়ে সেরকম চমক দেখাতে পারেনি কেন? বাংলাদেশে জুন মাসের প্রথম দিন মৃতের সংখ্যা ছিল সরকারি হিসেবে ২২। যাক সে কথা, সরকারি হিসেবে জুন মাসের দ্বিতীয় দিন থেকে তেরোতম দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিদিন সর্বনিম্ন মৃতের হার ৩০। সর্বোচ্চ ৪৬। সিঙ্গাপুরে যেখানে সর্বমোট মৃত ২৬ বাংলাদেশে সেখানে গড়ে প্রতিদিন মৃতের হার ৩৭। সবাই ধারণা করছে সেটা বাড়বে। না বাড়ার কারণ নেই। বরং মৃতের যে সংখ্যা বলা হলো, সরকারের চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তিরা মনে করেন মৃতের হার তার চেয়ে বেশি। যদিও সরকারের হিসাবের গরমিল নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন রকম আলোচনা আছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিজেও হিসেবের গরমিল স্বীকার করেছে কদিন আগে। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করায়, বহুজন যুক্তি সঙ্গতভাবেই হয়তো বলবেন, কবে কোন ব্যক্তি বা মন্ত্রী কী বলেছেন তা ধরে বসে থাকলে কি হবে? বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সিঙ্গাপুরের চেয়ে এতটাই পিছিয়ে যে, সামান্য তুলনা করার সুযোগ নেই। স্বভাবতই সিঙ্গাপুর নিজেদের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্বারা মৃতের হার কম রাখতে পেরেছে।
কথাটা গ্রহণযোগ্য আবার গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সিঙ্গাপুরের চেয়ে অর্থিকভাবে স্বচ্ছল কিংবা যাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা সিঙ্গাপুরের চেয়ে বিশ্বে বহুল প্রশংসিত তাহলে তারা মৃতের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলো না কেন? পাশাপাশি ভিয়েতনাম যাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় খুবই দুর্বল তারা কেমন করে জুনমাস অবধি দেখা যাচ্ছে সংক্রমণের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে সাড়ে তিনশোর নীচে রেখেছে। মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত নেই। কিন্তু ভিয়েতনামে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয় জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে। বাংলাদেশের ন্যূনতম চল্লিশ দিন আগে। বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রের তুলনায় ভিয়েতনাম অর্থনৈতিকভাবে খুবই দুর্বল, কিন্তু করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় সাফল্যটি তাদের। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে ১৯৭১ সালে। ভিয়েতনাম তেরো-চোদ্দ বছরের গৃহযুদ্ধ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয় ১৯৭৫ সালে। কিন্তু তারপরেও ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দেশটির আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনারকম যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু করোনা ভাইরাস নিয়ে তার সফলতা সকল দেশের শীর্ষে। কী করে তা সম্ভব হলো? কারণটা বিশ্লেষণ করা সহজ। যখন মাত্র চীন দেশে ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে ভিয়েতনাম তখন সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে অনেক আগ্রাসীভাবে নিজেদের পরিকল্পনাটা করে ফেলে। ভিয়েতনাম স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, যদি রাষ্ট্রের ভিতর ব্যাপকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপারটা ল্যাজেগোবরে হয়ে যাবে। সকলকে তারা সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবে না। ফলে রোগ প্রতিরোধ করাটা তাদের চিন্তায় দৃঢ়তার সঙ্গে বাসা বাধে। যাতে রোগটা কিছুতেই ভিয়েতনামে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জন্য যা করার সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সামান্য সময় তারা নষ্ট করেনি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভিয়েতনাম বুঝে ছিল প্রতিরোধ ছাড়া উপায় নেই, কোনাভাবে সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে বিরাট এক ধাক্কা খাবে দেশটা। ভিয়েতনামের সারা দেশব্যাপী এ রোগের সঙ্গে লড়াই করার আর্থিক সামর্থ ছিল না। ফলে জানুয়ারি মাসের প্রথমেই যখন পর্যন্ত ভিয়েতনামে কোনো রোগী সনাক্ত হয়নি, ভিয়েতনাম সরকার অতিকঠোর এবং কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নেয়। চীনের উহানে মাত্র তখন দুজন মারা পড়েছে, ভিয়েতনাম তখন প্রাথমিক পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছে। যখন ভিয়েতনামে ২৩ জানুয়ারি প্রথম উহান থেকে একজন ব্যক্তি হোচিমিন শহরে তাঁর সন্তানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে, ভিয়েতনাম জরুরি ভিত্তিতে ব্যাপারটাতে নাক গলায়। ভিয়েতনামে প্রথম করোনার সংক্রমণ সনাক্ত হয় ২৮ জানুয়ারি চীন থেকে আসা বিমানযাত্রীদের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে চীনের মূল ভূখ-ের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে চীনের বিমান ভিয়েতনামে আসা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ভিয়েতনামের এই নিষেধাজ্ঞাকে তখন অনেকে খুব বেশি আগে চরম পদক্ষেপ নেয়া বলে মনে করেছিল। কিন্তু ভিয়েতনামের জন্য সেটাই ছিল যথেষ্ট বিবেচনা প্রসূত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। কিন্তু জানুয়ারি মাসেই ভিয়েতনামের এমন উঠেপড়ে লাগাটা অনেকের কাছে যুক্তিপূর্ণ মনে হয়নি। বিভিন্ন দেশ যেসব পদক্ষেপ নিতে কম করে আরো একমাস দেরি করেছিল, ভিয়েতনাম যতো দ্রুত সম্ভব সেসব সিদ্ধান্ত নিতে কার্পণ্য করেনি।
কখনো সম্পূর্ণ ভিয়েতনাম লকডাউন করা হয়নি। সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। সকলের জন্য মাস্ক পরিধান আর দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক করা হয়েছিল। কিন্তু বারোই ফেব্রুয়ারি রাজধানী হ্যানয়ের একটি এলাকা যেখানে এগারো হাজার মানুষ বসবাস করতো, সে এলাকাটা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল তিন সপ্তাহেন জন্য। সেখানে একটি হাসপাতালের সংক্রামিত রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এটা করা হয়েছিল। সেখানে নিশ্চিতভাবে দশ জন রোগী সনাক্ত হয়েছিল। সেখানে কেউ প্রবেশ বা সেখান থেকে কেউ প্রস্থান করতে পারতো না। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী হ্যানয়ের দশ হাজার মানুষ বসবাসকারী উত্তরের একটি অঞ্চল সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছিল। কারণ সেখানেও কয়েকজন রোগী সনাক্ত হয়েছিল। দুটি শহরে শুধু দুটি অঞ্চলকে অবরুদ্ধ করা নয়, সেখানকার আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে যারা এসেছিল প্রত্যেককে খুঁজে বের করা হয়। সংক্রমণ ছড়াবার সামান্য সুযোগ রাখতে চায়নি ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম সরকারের কাছে সংক্রমণ ছড়ানোটা কেবলমাত্র কিছু রোগীর মৃত্যু বা কষ্ট পাওয়া নয়, পুরো দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থা যে তাতে ভেঙে পড়বে খুব গুরুত্ব দিয়ে এটা বুঝতে পেরেছিল তারা। সেরকম কিছু হলে ভয়ানকভাবে দেশের অর্থনীতিকেও বিপর্যয়ের মধ্যে নিয়ে যাবে সেটাও সরকার মাথায় রেখেছিল। সরকার জানতো, যদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আর অর্থনীতির উপর একসঙ্গে আঘাত আসে, মানুষের জীবনে নেমে আসবে চরম হতাশা। জনগণের সরকার হিসেবে এইসকল দিকগুলি সরকারকে ভাবতে হয়েছিল।
ভিয়েতনাম ভ্রমণের উপর তখন থেকেই কড়া নিরাপত্তা আরোপ করা হয়। চীন ভিয়েতনামের সীমান্তগুলিকে কড়া নজরদারির মধ্যে আনা হয়। জানুয়ারির শেষেই সকল বিদ্যালয়গুলিকে ছুটি ঘোষণা করা হয় আর তা মে মাসের মধ্য সময় পর্যন্ত বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয় সরকার। সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখা হয় কেউ কাউকে সংক্রামিত করে কিনা। কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে মধ্যে সংক্রমণরোধে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভিয়েতনাম ইতিপূর্বেই সার্স, এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা আর ডেঙ্গু সংক্রমণের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিল। ভিয়তনাম সরকার যেমন, ঠিক জনগণও এসব রোগের উৎপাত আর ভয়াবহতা সম্পর্কে ভালোই জানতো। তবুও সরকার জনগণকে সচেতন করার জন্য রাজধানী সহ বড় বড় শহর আর গ্রামের সকল মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে জনগণকে বোঝাতে আরম্ভ করে। কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেয়া হয় জনগণের প্রিয় সামরিক বাহিনীকে। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা নিজেরা এর জন্য প্রচারপত্র তৈরি করে জনগণের মধ্যে বিলি করার ব্যবস্থা করেছিল, যাতে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কী করণীয় জনগণ তা খুব সহজ করে বুঝতে পারে।
ভিয়েতনাম সরকার মধ্য মার্চে দেশের সেই সব মানুষকে ১৪ দিনের কোয়ারেনটাইনে পাঠায় যাদের শরীরে ভাইরাস সনাক্ত হয়েছিল কিংবা যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছিল। পুরো ব্যয় সরকার বহন করেছিল। কিন্তু কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য  খুব বিলাস বহুল জায়গা দেয়া হয়নি। একজন ভিয়েতনামী মহিলা সেই সময়ে অষ্ট্রেলিয়া থেকে ভিয়েতনামে নিজের দেশে ফিরে এসেছিল ভিয়েতনামকে অধিক নিরাপদ মনে করে। ফিরে আসার পর তাকে ১৪ দিনের কোয়ারেনটাইনে থাকতে হয় আর প্রথম রাতে তাকে কম্বল আর বালিশ ছাড়া শুধু মেট্রেসে ঘুমাতে হয়েছিল, মাথার উপরে অবশ্য একটা বৈদ্যুতিক পাঙ্খা ছিল। যারা কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন সকলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় তারা আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত হবার জন্য। ভিয়েতনাম সরকার মনে করেছিল, যারা ভাইরাস ছড়াতে পারে যদি প্রথমেই তাদের গতিবিধি সুনিদিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ করে ফেলা যায়, বাকিরা সংক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকবে। ভিয়েতনাম ভাইরাস ছড়াবার সকল পথগুলি বন্ধ করে দেয় সতর্কতা সঙ্গে। ভিয়েতনাম সবরকমভাবে সনাক্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষগুলিকে খুঁজে বের করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করে। ভিয়েতনাম সংক্রামিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্তর পর্যন্ত সকলকে নজরদারিতে আনে আর ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্য করে।
ভিয়েতনাম প্রথম থেকেই এটাকে একটা যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারের প্রতিটা স্তর থেকে বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি আবাস এবং প্রতিটি নাগরিককে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। ফলে সকল নাগরিকরা আন্তরিকভাবে সরকারের সঙ্গে মিলিতভাবে লড়েছে ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য। সরকারি গণমাধ্যমগুলি যথাযথভাবে জনগণের কাছে করোনা সংক্রান্ত সকল তথ্য সরবরাহ করেছে। ভিয়েতনাম সরকার মনে করে, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সাড়ে তিন লাখ মানুষের করোনা পরীক্ষার করার সামর্থ তাদের নেই। করোনা ছড়িয়ে পড়লে সঠিকভাবে চিকিৎসা দেবার সামর্থ পর্যন্ত ভিয়েতনাম সরকারের থাকবে না। ভিয়েতনাম মনে করেছে, যারা শারীরিকভাবে সবল আর কম ঝুঁকিপূর্ণ তাদেরকে বিভিন্নভাবে আলাদা করে রাখা হবে সুস্থ্য হয়ে উঠবার জন্য। কিন্তু ঝুঁকিপুর্ণ সকল ব্যক্তিদের পূর্ণমাত্রায় চিকিৎসা দেয়া হবে। ভিয়েতনাম তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক সামর্থ বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভিয়েতনাম সরকার মনে করেছিল, করোনা ভাইরাসকে মোকাবেলা করা জন্য তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সর্বিকভাবে প্রস্তুত নয়। সাড়ে নয়কোটি মানুষের দেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়লে, চিকিৎসা দিতে গিয়ে নানারকম সঙ্কটের শিকার হবে তারা। হো চি মিন শহরের নগরপাল জানান যে, শহরের হাসপাতালে মাত্র ৯০০ শয্যা ছিল রোগীর ইনটেনসিভ কেয়ার নেয়ার জন্য। কিন্তু করোনা ভাইরাস সকলের মধ্যে ছড়াতে থাকলে তাতে কুলাবে না। রাজধানী হ্যানয়ের হাসপাতালে নিশ্চয় কিছু ইনটেনসিভ কেয়ার নেয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সরকার সাড়ে নয়কোটি মানুষের জন্য সেগুলি যথেষ্ট মনে করতে পারেনি। ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধকে তারা প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ফলে করোনার চিকিৎসা দেবার জন্য সাড়ে তিনশো রোগী পাওয়া যায়নি সারা ভিয়েতনামে গত প্রায় পাঁচমাসে। প্রায় ক্ষেত্রেই ইনটেনসিভ কেয়ারগুলি খালি পড়েছিল।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে কী দেখা যাবে? প্রথম থেকেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলতে শুরু করেছে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে তারা যথেষ্ট প্রস্তুত। নিলর্জ্জের মতো বলেছে, বিশ্বের অনেক বড় দেশের চেয়েও তাদের প্রস্তুতি ছিল। বিশ্বের গবেষকদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের মতো মহামারী প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি দরকার স্বচ্ছতা, তথ্য গোপন না করা। তথ্য গোপন করলে বিপদ বাড়বে। কিন্তু সামান্য স্বচ্ছতা ছিল না বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরগুলির, না বাংলাদেশ সরকারের। ভিয়েতনাম সরকার যথেষ্ট বিবেচনার সঙ্গে এটা ধরে নিয়েছিল, সাড়ে নয় কোটি মানুষের দেশে করোনা একবার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে, তার দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা তা কিছুতেই সামাল দিতে পারবে না। মাথার মধ্যে এটা তাদের পরিষ্কার ছিল। ফলে মহামারী না ছড়ানোর জন্য সব ব্যবস্থা তারা নিয়েছিল। ভিয়েতনাম সফলভাবে এটা প্রমাণ করেছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে দরকার সবসময় ব্যাপকরকম চিকিৎসা দান নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার চমক দেখানো নয়। বরং ভিন্ন ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাকে আটকে দেয়া যায়। দরকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কার মতো দেশ সেভাবেই সাফল্য লাভ করেছে। চিকিৎসার জন্য তাদের তেমন কিছুই ব্যয় করতে হয়নি। প্রধান প্রশ্নটা ছিল সরকারের মানসিকতার। করোনা সংক্রামণকে বাড়তে না দেয়ার জন্য দুই দেশের সরকার যতদূর সম্ভব নজরদারির মধ্যে রেখেছে পুরো রাষ্ট্রের নাগরিকদের। পরিকল্পনা গ্রহণে সামান্য কাল ক্ষেপন করেনি। ভিয়েতনাম আর শ্রীলঙ্কার পথ গ্রহণ করেছে পরে আরো কিছু রাষ্ট্র।
চীন এবং ভিয়েতনাম রোগটি যাতে সারা দেশময় ছড়িয়ে না পড়তে তার জন্য নানারকম পদক্ষেপ নিয়েছিল। ফলে সাফল্যও পেয়েছে। চীন প্রথমে সামাল দিতে পারেনি। কারণ উহানের মানুষজন নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে প্রথমদিকে ব্যাপকভাবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। চিকিৎসকরা নিউমেনিয়ার চিকিৎসা দিতে দিতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ দেখতে পায় নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় রোগীদের উন্নতি হচ্ছে না। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে, এসকল রোগীদের প্রায় সকলে উহান শহরের ‘হুয়ানান সামুদ্রিক খাদ্য পাইকারি বাজার’-এর সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ ক্রেতা, কেউ বিক্রেতা বা কেউ সরবরাহকারী। সেখানে সামুদ্রিক জীবিত মাছ বা অর্ধমৃত মাছ বা জীবের মাংস বেচাকেনা হয় আর সেই সঙ্গে কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাছ খাওয়া দাওয়া হয়। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল হুয়ানানের এ বাজারটি করোনা ভাইরাস ছড়ানোর একমাত্র উৎস ছিল না। উহানের বিভিন্ন হাসপাতালের রোগীদের নিউমেনিয়ার উন্নতি না হলে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর চীনের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্টোল’কে ব্যাপারটি অবগত করা হয়। কিন্তু উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের একজন চোখের চিকিৎসক তার ফোনের ইন্টারনেট মারফত ব্যাপারটি কয়েকজন বন্ধুকে জানালে ব্যাপারটি সরকারের নজরে আসে। পুলিশ তখন তাকে এভাবে গুজব ছড়াতে বা এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে না করে। তিনি তার নিজের কর্মস্থলে ফিরে যান এবং কিছুদিনের মধ্যেই করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হন পরে মারাও যান।
চিকিৎসকের সেই ছড়ানো গুজবটিকে প্রথম মহামারী হিসেবে উড়িয়ে দিলেও, ঠিক পরদিনই ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়ে একটি তদন্ত পর্ষদ গঠন করে। পরদিনই সামুদিক মাছ বিক্রয়ের বাজারটিকে জীবানুমক্ত করার জন্য বিশেষ অভিযান চালানো হয় এবং ক্রেতাদের মাঝে মাস্ক বিতরণ করা হয়। সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে এই অভিযানে কথা প্রচার করা হয়েছিল। সরকার পরদিন আকস্মিকভাবে মার্কেটটি বন্ধ করে দেয়। ইতিমধ্যে আরো রোগী ভর্তি হয় হাসপাতালে। হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় প্রথম রোগী মারা যায় জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখে। পরপর চারদিন চারজন রোগী মারা যায়। পরের চারদিন মারা যায় দুইজন করে। মৃতের সংখ্যা তারপর বাড়তেই থাকে। চীন সঙ্গে সঙ্গে উহান শহরকে অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু চীনের রোগটিকে বুঝে উঠতে উঠতে জ্যামিতিক হারে বহু মানুষ সংক্রামিত হয়ে পড়ে। বহু মানুষ মারা যেতে থাকে। চীন রোগটিকে প্রতিরোধ করার জন্য তখন নানাভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেয় যাতে রোগ উহানের বাইরে ছড়িয়ে না পরে। রাজধানী উহান ছাড়াও হুবেই প্রদেশে আরো অনেকগুলি বড় বড় শহর ছিল। চীন সরকার হুবেই প্রদেশের সকল শহরের সঙ্গে উহানের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। হুবেই প্রদেশের অন্যান্য শহরগুলির উপরেও নজরদারি রাখে। কিন্তু ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসটি মহামারী আকারে উহানকে গ্রাস করে ফেলেছিল। চীন সরকারের তিনমাসের মধ্যে সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। চীন সংক্রামিতদের খুজে বের করতে প্রচুর মানুষকে পরীক্ষা করছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পরে উহানে মে মাসের ১৪ থেকে ২৩ পর্যন্ত দশদিনে পঁয়ষট্টি লাখ মানুষকে করোনা পরীক্ষার অধীনে এনেছে। দিনে দশ থেকে পনেরো লাখ মানুষের পরীক্ষা করা হয়েছে। করোনা প্রতিরোধে উহানের এককোটি দশ লাখ মানুষের সকলকে পরীক্ষা করা হয়।
ভিয়েতনাম আর চীনের করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের এই সাফল্যকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন সহ পাশ্চাত্যের কিছু রাষ্ট্র। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সহ পাশ্চাত্যের বহু দেশ চীনের সাফল্যকে মানতেই রাজি নয়। চীনের সাফল্যকে ছোট করার জন্য বলছে চীনের দেয়া পরিসংখ্যানে লুকোচুরি আছে বলে তাদের অভিযোগ। কেউ কেউ একই অভিযোগ তুলেছে ভিয়েতনাম সম্পর্কে। কিন্তু চীন আর ভিয়েতনামের সাফল্যে পাশ্চাত্যে কিছু দেশ আস্থা রাখতে না পারলেও, সিঙ্গাপুরের সাফল্য নিয়ে বক্রোকথা বলছে না। বক্রকথা বলছে না শ্রীলঙ্কার সাফল্য নিয়ে। বক্রকথা বলছে না মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মুত্যুর সংখ্যা কম নিয়ে। কারণ কী? সিঙ্গাপুর আর মধ্যপ্রাচ্যের সাফল্য নিয়ে তাদের মনে প্রশ্ন নেই, কারণ সেগুলি সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়। কিন্তু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে চীন আর ভিয়েতনাম নিয়ে। কারণটি খুব সহজ, দুটি দেশেই সমাজতান্ত্রিক দেশ, দুটি দেশে বর্তমানেও সাম্যবাদী দলের সরকার রয়েছে। সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক দেশ কিনা সে প্রশ্ন বহুজন তুলতে পারে চীন বা ভিয়েতনাম নিয়ে। কিন্তু কাগজেকলমে সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং একদলীয় সাম্যবাদীরাই দেশ দুটি চালাচ্ছে। ফলে রাষ্ট্র দুটির জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। ভিন্নদিকে নানারকম উন্নয়নের মাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে দুটি দেশই। ভিয়েতনামের পথ চলা শুরু হয়েছে বলতে গেলে সেদিন, সে তুলনায় যথেষ্ট ভাল করছে দেশটি। ফলে পাশ্চাত্যের অপপ্রচার সহজে বন্ধ হবে না।
চীন বিশাল দেশ, বিরাট অর্থনৈতিক শক্তি। তার কথা বাদ দেই। ভিয়েতনাম আর শ্রীলঙ্কা যা পারলো, বাংলাদেশ তা পারলো না কেন? শ্রীলঙ্কা আর ভিয়েতনাম যেভাবে সংক্রমণকে প্রতিহত করেছে, বাংলাদেশ সেই একই পথে আগালো না কেন? খুব ব্যয়বহুল পথ সেটা নয়। নিন্দুকরা অবশ্য বলে, যেখানে বহু টাকা খরচ করার সুযোগ নেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজরা নাকি সেসব কাজ করতে উৎসাহ পায় না। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, কম মূল্যের প্রয়োজনীয় সামগ্রি কেনার চেয়ে, অনেক বেশি দাম দিয়ে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রি কিনতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা উৎসাহী। বাংলাদেশে অক্সিজেনের অভাব কেন, করোনা চিকিৎসায় যা ব্যাপক দরকার ছিল? কারণ হিসেবে জানা যায় কম মূল্যের অক্সিজেন ক্রয় করার চেয়ে যেখানে বেশি টাকা পকেটে ভরার সুযোগ, সংশ্লিষ্টরা সেরকম সামগ্রি কিনতে চায়। বাংলাদেশ সরকারের বা জনস্বাস্থ্যের ব্যর্থতা নিয়ে এখন সরকারী দলের চিকিৎসরা পর্যন্ত সমালোচনায় মুখর। সরকারের জাতীয় কমিটির চিকিৎসকরা প্রতিদিন এখন চিকিৎসকদের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। বিশ্বের আর কোনা দেশে এত চিকিৎসক মারা যাননি। চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে বলতে চিকিৎসকরা ক্লান্ত কিন্তু তা এখনো সহজলভ্য নয়। সবার আগে, বলতে গেলে সেই মার্চের শুরু থেকে চিকিৎসক আবদুন নূর তুষার চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা আরম্ভ করেছিল। বহুজন তখনো ব্যাপারটির গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারেনি। বহু মূল্য দিয়ে এখন চিকিৎসা জগতের সরকারি দলের নেতারা পর্যন্ত বুঝতে পারছেন ভয়াবহ অঘটন ঘটে গেছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার নানা অব্যবস্থাপনার কথা নাকি চীন থেকে আগত বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করলেও কিন্তু চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিকতার প্রশংসা করেছেন তাঁরা। বলেছেন বাংলাদেশের চিকিৎসাদানের সঙ্কট হচ্ছে অব্যবস্থাপনা, কিন্তু চিকিৎসকরা দক্ষ। চীনা বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেছেন, ‘চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমরাও বহু কিছু শিখেছি’। চীনাদের এ স্বীকারোক্তি আমাদের চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষের মনের বহুদিনের হতাশা দূর করবে নিশ্চয়। বাংলাদেশে সফররত চীনের করোনা ভাইরাস বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান লি ওয়েন ঝিও বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মেধা ও দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রশংসা করেছেন হাসপাতালের সেবিকা আর স্বাস্থ্যকর্মীদের। কিন্তু সরকারের বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা করোনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছেন বলে চীনা বিশেষজ্ঞ দল মনে করেন। চীন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের পার্থক্য বোঝাতে ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন চীনা বিশেষজ্ঞ দলের চিকিৎসক লি। লি বলেন, সঠিক তথ্য বা অব্যবস্থাপনার কারণে করোনা ভাইরাস যে বাংলাদেশের কোথায় কোথায় আছে সেটাই জানা দুষ্কর। বলা যায়, তা জানা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। কিন্তু এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য দরকার কার্যকর লকডাউন, সংক্রামিতদের সনাক্ত করার জন্য দ্রুত পরীক্ষানিরীক্ষা, সকল সংক্রামিতদের খুঁজে বের করা এবং চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো। করোনা সংক্রমণের পরীক্ষা বহুগুণ বাড়াবার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বাংলাদেশে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তুবাস্তবে পরীক্ষা করাবার সহজ পন্থা বা সুযোগ নেই। সরকারের তেমন আনুকূল্য নেই। খবরে প্রকাশ, ব্যক্তিগত বা বেসরকারী হাসপাতালে পরীক্ষা করাবার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক লুটপাটের শিকার হচ্ছেন মানুষ, সরকারি ক্ষেত্রে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বা কখনো কখনো ঘুষ দিতে হচ্ছে। সংক্রামিতদের সকলে জন্য চিকিৎসা নেই। বহু মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন এসব বহুদিন ধরেই খবরের কাগজ পাঠ করে জানা যাচ্ছে।
চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারে জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য খানিকটা আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাত পুরোপুরি বিপর্যস্ত। কেবলমাত্র সুষ্ঠুভাবে চালু আছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতাল, সিএমএইচ এবং কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল। জাফরুল্লাহ চৌধুরী যা বলছেন তার সঙ্গে চীনা বিশেষজ্ঞদের কথার মিল রয়েছ। কিন্তু সিএমএইচ-এ সকলের যাবার সুযোগ নেই। বাকিগুলিতে কমবেশি নানারকম অব্যবস্থাপনা যে নেই তা নয়, কিন্তু সেটা চিকিৎসকদের কিছু করার নেই। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা জানপ্রাণ দিয়ে লড়ে যাচ্ছে। চীনের বিশেষজ্ঞ দলের কথায় সেটার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কিন্তু উল্লেখিত হাসাপাতালগুলিতে তো আর অফুরন্ত শয্যা নেই যে, সকলের চিকিৎসা জুটবে। বর্তমান মারাত্মকরকম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক। কিন্তু সারা দেশেই সে তুলনায় শয্যা নিতান্ত অপ্রতুল। চিকিৎকরা জানপ্রাণ দিলেও হাসপাতালগুলিতে আছে অক্সিজেনের অভাব। কিন্তু অক্সিজেনই করোনা চিকিৎসার সবচেয়ে প্রধান অস্ত্র। বরিশালের শের-ই-বাংলা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অভিযোগ এসেছে, শুধুমাত্র অক্সিজেনের অভাবে সেখানে রোগীদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন রকম প্রয়োজনীয় সামগ্রি বা যন্ত্রপাতির অভাবে তাঁরা মারাত্মক রোগীদের দরকার মতো অক্সিজেন দিতে পারছেন না। ন্যূনতম যেখানে প্রয়োজন প্রতিদিন রোগীদের ত্রিশ থেকে-সত্তর লিটার অক্সিজেন দেয়া, সেখানে ন্যাসাল ক্যানালের অভাবে মাত্র ছয় লিটার অক্সিজেন দেয়া সম্ভব হচ্ছে। ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা চতুর্দিকে। মানুষজন করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসা পাবে না বলে আতঙ্কিত।
সংকট থেকে বের হবার উপায় কী? বহু দিন ধরে মনে হচ্ছিল সংকট উত্তরণের পথ নিশ্চয় আছে। না থেকে পারে না। কিন্তু গত কদিন আগে নতুন একটি খবর জানতে পারার পর সংকট উত্তরণের আর ভরসা খুঁজে পাচ্ছি না। বাংলাদেশ প্রতিদিনের খবরে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাকি নিয়ন্ত্রিত হয় বিদেশে থাকা এক বাংলাদেশের ব্যবসায়ীর দ্বারা। তিনিই নাকি গত ত্রিশ বছর যাবৎ ধীরে ধীরেস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। পুরো মন্ত্রণালয় নাকি তার কুক্ষিগত। স্বাস্থ্য খাতের মাফিয়া ডন বলে খ্যাত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর ইচ্ছাতেই নাকি চলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মিঠুর আঙ্গুলি হেলনেই নাকি চলছে স্বাস্থ্য খাতের যাবতীয় সরবরাহ এবং কেনাকাটার কাজ। কিন্তু তিনি নাকি এতটাই ধরাছোঁয়ার বাইরে, দুদুক নাকি তার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না। বরং তার দৌরাত্ম নাকি এতটাই যে, দুদক আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বড় বড় কর্মকর্তারাই তার কাজের সহযোগী। চার বছর ধরে তার বিরুদ্ধে সকল দুর্নীতির তদন্ত নাকি থেমে আছে। বিদেশে অর্থ পাচারকারী হিসেবেও নাকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। স্বাধীন একটি দেশে কেমন করে একজন মানুষ পুরো একটি মন্ত্রণালয়কে নিয়ন্ত্রণ করে দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশের মানুষ কি এরকম একটি পরিস্থিতি দেখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিল যে, তার স্বাস্থ্য সেবা একজন ব্যক্তির নিজস্ব মুনাফা লাভের খেয়াল খুশিমতো পরিচালিত হবে? মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবে তার জন্য কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল! মানুষ মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিল কি দেশটা নানাভাবে লুটপাট হবে সেইজন্য!
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্ট্যাণ্ডিং কমিটির সদস্য সাংসদ একরামুল বলেন, স্বাস্থ্য খাত বিরাট সিণ্ডি কেটের নিয়ন্ত্রণে। বিরাট সেই সিণ্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছু বলার জন্য আমি নিজেও বিপদে পড়তে পারি। তিনিও প্রসঙ্গক্রমে বলেন, মিঠু নামক ব্যক্তিটিই নাকি বাইরে বসে চালাচ্ছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সাংসদ বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্ট্যাণ্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে আমি বুঝতে পারি না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কারা চালায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চালায়, নাকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চালায় তিনি নিজেই সেটা বুঝতে পারছেন না। কীরকম হয়েছে রাষ্ট্রের চেহারাটা! সাংসদ একরামুল বলেন, স্বাস্থ্য এবং ব্যাংক খাত দুটো বিরাট সিণ্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত হয়, যাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম এই দুটি খাতের সিণ্ডিকেট সম্পর্কে একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন ব্যাংক লুটেরা আর স্বাস্থ্য খাতের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কিছু বলা তার নিজের জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশ্ন দাঁড়ায় তাহলে সরকারের ভূমিকাটা কী? রাষ্ট্রের এইসব অনিয়ম কার দেখবার কথা? মিঠু দেখা যাচ্ছে একানব্বই সাল থেকেই তাঁর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। যা প্রমাণ করে তিনি সরকারি দলের কেউ নন। তাহলে তাঁর ক্ষমতার উৎসটা কী, তিনি ত্রিশ বছর ধরে তাহলে কীভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করে আছেন? বাংলাদেশের একজন সাংসদ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। সাংসদ মনে করেন, স্বাস্থ্য সিণ্ডিকেটের নেতার ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, প্রধানমন্ত্রী চাইলেই একমাত্র সেটাকে সামাল দিতে পারেন। যদি কথাগুলি সব সত্যি হয়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? স্বাস্থ্য খাতের পরণতি তাহলে কোন দিকে যাচ্ছে? করোনার ভাইরাসের এই বিপজ্জনক অব্যবস্থাপনার সময়ে নতুন করে কী আশা করবার কিছু থাকে?
সবকিছু বিচার করার পর নিশ্চয় হতাশ হতে হয়। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাঁচার পথ দেখাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। শর্ষে ভূত ছাড়াবে, সে শর্ষের মধ্যে যদি ভূত বসে থাকে, তাহলে উপায় কি? যদি প্রাকৃতিক ভাবে ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সার্স ভাইরাসের মতো রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যায় তাহলেই বাংলাদেশের মানুষ করোনার বিপদ থেকে রক্ষা পাবে। কিংবা স্পেনিশ ফ্লুর মতো সবাই যদি ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিজেদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে, সংক্রমণ তাহলেই বন্ধ হবে। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে সুবিধাটি এই যে আশি শতাংশ মানুষ এর আক্রমণ টেরই পায় না। বাকি চোদ্দ শতাংশ মানুষ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। ছয় শতাংশ মানুষের দরকার হয় নিবিড় পরিচর্যা আর অক্সিজেন। ইতিপূর্বে “করোনা ভাইরাসকে ভয় পাওয়ার আদৌ কিছু আছে কি?” শিরোনামের একটি রচনায় আমি দেখিয়েছি, সবচেয়ে মারাত্মক রোগীদের অক্সিজেন দরকার হয়। যদি ঠিক মতো তাঁরা অক্সিজেন পেয়ে যান তাহলে নিরানব্বই শতাংশ মানুষই করোনার সংক্রমণের পরেও বেঁচে যেতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামের পরিসংখ্যান দিয়ে তা গত রচনাটিতে আমি দেখিয়েছি। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনায় মারা যেতে পারেন বহু মানুষ যাঁদের মরবার কথা ছিল না। বাংলাদেশে যে চিকিৎসা সেবায় অব্যবস্থাপনা চলছে, চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীদের সকল ত্যাগ-তিতিক্ষার পরে কতো সংখ্যক মানুষ যে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবে তা এখন সত্যিই অনিশ্চিত। চিকিৎসার অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতের বহু গুণী চিকিৎসক ইতিমধ্যেই প্রাণ দিয়েছেন।
সকলের ভাবনাচিন্তা করার সময় এসেছে এর হাত থেকে মুক্তি কোথায়। চিকিৎসা খাতের বিভিন্ন রকম দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বহু চিকিৎসক এখন সরব। সরকারি দলের চিকিৎসক নেতা, এমনকি সাংসদরা পর্যন্ত মুখ খুলেছেন। স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের ডাঃ ইকবাল আর্সলান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ এবিএম আবদুল্লাহ, বিএমএ-র মহাসচিব ডাঃ ইহতেশামুল হক চৌধুরী, বিএমএর সভাপতি মোস্তফা জালাল মহীউদ্দিন প্রতিবাদ জানিয়েছেন বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁদের যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। প্রতিবাদ জানাচ্ছেন পত্রিকার সম্পদকরা। রাষ্ট্রের এইরকম মহামারীকালে সেটাই হবার কথা। সরকারি দলের একজন সাংসদের ভাষায়, তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সিণ্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। স্বাস্থ্য খাতের এ অব্যবস্থাপনা গত দশ বারো বছরের নয়। বলতে গেলে গত উনপঞ্চাশ বছরের। গত ত্রিশ বছরে সেটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী করোনা আক্রান্ত অবস্থায় চমৎকারটি একটি নিবন্ধ লিখেছেন সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মুনাফা আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে। কিন্তু আমাদের সমাজের খুব পরিচিত একটি অংশের ব্যক্তিত্বরা নিজদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে নীরব কেন বুঝতে পারছি না। নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচারে সকলেই তারা বেশ সরব। করোনার মতো মহমারীর সময়কালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে কিছু বলছেন না কেন দেশদরদী এই মানুষগুলি!

ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও বিলীন হবে না করোনা ভাইরাস

করোনা ভাইরাস হয়তো কখনোই বিলীন হবে না। ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং ব্যবহার শুরুর পরেও হয়তো বছরের পর বছর করোনার উপস্থিতি থেকেই যাবে এবং মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণ ঘটতে থাকবে।

করোনা নিয়ে এভাবেই সতর্ক করলেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে তারা হাম, এইচআইভি এবং চিকেনপক্সের উদাহরণ টেনে এনেছেন।

এদিকে করোনা রোগীর চিকিৎসায় বহুল আলোচিত হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ইউরোপের চার দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ওষুধটির ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবুও মঙ্গলবার ভারতে অনুমতি পেল ওষুধটি।

এর আগে চলতি মাসের মাঝামাঝি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, করোনা হয়তো চিরতরে যাবে না। এইচআইভি ভাইরাসের মতো কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস স্থানীয় ভাইরাস হয়ে যেতে পারে।

তাই বিশ্বজুড়ে প্রতিটি মানুষকে এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা শিখতে হবে। কবে নাগাদ এই ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

আরও কিছু রোগের মতো করোনাও হয়তো স্থায়ী হয়ে যাবে। বর্তমানে চারটি করোনাভাইরাসের উপস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে, যেগুলোর কারণে সাধারণ ঠাণ্ডাজনিত রোগ দেখা দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন কোভিড-১৯ এই তালিকায় ৫ম ভাইরাস হিসেবে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে।

ইমিউনিটি সিস্টেম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই ভাইরাসের কার্যকারিতা কমতে শুরু করবে। ফলে আমাদের শরীর এই ভাইরাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিবে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইপিডেমিওলজিস্ট এবং বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানী সারাহ কোবেই বলেন, এই ভাইরাস এখানেই থাকবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কীভাবে এর সঙ্গেই নিরাপদে থাকতে পারব।

সাম্প্রতিক সময়ে তিনজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, করোনার সংক্রমণ রোধে ৬ ফুট দূরত্ব যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রেও সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

একই সঙ্গে তারা বলছেন, বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটার বিষয়টিকে বিশ্বকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত। বিজ্ঞানভিত্তিক একটি জার্নালে সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেই সামাজিক দূরত্ব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ।

সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, উপসর্গহীন রোগীদের খুঁজে বের করতে প্রতিদিন ব্যাপক হারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন ওই বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সব পরিস্থিতিতে শুধু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত গাইডলাইনই যথেষ্ট নয়।

ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাতালি ডিন বলেন, লোকজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। কিন্তু করোনাভাইরাস নিয়ে ভবিষ্যতের জীবন-যাপন কখনোই স্বাভাবিক হবে না।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু আমরা ভিন্ন উপায় বের করতে পেরেছি এবং এটা আবিষ্কার করেছি যে কোনটি কাজ করছে। এভাবেই আমরা আমাদের সমাজ এবং জীবন-ব্যবস্থা পুনরায় শুরু করতে যাচ্ছি।

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ইউরোপে নিষিদ্ধ, ভারতে অনুমতি : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় বিতর্কিত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন প্রয়োগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ইউরোপের চার দেশ।
এগুলো হল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়াম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও করোনা চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

তবুও মঙ্গলবার ভারতে করোনা চিকিৎসায় অনুমতি দেয়া হয়েছে এই ওষুধের। ভারতের শীর্ষ বায়োমেডিক্যাল রিচার্স সংস্থা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) এই অনুমোদন দেয়।

তাদের মতে, ভারতে এই ওষুধটি করোনা রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে এবং ছয় সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এটার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
সুতরাং এই ওষুধটি চালিয়ে নেয়া যায়। আইসিএমআর’র মহা-পরিচালক বলরাম ভারগাবা বলেন, আমরা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে করোনা এড়ানোর জন্য অনুমোদন দিয়েছি। এটা চলতে পারে। কারণ, এটা সেবনে কোনো ক্ষতি নেই।

হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন সাধারণত ম্যালেরিয়া, বাত বা ত্বকে সংক্রমণ জাতীয় রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এই ওষুধ কার্যকরী বলে কেউ কেউ দাবি করলে তা প্রয়োগের অনুমতি দেয় অনেক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওষুধটিকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

১০০ কোটি ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ্য নোভাভ্যাক্সের : যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি তাদের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন মানব শরীরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।

ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যভিত্তিক বায়োটেকনোলজি কোম্পানি নোভাভ্যাক্স অন্তত ১৩০ জনের শরীরে ভ্যাকসিনটির পরীক্ষা করতে যাচ্ছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোতে সফল হলে এ বছর ১০ কোটি ও সামনের বছর ১০০ কোটি ভ্যাকসিন উৎপাদন করবে নোভাভ্যাক্স।

শাহজাদপুর সংবাদ ডটকম এর প্রধান সম্পাদকের রোগের সাথে যুদ্ধ শেষে অফিসে শুভ আগমন

আজ ২৪ সেপ্টেম্বর গত মাসের এই দিনে নিরব ঘাতক ব্যধি GBS (Guillain Barr’e Syndorme) রোগে আক্রান্ত হয়ে শাহজাদপুর সংবাদ ডটকম এর প্রধান সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার সম্পূর্ন বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি এখনও চিকিৎসাধীন। আজ তাকে শাহজাদপুর সংবাদ ডট কম এর আয়োজনে ঢাকাস্থ পত্রিকার নিজস্ব কার্যালয়ে কার্যালয়ে আনা হয়েছে। সকলের দোয়া, উৎপ্রেরনা, চিকিৎসাসেবা সর্বোপরি করুণাময় সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় তিনি সুস্থ হবার পথে রয়েছেন। শাহজাদপুর সংবাদ ডট কম এর পক্ষ থেকে সকলের কাছে তার পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়েছে।

বজ্রপাতে চিরতরে ঝরে গেলো এক ক্রিকেট প্রেমির স্বপ্ন ও প্রাণ

শামছুর রহমান শিশির : মৃত্যু বিধাতার অমোঘ এক বিধি। দু’দিন আগে পরে সবাইককে মৃত্যুর তেতো অনিবার্য স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে অসময়ে এমন কিছু তরতাজা প্রাণ ঝরে পরে এ ভূবনে যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না, কেউ মানতে পারে না! ঠিক তেমনি গত ২৯ এপ্রিল দুপুরে বজ্রপাতের অাঘাতে অঙ্কুরেই ঝরে গেলো সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসদরের ছয়আনীপাড়া মহল্লার ফুটফুটে নাবিল (১৭)!
ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট পাগল ছিল নাবিল । সুযোগ পেলেই ব্যাট -বল হাতে নিয়ে বন্ধুদের সাথে ছুঁটতো খেলার মাঠে। ইচ্ছর ছিল তার বড় হয়ে একদিন দেশ সেরা ক্রিকেটার হওয়ার। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ছোট বেলা থেকেই নাবিল লেখাপড়ার পাশাপাশি মন প্রাণ সঁপে দেয় ক্রিকেটের ভেতরে । ভালো খেলার কারণে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় ক্রিকেটাঙ্গণে বেশ নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে নাবিলের। মেধা মননকে কাজে লাগিয়ে ক্লাসিক্যাল খেলা উপহার দিয়ে অনেক পুরস্কারও পায় আত্মপ্রত্যয়ী ও পরিশ্রমী নবীন ক্রিকেটার নাবিল । প্রয়াত নাবিলের বাবা অবসরপ্রাপ্ত উদ্ধর্তন ব্যাংক কর্মকর্তা মো: ওমর ফারুক খান কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান,স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এ ভর্তি হতে চেয়েছিল নাবিল । অনিবার্য কারণে তা আর হয়ে উঠেনি। শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলো নাবিল। আবাহনীতে ভর্তি হবার জন্যে জেলা ছাত্রলীগ নেতা আবাহনীর ক্রিকেটার মারুফ হোসেন সুনামের সাথে যোগাযোগ করে নাবিল। পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে তার খালাতো ভাই আবাহনী দলের সাবেক খেলোয়াড়, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের কাছের শাওখিক সরকারের সাথেও যোগাযোগ করেছিলো নাবিল ।
নাবিলের বাবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আরও বলেন, পরিবারের ছোট ছেলে নাবিল। তার একমাত্র ইচ্ছাই ছিল দেশ সেরা ক্রিকেটার হবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নাবিলের স্বপ্ন হারিয়ে গেলো এক নিমিষেই, বজ্রপাতের এক ঝলকেই! বজ্রপাতে নিঃশেষ হয়ে গেলো নাবিলের তরতাজা প্রাণ। সেইসাথে তার স্বপ্নেরও চিরঅবসান ঘটলে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ক্রিকেট নিয়েই মেতেছিল নাবিল। বাড়ি থেকে মাকে বলে বল নিয়ে বের হয়েছিলো। কিন্তু তখন হয়তো নাবিল ভাবতে পারেনি যে, এ খেলাই হবে তার জীবনের শেষ খেলা । ২৯ এপ্রিল বেলা তখন প্রায় ১২ টা! হঠাৎ আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এলো। দমকা হাওয়ার সাথে বৃষ্টির ছিটেফোটা পড়ছিলো। সে সময়ে শাহজাদপুর পৌরসদরের শাহজাদপুর থানা ও উপজেলা ভূমি অফিসের দক্ষিণের দুটি পুকুরের মাঝস্থলের পরিত্যাক্ত একটি ভবনের কাছে বন্ধু রিয়াজের সাথে ক্রিকেট নিয়ে গল্প করছিল নাবিল। দশ হাত দূরে বসে ছিল নাবিলের আরেক বন্ধু পলিন (১৭)। ঠিক সেই সময় বিকট শব্দে সেখানে বাজ পড়ায় নাবিল ও তার বন্ধু পলিন গুরুতর আহত হয়। দ্রুত এলাকাবাসী তাদের শংকাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় নুরজাহান হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তার দ্রুত তাদের পোতাজিয়াস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেররা জরুরী ভিত্তিতে আহতদের এনায়েপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দিলে এ্যম্বুলেন্সযোগে নাবিল ও পলিনকে সেখানেই নেয়া হয়। ওই হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক আহত নাবিল খান ও পলিনকে পরীক্ষা শেষে মৃত ঘোষণা করে। নাবিল ও পলিন দু’জনেই শাহজাদপুরের মাওলানা ছাইফ উদ্দিন এহিয়া ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। নাবিলের মা নিভা খান বলেন, ‘আমরা ছেলে নাবিল নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো। সেদিন নাবিল বলল, চুল কাটব মা, সামনে শবে বরাতের রাত। আমি টাকা দিলাম। চুল কাটাতে গিয়ে মাঠে দাঁড়াল খেলা দেখতে। কিন্তু আর ফিরল না।’ এই বলেই ডুকরে ডুকরে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিলেন নাড়িছেড়া ধন হারানো নাবিলের মা। কোলের মানিক সবার আদরের নাবিলকে হারিয়ে ভেঙে গেলো নাবিলের পরিবারের স্বপ্ন। এখনো শোক চলছে সে পরিবারে। নাবিল ও পলিনের অকাল মৃত্যুতে থমকে দাঁড়িয়েছিলো শাহজাদপুর, থমকে দাঁড়িয়েছিলো শাহজাদপুরের মানুষ! করুণ ওই মৃত্যু সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে পরিবার, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীসহ চেনা-অচেনা শত শত মানুষ। তাদের মৃত্যুতে পুরো শাহজাদপুরে শোকের ছায়া নেমে এসেছিলো। পরদিন সকালে নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নাবিল ও পলিনকে দাফন করা হয়। এছাড়া, তাদের জন্য বাংলাদেশসহ, সৌদিআরব, শাহজাদপুরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, সাংস্কৃতিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে, তাদের নিজ এলাকার কলেজ, শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগ, এলাকাবাসী, ঢাকার বিভিন্ন স্থানের মসজিদে মসজিদে তাদের বিদেহি আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া খায়ের ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সপ্তাহ জুড়ে।
নাবিলের মেঝো ভাই তরুণ সাংবাদিক ও নাট্যকর্মী নিহাল খান বলেন, নাবিল ছিল আমাদের পরিবারের ছোট ছেলে, সবার আদরের। সে শুধু আমার ছোট ভাইই ছিল না, ভালো বন্ধুও ছিলো। সবে মাত্র ১৭ তে পা দিয়েছিলো সে। অকষ্মাৎ নাবিলের চিরবিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না আমরা। দেশসেরা ক্রিকেটার হবার অদম্য ইচ্ছা, নাবিলের লালিত স্বপ্ন সব কিছুই বজ্রাঘাতে ঝরে পড়ার সাথে সাথে তাকে নিয়ে আমাদের বুকে লালিত অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন চিরবিদায় নিলো, শূণ্য বুকটা ভরিয়ে দিয়ে গেলো শুধু কষ্ট, কষ্ট আর কষ্ট দিয়ে।’

“দৈনিক ভোরের পাতার যুগপুর্তি ও ডিজিট্যাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংবাদপত্রের ভূমিকা” শিরোনামে-প্রবন্ধ।

-আবুল বাশার-প্রধান সম্পাদক

সময়ের কথা-

এক সময় গণমাধ্যম বলতে শুধু খবরের কাগজকে বোঝাত। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে গণমাধ্যম হিসেবে খবরের কাগজের একচেটিয়া প্রভাব ক্ষুণ্ন হতে থাকে। তবে খবরের কাগজের পাশাপাশি বর্তমানে অন্যান্য গণমাধ্যমের আবির্ভাব ঘটলেও এখনও খবরের কাগজই হল প্রধান গণমাধ্যম। প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাদেশে গণমাধ্যম হিসেবে ভোরের পাতার যুগপদার্পণের এই দিনটিকে ছোট করে ভাববার বা দেখবার অবকাশ নেই। অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের চেতনাকে ধারণ করে মুক্ত মানুষের চিন্তা ও জিজ্ঞাসার জানালায় নতুন আকাশ মেলে ধরার প্রত্যাশায় “আনন্দ ধ্বনি জাগাও গগনে” প্রতিপাদ্যে যুগপদার্পণের এ ক্ষণটিকে স্মরণীয় ও বরনীয় করে রাখতে ভোরের পাতার পাঠক ও শুভাকংখীদের উদ্যোগে আজ ১৮ মে/২০১৬ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদ হলরূমে বর্ণ্যাঢ্য কেককাটা অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। এর প্রধান সমন্বয়কারী ভোরের পাতার প্রতিনিধি মামুন বিশ্বাসকে অসংখ্য ধন্যবাদ। যুগপদার্পণে ‘শাহজাদপুর সংবাদ ডটকমের’ পক্ষ থেকে ভোরের পাতা এবং পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইলো আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

 

সংবাদপত্রগুলো কি পাঠকের প্রত্যাশা মেটাতে পারছে ?

সংবাদপত্রের বিকাশমান ধারার এই স্বর্ন যুগে এবং ডিজিট্যাল পদ্ধতির সহযিকরণের নানা সহায়ক আবিস্কারের পরেও সংবাদপত্রগুলো কি পাঠকের প্রত্যাশা মেটাতে পারছে ? এ প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রসঙ্গিক ভাবনা থেকেই অতীতের কিছু কথা লেখার চেষ্টা মাত্র। বিষয়টি পাঠকেরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করলে খুশী হবো। কিশোর বয়ষ থেকেই সংবাদপত্র পাঠে অভ্যস্ত্ ছিলাম। পাকিস্থান পর্বে নানা পত্রপত্রিকা পাঠের কারনেই লেখা-লেখিতেও উৎসাহ উদ্দিপনা ছিল।পাকিস্তানের শাষকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কন্ঠস্বর হিসেবেই সে সময়ে লেখালেখিতে অংশগ্রহন ছিল অনেকটা নিজ প্রয়োজনের তাগিদেই। এরপর জাতীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারনে স্বচেতন ভাবেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। দেশ স্বাধীন হয়। আমরা আপাতত: শত্রুমুক্ত হই কিন্তু শোষণ চিরাচরিত নিয়মের ধারাবাহিকতায় আমাদেরকে ঘিড়েই চলমান।আমি স্বাধীন দেশে সংবাদপত্রের পাঠক হতে চেয়েছিলাম, লেখক কিম্বা সংবাদকর্মী হতে চাইনি। মুক্তিযুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যেতে চেয়েছিলাম।কালের প্রেক্ষাপটে সেটি হয়নি।অন্যায়, অনিয়ম, অসামঞ্জস্য, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে যুদ্ধকরে মুক্তি চেয়েছিলাম, স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, স্বাধীনদেশ ও স্বতন্ত্র পতাকার জন্য লড়াইতে অংশনিয়ে আত্নহুতি দিতে গিয়েছিলাম। স্বাধীন দেশের মানচিত্র ও স্বতন্ত্র পতাকা মিললো।বাকিটা কেমন যেন এলোমেলো, প্রশ্নাধীন ? জনতার সত্যিকারের আকাংখার প্রতিফলন কি ঘটেছে ? প্রশ্নের উত্তর মেলেনি ? জেনেছিলাম অসির চেয়ে মসি বড়। অবশেষে জনতার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়া বা জানানোর সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আবার মসি হাতে নিয়েছি। মৃত্যুর আগমুহুর্ত পর্যন্ত সেটি হাতে থাকবে। কিন্তু কতটুকু করতে পেরেছি,পারছি কিম্বা পারবো এর উত্তর মেলা দায়।কারন আমরা পাঠকের প্রত্যাশা মেটানোর মত কিছু করতে পারছি না।নানা সীমাব্দ্ধতার ঘেরাটোপে আমাদের অবস্থান। স্বচ্ছতাও নেই।

 

পত্রিকা জগতের কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা-

নানা পত্রপত্রিকার সাথে লেখালেখি করতে গিয়ে কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়েছি এবং হচ্ছি এর কিছু অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।বাংলা বা ইংরেজি যে পত্রিকাই হোক না কেন, প্রতিটিরই কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে যেগুলোর দ্বারা পত্রিকাটি নিয়ন্ত্রিত হয়। বিশেষ কিছু রীতিকে অনুসরণ করে একটি পত্রিকা পরিচালিত হয়। পত্রিকা প্রকাশ এক ধরনের কঠিন ও জটিল শিল্প। এর গুরুত্ব অনেক। পত্রিকা পড়া এক অপরিসীম আনন্দ। বেশকিছু জটিল স্তর পার হয়ে একটি পত্রিকা মুদ্রিত হয় এবং তা সকালে যখন পাঠকের কাছে পৌঁছে, তখন পাঠক যদি তার চাহিদা অনুযায়ী বিষয়গুলো দেখতে পান, পড়তে পারেন এবং মোটামুটি তার চাহিদা মেটাতে পারেন তবেই এই শৈল্পিক স্তরগুলো পার হয়ে আসাটা সার্থক হয়। আর এই চাহিদা মেটানোর ওপরই নির্ভর করে একটি পত্রিকার সাফল্য, বিস্তৃতি ও স্থায়িত্ব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে পত্রিকাগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের আকাংখার প্রতিফলন জনিত সংবাদ কিম্বা অন্যান্য লেখার প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করছেন না কিম্বা এড়িয়ে চলছেন এমনটাই মনে হয়। মিডিয়ার মালিকগনও গোষ্ঠিতন্ত্রের বাইরে বানিজ্যিক সুবিধাপ্রাপ্তিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।জনস্বচেতনতার দায়দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। সবসময় ক্ষমতাসীনদের স্বার্থের প্রাধান্য দিচ্ছেন। জনগণের কথা এড়িয়ে চলার নীতি অবলম্বন করছেন। সত্য প্রকাশের নীতিবোধটা হাড়িয়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। বিচিত্র আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো- স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা ও  মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের পত্রপত্রিকা আছে। মিডিয়া জগতের একটি বৃহৎ অংশে তাদের অবস্থান। তারা দেশের জনগণকে ধর্মের সুরসুরি দিয়ে সর্বদা উত্তেজিত করছে।দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য নানা প্রচার প্রপাকান্ডা চালাচ্ছে তাদের প্রকাশিত পত্রপত্রিকায়।আমরা নির্বিকার। কোন স্বার্থে এ ধরনের ছার দেয়া হচ্ছে জানিনা।

একটি পত্রিকার অনেক ধরনের পাঠক থাকে। কেউ কেউ দেশে ঘটে যাওয়া অতি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রকৃত সত্য জানার জন্য মূলত একটি পত্রিকা পড়েন। ওই পত্রিকাটিই পাশের দেশ কিংবা বিদেশে কী ঘটছে তা জানার জন্য পড়েন অন্য কিছু পাঠক। কারও চোখ থাকে শুধু খেলার পাতায়- দেশী-বিদেশী বিভিন্ন খেলাধুলার খবর ও বিশ্লেষণের দিকে। আবার কেউ পত্রিকা পড়েন তার সম্পাদকীয় ভালো লাগার কারণে। কেউ পড়েন তাদের পছন্দের কোনো লেখকের লেখা প্রকাশ পেলে। আবার কেউ তাদের পেশা সংক্রান্ত কোনো ট্রপিক ওই পত্রিকায় প্রায় নিয়মিত ছাপা হয় বলে সে ধরনের কিছু পাওয়ার আশায় পত্রিকাটি কেনেন ও পড়েন। আবার অনেকে পত্রিকাটি কেনেন শুধু বাণিজ্যিক কারণে অর্থাৎ বিজ্ঞাপন দেখার জন্য। আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা, স্টাডি, বিশ্লেষণ করে কি-না এবং পত্রিকায় এর প্রতিফলন ঘটায় কি-না, জানা নেই। তবে হাতেগোনা দু-একটি পত্রিকা হয়তো এসব বিষয়ে চিন্তা করে থাকে, বাকিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু ঘটে না বলেই মনে হয়।

পত্রিকা (বাংলা ও ইংরেজি) পড়ার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিষয়বস্তুর চেয়ে লেখকদের ফেইস ভ্যালুই এখানে মুখ্য। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা পাঠকের জানা দরকার, কোনো কোনো পত্রিকায় সে বিষয়ে কোনো লেখা দেখা যায় না। আবার এমন একটি বিষয়ে লেখা, যা নিয়ে মানুষের খুব একটা আগ্রহ নেই, ব্যক্তির ফেইস ভ্যালু বিবেচনায় সেটা প্রকাশিত হয়। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে হয়তো চিন্তা করে না। আসলে ব্যাপক সমীক্ষা ও গবেষণা না হওয়ায় পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে অজানা থেকে যাচ্ছে কোন ধরনের পাঠকের কী ধরনের লেখা পছন্দ।

জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর এডিটরিয়াল বোর্ড আছে। বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য কোনো লেখা প্রকাশের পক্ষে মত দিলে ওই লেখাটি আলোর মুখ দেখে। এটি একটি ভালো নিয়ম বলে মনে হয়। আবার কোনো কোনো পত্রিকা শুধু কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির লেখা প্রকাশ করে, তা সে যে ধরনের লেখাই হোক না কেন। সেসব পত্রিকায় সবার প্রবেশাধিকার নেই। পত্রিকার যে এত জটিল রসায়ন ও সমীকরণ থাকে, তা অনেক পাঠকই জানেন না। অনেকে জানতে চান, অমুক পত্রিকায় আর আপনার লেখা দেখি না কেন? তাদের বলি, পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হওয়া বা না হওয়া তো আমার ওপর নির্ভর করে না। পত্রিকায় স্পেস থাকতে হবে, লেখাটি পত্রিকা কর্তৃপক্ষের পছন্দ হতে হবে, তবেই না তা প্রকাশ পাবে। তবে আমি বলি- অধিক সত্য হলে, জনগণের কথা হলে, জনস্বার্থে হলে, প্রশাসন ও সরকারে বিপক্ষে হলে, অনেক পত্রিকায়ই লেখা ছাপতে বিরত থাকেন। পাশাপাশি এটাও বলতে হয়, অনেক পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশক সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে শত শত মামলাও দায়ের রয়েছে। সেকারনে আমাদেরকে বলতেই হবে মিডিয়ার বিষয়ে আমাদের কোন পক্ষেরই স্বচ্ছতা নেই।

 

প্রতিটি গণমাধ্যমের, তা কাগুজে বা ইলেকট্রনিক যাই হোক না কেন, নিজস্ব নীতিমালা থাকে এবং এ নীতিমালা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য। এর পাশাপাশি নীতিমালা সত্য, গণমুখী ও ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশে সহায়ক হওয়া উচিত। সম্প্রতি দেখা গেছে, সরকারের একান্ত অনুগত দু-একটি কাগুজে, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যম আমাদের দেশের একটি প্রধান দলের নেতার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী একটি বৃহৎ দেশের প্রধান দলের সভাপতির টেলিফোনে কথোপকথন হয়েছে কী হয় হয়নি, তা নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশে সচেষ্ট ছিল। এসব ক্ষেত্রে মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছার কাছে সংবাদকর্মীদের ইচ্ছা পরাভূত বিধায় বাস্তব সত্য জানা থাকা সত্ত্বেও তারা মালিকের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারেননি। আর এ কারণেই দেখা গেছে, আমাদের দেশের প্রখ্যাত একজন লেখক, যিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী, সম্প্রতি তিনি ঢাকায় অবস্থানকালীন কোনো এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, আমাদের দেশে বর্তমানে সম্পাদক নেই। আর সম্পাদক হিসেবে যারা আছেন তারা হলেন কর্পোরেটদের ম্যানেজার। সেদিন সভাস্থলে উপস্থিত তাৎক্ষণিক কেউ তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি এবং অদ্যাবধিও কেউ তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে কোনো সংবাদ বা নিবন্ধ প্রকাশ করেননি। তাই তার বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ নয় বা বাস্তবতা বিবর্জিত এমন ধারণা পোষণের অবকাশ নেই। আমাদের দেশ ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের শাসনাধীন থাকাবস্থায় সাংবাদিকদের মালিকানাধীন খবরের কাগজ সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বারবার চেষ্টা চালানো সত্ত্বেও খবরের কাগজের মালিকরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি। সেদিনও তাদের সামনে জেল-জুলুমের ভয় ছিল। কিন্তু আত্মমর্যাদায় বলিয়ান সেসব অকুতোভয় সম্পাদক ও সাংবাদিক তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রতি অবিচল থেকে নিজস্ব আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। আজ অনেকের মধ্যে অতীতের সেই আত্মত্যাগ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শ অনুপস্থিত।

 

গণতন্ত্র স্বাধীন সংবাদপত্রের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য-

যেখানে স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবাদপত্র রয়েছে, সেখানে মানুষ তার পছন্দমতো একটি সরকার পদ্ধতি বেছে নিতে পারে। স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্রহীন গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারে না।গণতন্ত্রহীন সমাজেই সংবাদপত্রের শুরু। সেই সমাজে সংবাদপত্রের দায়িত্ব ছিল সমাজকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত করা। মানুষের গণতান্ত্রিক আশা-আকাংক্ষাকে তুলে ধরা, গণতান্ত্রিক চেতনাকে শাণিত করা। তারপর এলো গণতন্ত্রের যুগ। একটি ভালো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদপত্র তার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিচিত্র কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করে। কিন্তু যেখানে গণতন্ত্র নেই অথবা থাকলেও আছে নামেমাত্র কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, সেখানে সংবাদপত্রের ভূমিকা খুব বড়। যে স্বাধীন দেশে সংবাদমাধ্যম স্বাধীন নয়, সে দেশের মানুষ স্বাধীন নয়। পৃথিবীর বহু স্বাধীন দেশের মানুষেরই এখন মুখে কাপড় বাঁধা এবং হাতে-পায়ে শেকল। কারণ তারা তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে না। কর্তৃত্ববাদী সরকার সংবাদপত্রকে স্বাধীনতা দিতে নারাজ। যদিও বহু কর্তৃত্ববাদী সরকার জনগণের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু মানুষ শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রাণী নয়। সে তার ভাত-কাপড়-বাসস্থান-চিকিৎসার বাইরেও আরও অনেক কিছু নিয়ে ভাবে। তার সেই স্বপ্নগুলোকে রাষ্ট্র মনে করতে পারে আপাতত অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভাবার এবং তার সেই ভাবনা প্রকাশের অধিকার হরণ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকা উচিত নয়। মানুষের স্বপ্নগুলোকে তুলে ধরার অর্থাৎ প্রকাশ করার অন্যতম প্রধান আধার বা পাত্র হল সংবাদপত্র। আধুনিক সংবাদপত্র শুধু সংবাদ প্রকাশের পত্র নয়। রাষ্ট্রের বাস্তবতা এবং জনগণের স্বপ্ন এই দুটি বিষয়ই তুলে ধরার কঠিন দায়িত্ব বর্তেছে সংবাদপত্রের ওপর।

উদার গণতন্ত্র ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্র যে দেশে আছে, সে দেশের মানুষ বিশেষ ভাগ্যবান। এমনকি মন্দ গণতন্ত্র যেখানে আছে, সেখানেও যদি স্বাধীন সংবাদপত্র থাকে তা মন্দের ভালো। ভালো এজন্য যে, জনগণ তাদের মতামতটা প্রকাশ করতে পারে। জনমতের চাপে অনেক সময় সরকার জনস্বার্থে কিছু কাজ করতে বাধ্য হয়। সামরিক বা অসামরিক স্বৈরশাসনের মধ্যে সংবাদপত্রের দায়িত্ব যেমন বেশি, ঝুঁকিও বেশি। জনস্বার্থে লেখালেখি করে যে কাগজ যত বেশি ঝুঁকি নেয়, সে কাগজের মূল্য তত বেশি। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিপদ থাকলে কোনো রকমে যোগ-বিয়োগ করে অস্তিত্ব রক্ষা করায় দোষ নেই। সংবাদপত্র একটি পণ্য। তা প্রকাশ করতে পুঁজির প্রয়োজন। তাতে লাভ-লোকসানের প্রশ্ন রয়েছে। ভালো লাগলে মানুষ তা টাকা দিয়ে কেনে। ভালো না লাগলে কিনবে না। প্রকাশককে লোকসান দিতে হবে। একালে সংবাদপত্র অন্যান্য শিল্পের মতো একটি শিল্পও বটে। কোনো শিল্পের মালিক লোকসান দেয়ার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করেন না। সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে অন্য পণ্যের শিল্পের পার্থক্য এখানে যে, সেসব ক্ষেত্রে মালিকের সামাজিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন আসে না। মানসম্মত পণ্য বাজারে ছেড়ে দিয়েই মালিকের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু শুধু মানসম্মত অতি সুন্দর একটি পত্রিকা বাজারে ছেড়ে দিলেই সম্পাদক-প্রকাশকের দায়িত্ব শেষ হয় না। পাঠক বিচার করে দেখবে ওই কাগজ জনগণ ও দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করছে।

জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে গেলে কায়েমি স্বার্থের বিরাগভাজন হতে হয়। কখনও দেশ ও জনগণের শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বিপদের ঝুঁকি নিতে হয়। ঝুঁকি সামাল দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন কঠিন বৈকি।

এখন শুধু সরকার সংবাদপত্রের জন্য বড় বিপদ নয়। সরকার ও সংবাদপত্র সহ-অবস্থান করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কায়েমি স্বার্থ ও সমাজবিরোধীরাই বর্তমানে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্রের জন্য বড় বিপদ। সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে এখন দেশে দেশে সাংবাদিকদের প্রাণ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কম সাংবাদিক প্রাণ দেননি। জেলজুলুম তো আছেই। আদালত অবমাননা ও মানহানির মামলার হয়রানির শেষ নেই। সরকারের চেয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীই সাংবাদিকদের সঙ্গে বিরক্তিকর আচরণ করেবেশি।স্বাধীনসংবাদপত্রকেও রাষ্ট্রের সঙ্গে, সরকারের সঙ্গে অথবা অন্য কোনো ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অল্প পরিমাণে হলেও আপস করতে হয়। শুধু সরকারের সঙ্গে নয়, ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গেও আপস করতে হয়। কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে ব্যবসার স্বার্থে আপস করতে হয়। সমাজের এলিটদের সঙ্গে একধরনের আপস না করে অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন। আপস শুধু সংবাদপত্রকে নয়, অন্যান্য প্রচারমাধ্যমকেও করতে হয়। আপস না করলে প্রচারমাধ্যম টিকে থাকতে পারে না। টিকেই যদি না থাকে তাহলে ভূমিকা রাখবে কীভাবে? যে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম যত বড় ও শক্তিশালী- তাকে সরকার ও কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে তত সাবধানি সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।

 

সময়ের প্রেক্ষাপট-

বর্তমানে গণমাধ্যম চার ভাগে বিভক্ত- সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, রেডিও ও অনলাইন মিডিয়া। তাছাড়া অনেক সংবাদকর্মী বর্তমানে ইউটিউবের সাহায্যে টেলিভিশনের মতো অনুষ্ঠান প্রচার করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছেন। অধুনা সামাজিক গণমাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ও টুইটার খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাসে অনলাইন পত্রিকা বিষয়ে সরকারের প্রথম সমালোচনার বিষয় ছিল এগুলোর সংখ্যা নিয়ে, দ্বিতীয় সমালোচনা এ ধরনের পত্রিকার অপসাংবাদিকতা নিয়ে। কিন্তু সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের কারণ দেখি না। গত ২৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, দেশে দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ বিভিন্ন পত্রিকার সংখ্যা ২ হাজার ৮১০টি। এ ছাড়া দেশে টেলিভিশন, বেতার, এফএম রেডিও ও কমিউনিটি রেডিওর সংখ্যা প্রায় ১৫০। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এবং যে দেশের অর্ধেক মানুষ শিক্ষিত, সেখানে এতো গণমাধ্যমের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে জোরেশোরে।  রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একই ঠিকানায় একাধিক পত্রিকার কার্য্যালয় যেমন আছে, তেমনি একই ছাপাখানায় অনেকগুলো পত্রিকাও ছাপা হচ্ছে। দেয়ালপত্রিকা নামে পরিচিত এসব ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকা যদি টিকে থাকতে ও সরকারের সুবিধা পেতে পারে, তাহলে অনলাইন পত্রিকাগুলোর সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখি না। মন্ত্রী জাতীয় সংসদে আরো বলেছেন,সংসদে প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে মিডিয়াভুক্ত দেশের ৫২৮ দৈনিক পত্রিকার তালিকা প্রদান করেছেন। সংসদে দেয়া মন্ত্রীর তালিকানুযায়ী ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৩শ’ প্রচার সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রচার সংখ্যার শীর্ষে রয়েছে। ৫ লাখ ১ হাজার ৮শ’ প্রচার সংখ্যায় দ্বিতীয় প্রথম আলো, ২ লাখ ৫০ হাজার ৮২০ প্রচার সংখ্যা নিয়ে তৃতীয় কালেরকণ্ঠ এবং ২ লাখ ২৩ হাজার ১০ প্রচার সংখ্যা নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে দৈনিক জনকণ্ঠ। এছাড়া প্রচার সংখ্যায় আমাদের সময় পঞ্চম, দৈনিক যুগান্তর ষষ্ঠ, দৈনিক ইত্তেফাক সপ্তম, দৈনিক সমকাল অষ্টম, দৈনিক ভোরের কাগজ নবম স্থানে রয়েছে।
ডিজিট্যাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার ভূমিকা-

২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বরের পর থেকেই আমাদের দেশটিতে ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়টি জাতীয়ভাবে অনুভব হতে থাকে। এরপর ২০১৬ সাল অবধি সাত বছরের সরকার পরিচালনায় আমাদের সরকার ও জীবনধারা ব্যাপকভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এক্ষত্রে দেশের পত্র-পত্রিকাগুলোও পিছিয়ে নেই। তারাও প্রিন্টিং এর পাশাপাশি অনলাই ভার্সণপ্রেকাশ করছে। এর ফলে পাঠকের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো। ডিজিট্যাল প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটায় পাঠকের সুবিধা হয়েছে। একই সঙ্গে এটিও অনুভব করা গেছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল অপরাধ করার প্রবণতাও বেড়েছে।
বর্তমান সভ্যতাকে বলা হয় ইন্টারনেট সভ্যতা। ইন্টারনেট মানেই অনলাইন। এই সভ্যতায় আমাদের যাত্রাকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমাদের স্বপ্ন আমরা ২০২১ সালের মাঝে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবো। আমরা এই সময়ে হতে চাই একটি সমৃদ্ধ-উন্নত মধ্য আয়ের দেশ, যাতে থাকবেনা দারিদ্র, থাকবেনা অশিক্ষা বা বৈষম্য। আমরা সেই স্বপ্নকে পূরণ করতে চাই ডিজিটাল প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সরকার এরই মাঝে আমাদের চারপাশের সবকিছুকে ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্য অর্জন এবং সার্বিকভাবে সারা দুনিয়ার মতো জাতিগতভাবে আমাদের ইন্টারনেট নির্ভরতাও প্রশ্নাতীত। ২০১৩ সালের জুন মাসের হিসাব অনুসারে দুনিয়ার ২৪০ কোটি ৫৫ লাখ ১৮ হাজার ৩৭৬ জন ইন্টারনেট ব্যবহার করতো, যার শতকরা ৪৪ ভাগই এশিয়ার। বাংলাদেশের অবস্থা দুনিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এদেশে ২০১৩ সালের জুন মাসে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিলো ৩ কোটি ৫৯ লাখ।প্রযুক্তিগত দিকে থেকেও ইন্টারনেট এখন আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন মানুষের জীবনযাপন, তথ্য আদান- প্রদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সরকার পরিচালনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ইন্টারনেট। লেখা, চিত্র ও শব্দ ও ইন্টারএ্যাকটিভিটি সহযোগে ইন্টারনেটে তথ্য ও উপাত্তকে এমনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব যা আর কোন মাধ্যমেই তেমনটা সম্ভব নয়। এটি একদিকে হতে পারে খবরের কাগজ, ব্যক্তিগত ডাইরী বা সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। অন্যদিকে ইন্টারএ্যাকটিভিটিসহ রেডিও, টিভি সম্প্রচারও এই প্রযুক্তিতে সম্ভব। এখনই বিভিন্ন ধরনের নিউজ পোর্টাল, নিউজ ব্লগ, আইপি টিভি, ইন্টারনেট রেডিও ইত্যাদি নানা ধরনের অনলাইন গণমাধ্যমের আবির্ভাব ঘটছে। দেশের বিদ্যমান কাগজ ও সম্প্রচারনির্ভর জাতীয় গণমাধ্যমগুলোও এখন ইন্টারনেটকে নির্ভর করছে এবং তাদের তথ্য-উপাত্ত ও সম্প্রচার ইন্টারনেটেও প্রকাশ করছে। ফলে ইতিমধ্যে বিরাজমান সকল গণ মাধ্যমের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে অনলাইন গণ মাধ্যম। বস্তুত দেশে অনলাইন গণ মাধ্যমের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এটি দিনে দিনে আরও বাড়তেই থাকবে। সেই প্রেক্ষিতটির প্রতি লক্ষ্য রেখে এখনই একথা বলা যায় যে, অনলাইনে প্রকাশিত গণমাধ্যমের বিষয়টিকে আর অবহেলা করা যায়না।বিদ্যমান অবস্থায় এইসব গণ মাধ্যম একদিকে কোন স্বীকৃতি বা সুযোগসুবিধা পায়না, অন্যদিকে গণমাধ্যমের জাতীয় মান রক্ষা করাও সম্ভব হচ্ছেনা। এটি এখন যেমন খুশি তেমন অবস্থায় চলছে। কোন আইন কানুন নিয়ম নীতি, নিবন্ধন ইত্যাদি এখানে বিদ্যমান নেই। এমন অবস্থা কোন মহলেরই কাম্য হতে পারেনা।এজন্যেই জাতীয় অনলাইন গণ মাধ্যমের স্বীকৃতি, মান বজায় ও নীতিনৈতিকতা গড়ে তোলার জন্য একটি জাতীয় অনলাইন গণ মাধ্যম নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে তা বাস্তবায়নের জন্য তৎপরতা চলছে।
এ সকল রূপান্তর বিবেচনা করলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে তাহলে কি একসময় সংবাদপত্রের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? না, তা নিশ্চয়ই নয়। যখন রেডিও চালু হয়, মানুষ মনে করেছিল সংবাদপত্র ধীরে ধীরে গৌণ প্রচারমাধ্যম হয়ে যাবে। তা হয়নি। যখন টেলিভিশন দেশে দেশে সম্প্রচার শুরু করল, তখন ভাবা হয়েছিল সংবাদপত্রের দিন শেষ। তা হয়নি। বরং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সংবাদপত্র নতুনতর প্রযুক্তির সাহায্যে আরও বিকশিত হয়েছে। এখন প্রচারমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন সমান গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। জনগণের এই তিনটিরই প্রয়োজন রয়েছে। সেটাই এ সময়ের দাবি। সুতরাং আমরা এ কথাও বলতে পারি, বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক- অনলাইন সংবাদপত্র, ফেসবুক, টুইটার, ওয়েবসাইট ইত্যাদিও এ যুগেরই দাবি। সংবাদপত্রও থাকবে, সেগুলোও থাকবে।আধুনিক রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ সংবাদপত্র। কোনো কিছুর একটি স্তম্ভ দুর্বল থাকলে গোটা জিনিসটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমকে সরকার দুর্বল করে রাখলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্রের ক্ষতি মানে জনগণেরই ক্ষতি- সরকারের ক্ষতি নয়। কোনো সরকারের লাভ-ক্ষতিতে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না।

সাংবাদিকদেরা দেশের চতুর্থ স্তম্ভ-

সাংবাদিকেরা দেশের চতুর্থ স্তম্ভ বলে বিবেচিত সে কারনে অপসাংবাদিকতা বা হলুদ সাংবাদিকতা রোধে অনলাইন নিউজপোর্টাল এবং সাংবাদিক রেজিষ্ট্রেশন আওতায় আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার।এদিকে অনলাইন নিউজপোর্টালের নিবন্ধন পাশাপাশি সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। সারাদেশে সাংবাদিকদের রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হবে এবং সনদ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। সারাদেশে সাংবাদিকদের রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি সনদও দেয়া হবে। ওয়েবসাইটে সাংবাদিকদের নাম ও ছবিসহ তালিকা থাকবে। সাংবাদিকদের শপথ নিতে হবে। অন্যায় করলে সনদ বাতিল করা হবে। এর মাধ্যমে আশা করা যায় হলুদ সাংবাদিকতা কমে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। হলুদ সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকের পরিচয়পত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এটি করা গেলে স্কুল পাসসহ যে কেউ সাংবাদিক হতে পারবেন না। এছাড়া কোথাও সমস্যা হলে ওয়েবসাইট দেখিয়ে বলতে পারবেন তিনি সাংবাদিক। এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সতর্ক থাকতে হবে যাতে মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। এখানে কোনো ধরনের অপসাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিকদের দেশের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সে কারনেই এই আসনকে সমুন্নত রাখতে হবে। আমরাও  এর সাথে একমত পোষণ করি।

সমাপ্ত।

 

“এম’সি’এ আব্দুর রহমান স্মৃতি রক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশন” গড়ে তোলার প্রস্তাব

গত ২৬ ডিসেম্বর/২০১৫ ইং, রোজ শনীবার ছিল এম’সি’এ এ্যাডভোকেট আব্দুর রহমানের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। কৃতি এই মানুষটির দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকতে ‘শাহজাদপুরসংবাদ ডটকমের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলী। তাঁর পরিবারের সদস্য এবং নিকটজন সহ শুভাকাঙ্খিদের কাছে আমাদের দাবী। তার স্মৃতি প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে রাখা এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শন লালনের জন্য “এম’ সি’ এ আব্দুর রহমান স্মৃতি রক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তাবায়ন ফাউন্ডেশন” নামক একটি সংগঠন গড়ে তোলা হোক।

‘না ফেরার দেশে আব্দুর রহমান’

আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া প্রার্থনা করছি। তিনি ১৯৩৮ ইং সালের ১৩ অক্টোবর বৃহত্তর পাবনা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার হজরত মখদুম শাহদৌল্লা (রহঃ) এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়ীত শাহজাদপুরে জন্ম গ্রহন এবং ২০১৩ ইং সালের ২৬ ডিসেম্বর রোজ বৃহসপতিবার সকাল ৬ টা ৩৭ মিনিটে মৃত্যু বরণ করেন। তিনি ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেন্দ্রীয় গবেষণা পরিষদ’ এর প্রধান উপদেষ্টা এবং মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
কবিগুরুর কুঠিবাড়ী (কাছারি বাড়ী) এর দক্ষিন সীমা ছুয়ে যাওয়া “ছোট নদী’র লাগোয়া দক্ষিনে দিয়ার দশরথ প্রকাশ্য নাম কান্দাপাড়ায় বৃটিশ আমলে বিত্তবান সৎ ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান আকব্দুর রহমান। পিতা ঃ- মৃত ওয়াহেদ আলী শেখ, মাতা :- মৃত ময়ফুন নেছা । আব্দুর রহমান ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাদপুর হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। উত্তর বঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র্র পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পাঠরত অবস্থায় অসুস্থ হলে তাঁর শিক্ষায় ছেদ পরে। নানা মানষিক অহমিকা অতিক্রম করে সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্ত্তী হয়ে আয়ুবী সামরিক শাসনের সময় বৈষম্যের বিরুদ্ধে পোষ্টার লাগানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় লেখাপড়া আবার বন্ধ হয়ে যায়। ঐ সময়ে তিনি থানা আওয়ামীলীগের নেতা ছিলেন। আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ, তাঁত শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ততার মধ্যে পূনঃ সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্ত্তী হন। সে সময়ে তিনি সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের নেতৃস্থানীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নানা সরকারী মামলা ও তৎকালীন এস,ডি,ও (মহুকূমা প্রশাসক) বর্তমান বিএনপি নেতা জনাব ইনাম আহম্মদ চৌধুরী কতৃক কলেজ থেকে বহিস্কারের চক্রান্ত অতিক্রম ও কলেজ শিক্ষা শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়তে চলে যান। অর্থনীতির মত উচ্চমানের বিষয়ে লেখাপড়া করার মধ্যেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কে›ন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের নির্বাচিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কারাবন্দী শেখ মুজিব ও ৬ দফার পক্ষে প্রচারের জন্য পশ্চিম পাকিস্থানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সফর করেন। বিগত আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মন্ত্রী মুন্নজান সুফিয়ানের প্রয়াত স্বামী এস,এম হলের সহ-সভাপতি জনাব আবু সুফিয়ান তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন। ১৯৬৯’র ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের দায়িত্ব তিনি সফলতার সাথে পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিসংগ্রাম তথা ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের উনসত্তরের ১৮ ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর রসায়ন বিভাগের রিডার ড. সামসুজ্জোহা পাকি সামরীক বাহিনী বেয়নেট চার্জে নির্মমভাবে নিহত হন। ঐদিন আব্দুস ছাত্তার ও নূরুল ইসলাম নামক আরো দুইজন ছাত্র নিহত হয়। ছাত্র/ছাত্রীদের জীবন রক্ষার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যকোন শিক্ষক জীবনদান করেন নাই। তিনি সবসময় বলতেন, সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে ড. জোহার শহীদ দিবস (১৮ ফেব্রুয়ারী) ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস’ ঘোষিত হতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছারাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় শ্রদ্ধা নমিত পালন করে থাকেন। সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদ, পাবনা জেলা ও সিরাজগঞ্জ মহুকূমা ছাত্রলীগ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে তিনি যে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন,তা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি ও সফলতার সহায়ক হয়েছে। সব কিছুতেই তার অবদান অনস্বীকার্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহ-ভালবাসা তাঁকে পুনঃ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্ত্তী হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পূর্বে স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা বিষয়ে যে গুটিকয়েক মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন- তার মধ্যে আব্দুর রহমান অন্যতম। গভীর রাতের এ আলোচনায় তাঁর অন্যতম স্নেহস্পদ জনাব আব্দুর রাজ্জাক প্রতিদিন এবং জনাব তোফায়েল আহম্মদ অনেকদিন উপস্থিত থাকতেন। আব্দুর রহমানের অনেক প্রশ্নের জবাব বঙ্গবন্ধু সন্তষ্ট চিত্তে প্রদান করতেন। ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রাম তিনি আব্দুর রহমানকে পাঠিয়েছিলেন। রাত্রি ০০০১ মিনিটে প্রেরীত ঐ টেলিগ্রামে লেখা ছিল, “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহবান জানাই, আপনারা যে খানেই থাকুন, যে কোন মূল্যে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্থানী সৈন্যকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত রাখুন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হন । জয়-বাংলা। শেখ মুজিবুর রহমান”। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ১৯৭০’র নির্বাচনে মনোনয়ন দিলে তিনি সিরাজগঞ্জ -৭ আসন থেকে নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে মন্ত্রী সভার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। আব্দুর রহমান অর্থনীতিতে অনার্স সহ এম এ পাশ করেন। জাতির জন্য তা সমৃদ্ধ করার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য বুলগেরীয়ার রাজধানী সোফিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন। তিনি শতকরা ৯৮ ভাগ নম্বর পেয়ে সমাজতান্ত্রিক কৃষি অর্থনীতি তিনি ডিগ্রি প্রাপ্ত হন। পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তাঁকে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মহা-পরিচালক নিযুক্ত করেছিলেন।
মুক্তি সংগ্রামের মত মুক্তিযুদ্ধের তাঁর অবদান স্মরণ যাগ্য। যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে আয়েশী ধরনের কাজের প্রস্তাব দিলে তিনি যুদ্ধের কাজ চেয়ে নেন। সরকারী নির্দেশে জনাব এ,কে খোন্দকার তাঁকে সঙ্গে নিয়ে জলঙ্গী অপারেশন ক্যাম্পের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রেখে আসেন। একই সঙ্গে তাঁকে সেক্টর-৭, সাব সেক্টর-৪, বি-কয় এর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। তিনি বে-সামরীক প্রশাসন পাবনা-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক পরিষদের প্রচার সাব কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতির জনক নিহত হওয়ার পর আওয়ামীলীগ ছাত্রলীগ ও তাঁতশ্রমিক লীগের ৪০ জন নেতাকর্মী সহ তিনি দীর্ঘকাল কারাভোগ পর ১৯৭৯’র ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি মুক্তিলাভ করেন। সে সময়ে সরকারী প্রস্তাব গ্রহন করে দল বদল করলে তিনি অনেক আগেই উচ্চপদসহ মুক্তি পেতেন। সেই সময়ের এন এস আই এর নথিপত্রে এর সত্যতা মিলবে। তিনি স্ত্রী, ২ পুত্র, ৩ কন্যাসহ প্রধানতঃ পূর্বপুরুষের সম্পদের উপরই তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে জীবন যাপন করে গেছেন।। জীবিত থাকা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিম্বা অন্যকোন ধরনের সম্মানী ভাতা, বা সাহায্য সহায়তা গ্রহন করেননি। এ ভাতা গ্রহনকে তিনি এবং তাঁর পুত্র কন্যারা অমর্য্যাদাকর মনে করতেন। তিনি বলতেন, নিজস্ব অর্থ সম্পদ ব্যায় করে মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে জীবনের প্রায় সব মূহুর্ত ব্যয় করেছি। কোন দয়া, দান বা সহায়তার নীচতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বলতেন,আমার দেশ প্রেম বিক্রয়যোগ্য নয়। তিনি মনে করেন, প্রকৃত মুক্তিসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা যেহেতু দেশের জন্য জীবনদান স্বীকার করেই জীবন শুরু করেছেন সেই জন্য তাঁদের পক্ষে অঢেল অর্থ সম্পদ অর্জন, এমনকি তা সৎ পথে হলেও শহীদ,মৃত লাঞ্ছিত মা-বোন, নির্যাতিত রাজনৈতিক কর্মী ও মানবতার প্রতি অ-মানবিক ও চরম নিষ্ঠুরতা।
তথ্য উপস্থাপনে :- বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার।

টেগর গ্যেটে পিস ইউনির্ভাসিটি থেকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়// প্রত্যাশা-প্রতিক্ষার দুই দশক পর শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

6-5-15-vaskarjo

-আবুল বাশার-
বিশ্বকবি রবীন্দ্র ঠাকুরের ১৫৪ তম জন্মজয়ন্তী উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন এবং প্রিয় কবির স্মরণে তাঁরই নামে “রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের” ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে শুভ আগমন ঘটবে। আগামি ২৫ শে বৈশাখ, ৮ মে শুক্রবার তিনি আসবেন। এ খবরে বৃহত্তর পাবনা (পাবনা+সিরাজগঞ্জ) জেলার সকল প্রান্তে মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের বণ্যা। এ খবরে শুধু বৃহত্তর পাবনা নয় উত্তর বঙ্গের শিক্ষানুরাগী মানুষের মাঝে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। আর্ন্তজাতিক মানের এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাঝ দিয়ে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নব উদ্যোম ও উদ্যোগের দ্বার উন্মোচিত হবে এটাই মনে করছেন সবাই। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল এ অঞ্চল বাসীর। আশা প্রত্যাশার দোলা চলে দীর্ঘ দুই দশক পর এর বাস্তবায়ন ঘটছে।
মখদুম শাহদৌল্লা ও বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথের পদস্পর্শিত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাদপীঠ শাহজাদপুরে কবির স্মরণে তাঁর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হোক এ প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল এলাকার শিক্ষানুরাগী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নানাভাবে নানাকৌশলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। ২০০৭ সালে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জেলার রবীন্দ্র-ভক্ত শিক্ষানুরাগীরা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারিবাড়ীকে ঘিড়ে কবির ১৪৮তম জন্মবার্ষিকির অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের স্মরণে কবিগুরুর নামে ‘রবীন্দ্র্র বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের জন্য প্রস্তাবনা পেশ করেন। বিষয়টি পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পায়। এরপর থেকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন উদ্যোগ এবং প্রত্যাশা প্রতিক্ষার দুই দশক পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বিষয়ে কোন নিশ্চিত খবর পাওয়া যাচ্ছিলো না। এর আগে রবীন্দ্র দর্শনের আলোকে দেশের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য শাহজাদপুরের একজন স্বনামধন্য জ্ঞানতাপস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য্য প্রয়াত ড. মাযহারুল ইসলাম শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিয়েছিলেন। তিনি এলাকার শুধীজন রবীন্দ্র-প্রেমিক ও মানবতাবাদীদের সাথে নিয়ে এ উদ্যোগ গহন করেছিলেন। এ উদেশ্যে ১৯৯২ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয স্থাপন আইনের আওতায় ১৯৯৫ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়ন এলাকার সাতবাড়ীয়া গ্রামে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জার্মান কবি গেটের স্মরণে ‘টেগর গ্যেটে পিস ইউনির্ভাসিটি’ নামে একটি প্রাইভেট বিশ্বদ্যিালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময়ে দেশের খ্যাতনাম ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয় ট্রাষ্টিবোর্ড। প্রখ্যাত একাডেমিসিয়ানদের নিয়ে গঠন করা হয়েছিল একাডেমিক কাউন্সিল। তত সময়ে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল প্রয়াত ড. মযহারুল ইসলামকে। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য ঐ সময়ে সত্তর কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছিল। বিধি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য যথা নিয়মে আবেদনও করা হয় বিশ্বদ্যিালয় মঞ্জুরী কমিশনের কাছে। পরবর্তীতে নানা জটিলতার কারনে শেষাবধি ‘টেগর গ্যেটে পিস ইউনির্ভাসিটি’ স্থাপনের উদ্যোগ থেমে যায়নি। ড. মযহারুল ইসলামের মৃত্যুর পর এলাকাবাসী নতুন উদ্যোমে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য কাজ শুরু করে। এরপর এলাকাবাসী ও দেশবাসীর প্রত্যাশা পুরুনে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করে। অগ্রজদের পথ পরিক্রমা পেড়িয়ে অবশেষে রবীন্দ্র নাথের নামে একটি পূর্নাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার আনুষ্ঠানিক ও কার্যকর পদযাত্রা শুরু হবে।
বাংলাদেশে ৩৫তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের স্মরণে “রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে এমন একটি চমকপ্রদ এবং আনন্দের খবর ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারী জাতীয় দৈনিক সমকালে প্রকাশ পয়েছিল। এরপর একাধিক জাতীয় দৈনিকে খবরটি প্রকাশ পায়। খবরে জানাগিয়েছিল, গত ৫ ডিসেম্বর (২০১২) শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে পত্র দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি চূাড়ান্ত সিন্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ীতেই হবে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাস। একই সঙ্গে আরও দুটি ক্যাম্পাস কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ও নওগার পতিসরে থাকবে। এ খবরটি যারা সে সময় পত্রিকায় পড়েছিলেন এবং শুনেছিলেন এমন জ্ঞানপিপাসু, শিক্ষানুরাগী প্রতিটি বাঙালির প্রাণে ও অনুভূতিতে নতুনভাবে সারা জাগিয়েছিল। সে সময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের সার্ধশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহারে বাংলাদেশে একটি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিন্ধান্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথভাবে অর্থায়নে এ বিশ্বদ্যিালয়টি প্রতিষ্ঠা পাবে বলে উল্লেখিত ছিল। কবির স্মরণে তাঁরই আদিপুরুষদের পূন্যভূমি পূর্ব বাংলায় তাঁর নিজস্ব দর্শনের আলোকে, শান্তিনিকেতনের আদলে প্রতিষ্ঠা পেতে যাওয়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্য ছারাও পাঠ্যক্রমে কলার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বানিজ্য অনুষদও থাকবে বলে প্রকাশ করা হয়েছিল। এ খবরটি নতুন প্রজন্মের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিল আনন্দের এবং উৎসাহের আগাম বার্তা। ভারত এবং বাংলাদেশের যৌথ সিন্ধান্ত ও অর্থায়নে শাহজাদপুরে ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের চূড়ান্ত সিন্ধান্ত ঘোষনা করার পর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌর এলাকার বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের বিসিক বাসষ্ট্যান্ডে স্থাপন করা হয় রবীন্দ্র্র ভাস্কর্য। এ ঘোষনার পর বাঙালির প্রত্যয় ও প্রত্যাশা অনেকটা কবিগুরুর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার ছন্দের মত ছিল,– আজি এ প্রভাতের রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে/ প্রভাত-পাখির গান।………… ওরে,চারিদিকে মোর /এ কী কারাগার ঘোর!/ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর!/ ওরে, আজ কী গান গেয়েছে পাখি,/ এসেছে রবির কর!
আগামী ২৫ বৈশাখ থেকে ২৭ বৈশাখ তিনদিন ব্যাপি কবিগুরুর ১৫৪ তম জন্মজয়ন্তী উৎসব বাংলাদেশের কবির স্মৃতিবিজড়ীত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ নওগার পতিসর ও শাহজাদপুর কাছারিবাড়ীতে জাতীয়ভাবে পালিতে হবে। প্রতিবছর এ তিনটি স্থানের অনুষ্ঠানমালা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জাতীয়ভাবে পালিত হলেও সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রলয়ের আয়োজনে জাতীয় অনুষ্ঠান পালিত হতো ঢাকায়। এ বছর এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। এ বছর সংস্কৃকি বিষয়ক মন্ত্রনালয় আয়োজিত তিন দিন ব্যাপি মূল অনুষ্ঠানমালা পালিত হবে শাহজাদপুরে। এর জন্য চলছে ব্যাপক আয়োজন। পরিচ্ছন্নতা ও আলোক সজ্জার মাঝ দিয়ে নতুন সাজে ও উদ্যোগে সেজে উঠেছে শাহজাদপুর ও তার আশেপাশের সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলি। শাহজাদপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজন চলছে বিশাল মঞ্চের। যেখান থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনতার উদ্যেশে তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন। শাহজাদপুরের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশাল মঞ্চ হবে।
কেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ?
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যলয় স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে নানামুনির নানা মত থাকলেও রবীন্দ্র দর্শনের সঙ্গে বাঙালির জীবনসমৃদ্ধির যে সম্পর্ক রয়েছে এটি অস্বীকার করবার কোন কারন নেই। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এর শ্রেষ্ঠ প্রমান হিসেবে আমাদের সামনে সাক্ষ্য বহন করছে। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁরই স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে পারাটা অনেকটা ঋন পরিশোধের দায়ভার মুক্ত হতে পারার আনন্দও বটে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে হঠাৎ করেই যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী রাষ্ট্র ও সমাজ ও রাজনীতি অর্থনীতি সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শান্তি ও প্রগতির পথে আমাদের অবস্থান কোথায় রয়েছে ? ইতিহাসের বিবর্তন ধারায় এ পরিবর্তন মানুষ ও প্রকৃতির কল্যাণে কতটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে ? বিষয়টি নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে । একপক্ষ দাবী করছেন মানব সভ্যতা এগিয়ে চলেছে। অন্য পক্ষ বলছেন আমরা ক্রমাগত পিছনের দিকে যাচ্ছি। বিষয়টি দার্শনিক বিবেচনায় এবং দর্শনের আলোকে আমাদেরকে বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের দর্শণ অনুসরনীয়। জাতিগত বাঙালিরা যদি বিষয়টির গভীরে অনুসন্ধানে আগ্রহী হয় সে ক্ষেত্রে পিছনের সত্য ইতিহাসকে খুঁজে বের করা উত্তম বলে বিবেচিত হবে।
আমাদের অগ্র-পশ্চাত রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,ভারতবর্ষের মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতী (হিন্দু-মুসলমান) তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত পকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। নানা বৈষম্য ও শোষন-বঞ্চনার কারনে রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্থান টিকে থাকতে পরেনি। বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনার উন্মেষ ঘটার মধ্যদিয়ে শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে ১৯৭১ সালের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের আত্নহুতি,২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিলো। জাতীয়তাবাদের প্রথম ভিত্তি রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস এমনটাই সাক্ষ্যবহন করে। বৃটিশ শাসনামলে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হতে ১৯১৭ সালে জাতীয়তাবাদের ওপর ইংরেজি বক্তৃতায় রাষ্ট্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি ডিমের খোসার সঙ্গত উপমাটি ব্যবহার করেছিলেন। রাষ্ট্রের কাজ ডিমের খোসার মতো- বলেছিলেন তিনি। আর ওই খোসার উপযোগিতা যে একেক পক্ষের কাছে একেক রকমের- সেটাই ছিল তাঁর উল্লেখ করার মত বিশেষ বিষয়। ডিমের ভেতরের স্থানটির জন্য খোসাটি কাজ করে নিরাপত্তাদাতার; কিন্তু প্রাতরাশকারীর জন্য খোসার উপকার একেবারেই অন্য প্রকারের। পরাধীন ভারতবর্ষে যে রাষ্ট্রকে রবীন্দ্রনাথ নির্মম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জেনেছেন সেটি প্রাতরাশকারীরই কাজে লেগেছে, ছানার কোনো উপকার করেনি।
স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের দীর্ঘ ৪৪ বছর উত্তরণের পর আমাদের নির্মম অভিজ্ঞতা এই যে, রাষ্ট্র এখনো প্রাত রাশকারীদেরই কাজে লেগে রয়েছে, তাদের স্বার্থেই ব্যবহার হচ্ছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ব্যাপকসংখ্যক জনগোষ্ঠি ছানারা এখনও শোষিত বঞ্চিতই রয়ে গেছে। তাদের কোন উপকার আসছে না। শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ, সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি, শান্তিপূর্ণ সহবাস্থানসহ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নামক রাষ্টের সৃষ্টির জন্য বাঙালিজাতী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোন অবস্থানে আমরা রয়েছি ? এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চরিত্র এবং চেহারাটা কি ? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্ন দু’টির উত্তর কারো অজানা নয়। আজকের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়িয়ে পরেছে। অর্থনীতিতে চলছে একধরনের লুটতরাজের প্রতিযোগিতা। সংস্কৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে বহুমুখী সংকট। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি- শোষক, লুটতারাজকারী,গণহত্যার পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগী, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনকারী, অগ্নীসংযোগ, ধর্ষণকারী পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর দোষর আলবদর, আলসামস্ সহ শান্তিকমিটির দালাল হন্তকদের মানবতাবিরোধী অপরাধের অপরাধীরা সবাই আমরা এককাতারে। আমাদের আলাদা করে দেখবার কোন পথ পাথেও বিদ্যমান নেই। বাঙাগালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীন বাংলাদেশ নামক যে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেই জাতি এবং জাতিরাষ্ট্র রক্ষার জন্যই আজকে রবীন্দ্র দর্শনের আলোকে আগামি প্রজন্মকে শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করার আশু প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
পরাধীন ভারতীয় মধ্যবিত্তের মনে স্বাধীনতার স্পৃহাকে গভীর করার ব্যাপারে অগ্রগন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন কবিগুরু। সে কারনে তাঁর গান ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে। একই কারনে তাঁর গান বাংলাদেশেরও জাতীয় সঙ্গীত হয়েছে, যদিও এ বাংলাদেশ সেই অবিভক্ত বাংলা নয়। তিনি তার রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে কখনো ঈশ্বরকে টেনে আনেননি। তিনি সর্বদা বলেছেন, ধর্মের চেয়ে মানুষ বড়। অন্যদের মত মানুষের দূর্ভোগের কারণ ঐশ্বরিক জগতে এমন দর্শনে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ যে ইতিহাসে বিশ্বাসী ছিলেন, সে ইতিহাস রাজা-বাদশার মারামারি, কাটাকাটির বিবরণ নয়। সেটি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের ইতিহাস। যে ইতিহাস জনগণ রচনা করে, কঠিন শ্রমে। মানুষের উন্নত রুচি বোধকেই প্রাধান্য দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি মনে করতেন, উন্নত রুচির মধ্যেই থাকে নৈতিকতা বোধ। ন্যায়-অন্যায়ের চেতনা না থাকলে মানুষ মহৎ হয়না, তা যতই বৃহৎ হোক না কেন কিম্বা উঁচু।
কবির চিন্তায়- প্রকৃতি হলো মানুষের অন্তরের গভীরে জন্ম নেওয়া এক সৃজন শক্তি, যা মানুষকে একটি স্থির কেন্দ্র দেয়। রবীন্দ্রনাথ মুক্তি খুঁজেছেন মানুষের চিরমুক্তিতে, তার প্রকৃতির অন্তরে নিজেকে স্থাপনের মধ্যে। মানুষের ভেতরের বিবর্ণতা, অথবা ধূসর-বাদামি রঙগুলো এবং ক্ষয় হতে থাকা জীবনশক্তিকে ছাপিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি যাচনা করেছেন সবুজকে। এই সবুজ- প্রকৃতির,চিত্তের, মানুষের আদি ঠিকানার। প্রকৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, প্রকৃতি শুধু উদ্ভিদ এবং জলহাওয়ার জগৎ নয়, এ প্রকৃতি মানুষের ভেতরে মহাকালের কোনো ছায়াপাতের একটি রূপ যাকে ধরা যায় না, ছোয়া যায় না, যাকে শুধু নিজের একান্তে অনুভব করা যায়। এর সবকিছুই রবীন্দ্রদর্শনের আংশিক কথা লিপি।
মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক
মোবাইল নং-০১৭১১-৯৪২২৯৬

নববর্ষ পহেলা বৈশাখ নিয়ে নানা কথা

12

আবুল বাশার :-আজ পহেলা বৈশাখ আজ থেকে শুরু হলো ১৪২২ বঙ্গাব্দ। বর্তমানে ২০১৫ গ্রেগরিয় সাল। এর সঙ্গে আকবরের সিংহাসন আহরণের বছর বিয়োগ করলে ৪৫৯ বছর পাই এবং এই বিয়োগ ফল ১৫৫৬ সালে যে হিজরি বছর ছিল ৯৬৩ তা যোগ করলে আমরা খুব সহজেই {(২০১৫-১৫৫৬)= ৪৫৯ বছর + ৯৬৩ হিজরি= ১৪২২ সন)} কাঙ্ক্ষিত বর্ষ পেয়ে যাই। উল্লেখ্য যে, ইংরেজি বর্ষ ও বঙ্গাব্দের মধ্যে ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১৩ দিনের ব্যবধান লক্ষ করা যায়। এ অনুযায়ী দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের ১৪ই এপ্রিল (১৩৬১ বঙ্গাব্দ) যুক্তফ্রন্ট সরকার নববর্ষ উদযাপনে প্রথম সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। যা বাংলাদেশে আজও বর্তমান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা একদিন পরে নববর্ষ উদযাপন করে। বাংলা সন-তারিখের এই অসামঞ্জস্যের ফলে একই ভাষাভাষী ও বঙ্গাব্দের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল জয়ন্তী, বসন্ত, বৈশাখ উদযাপন হয় ভিন্ন ভিন্ন দিনে। যার কারণে এই অত্যাধুনিক যুগেও বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি। এর জন্য বরং পশ্চিমবঙ্গের পণ্ডিতরাই দায়ী। কারণ ড.মেঘনাধ সাহার বিজ্ঞানসম্মত সংস্কার প্রস্তাব মেনেই বাংলাদেশে পঞ্জিকা সংস্কার করা হয়। পরবর্তীকালে ভারত সরকার ড. সাহার প্রস্তাবের কিছু সংশোধন করে এস. পি. পাণ্ডে কমিটি ১৪ই এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ নির্দিষ্ট করে দেন। কিন্তু পশ্চিমবাংলায় এই জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্মত সংস্কার এখনও স্থির হয়নি যা তাদের সরকার ও পণ্ডিতদের কূপমণ্ডুকতার পরিচয় বহন করে। এখন সময় এসেছে, বাংলা সনের অসামঞ্জস্য দূর করে বিশ্ববাঙালিকে একই যাত্রায় মিলিত করা। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, ভাষাবিজ্ঞানী প্রভূত পণ্ডিত ও বিদ্যানদের উচিত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। নয়তো বিশ্ববাঙালির বিশ্বজয়ে ‘মলমাসের’ দুর্গন্ধ থেকেই যাবে।

???????????

বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতামত। এই উপমহাদেশে পূজা-পার্বণের সঙ্গে চান্দ্র মাসের বেশ সামঞ্জস্য রয়েছে। আর সৌর মাস ঋতুভিত্তিক চাষাবাদের জন্য সহায়ক। এই বিতর্কের সমাধানে ১৯৫২ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা সর্বভারতে পঞ্জিকা সংস্কারের প্রস্তাব করেন। পূর্ববাংলায় ১৯৬৩ সালে ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ‘শহীদুল্লাহ কমিটি’ ড. সাহার সংস্কারকে মেনে নিয়ে চান্দ্র বর্ষপঞ্জির ধরনকে বাদ দিয়ে সৌর মাস অনুসারে বাংলা পঞ্জিকা তৈরি করার প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা সন চালুর ওপর বঙ্গবন্ধুর সরকার গুরুত্ব দেন। অবশেষে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে পূর্বোক্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ জারি হয়। কিন্তু লিপইয়ারসহ অন্যান্য অস্পষ্টতা ও জটিলতা থাকায় ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমির ‘বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কার কমিটি’ দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বাংলা মাস ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রামবাংলার মানুষের সম্পৃক্ততার কথা বিবেচনায় নিয়ে শহীদুল্লাহ কমিটির প্রস্তাবের অনুসমর্থনে গ্রেগরিয় ক্যালেন্ডারের ১৪ই এপ্রিলকে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৯৫ সালে বাংলা তারিখ পরিবর্তনের সময় মধ্যরাতকে ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জিকে বিশ্বজনীন রূপ দেওয়া হয়েছে। এত কিছুর পরও কি বিশ্ববাঙালির কাছে এই বিজ্ঞানভিত্তিক বর্ষপঞ্জিকা গৃহীত হয়েছে? তাহলে এর পেছনের কিছু কথা বলে নিই। এই মত এখন সর্বজন স্বীকৃত যে, সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আহরণের বছর ১৫৫৬ সাল ছিল ৯৬৩ হিজরি। আর এই হিজরিকে প্রথম বাংলা বছর হিসেবে ধরা হয়।

4

তবে এটি সর্বজনবিদিত যে, সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। ২৯ বছর রাজত্ব করার পর তিনি পঞ্জিকা ও বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। হিজরি সন ও সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছরকে যুক্ত করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়।বলা হয়ে থাকে যে ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য এই সন চালু করা হয়েছিল। হিজরি সন হলো চান্দ্রসন, চাঁদ দেখে গণনার ওপর এই সনের ভিত্তি। বাংলা সৌরসন। সৌরসনে দিনক্ষণ গণনা সহজ এবং এর একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি আছে। সম্রাট আকবরের উপদেষ্টা আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী বাংলা মাসের নামগুলো নক্ষত্রের নাম থেকে নিয়ে সৌরমাসের দিন মিলিয়ে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এ ব্যাপারে ১৫৮৫ সালের ১০ মার্চ সম্রাটের নির্দেশনামা জারি হয়। তবে এর কার্যকারিতা দেখানো হয় ১৫৫৬ সালের ১১ মার্চ থেকে। কারণ ওই দিনটি ছিল সম্রাট আকবরের সিংহাসনে বসার তারিখ। সেই থেকে শুরু।
এই গল্পের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলা বছর বা সালের উদ্ভব কী করে হল? এ সম্বন্ধে আবার মত আছে দুটি। বেশিরভাগ পণ্ডিতই একমত যে, ইসলামের হিজরি সন থেকেই বাংলা সালকে গ্রহণ করা হয়েছে। হিজরি সালের উৎপত্তি ৬৬২ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু হিজরিতে চান্দ্রবছর প্রচলিত ছিল। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর যখন সিংহাসনে বসেন, তিনি নাকি লক্ষ্য করেন চান্দ্র (চাঁদের কলার হ্রাস-বৃদ্ধি, কৃষ্ণ-শুক্ল দুই পক্ষে এক মাস) অনুযায়ী বছর ধরলে প্রশাসনের অসুবিধা হয়। তাই সৌর হিসাব গ্রহণ করে ৩৬৫ দিনের বছরে হিজরিকে রূপান্তরিত করেন এবং তখন থেকে অর্থাৎ ৯৬৩ সৌর হিজরি সালকে বাংলা ৯৬৩ সাল ধরে বাংলা সালের গণনা শুরু হয়। আরেকটি মত হল, বাংলা সালের উৎপত্তি হয়েছে বাংলার প্রাচীন হিন্দু রাজা শশাঙ্কের আমল থেকে, আনুমানিক ৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে। এটি কোনো ঐতিহাসিক তথ্যের দ্বারা সমর্থিত নয়, নিছকই অনুমান। শশাঙ্কের জীবনের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এ বছর যুক্ত নয়। বাংলা সালকে একটা হিন্দু চেহারা দেয়ার জন্য পেছন থেকে হিসাব করে ওই ৫৬৮ সালে পৌঁছানো গেছে, কিন্তু শশাঙ্কের জীবৎকালে হলেও ওই বছরেই কেন বাংলা সালের শুরু হল তা কেউ বলতে পারেননি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শশাঙ্কের রাজত্বকালে ওই বছরে ঘটেনি, তাহলে হঠাৎ নতুন সাল শুরু হতে যাবে কেন?

5

কৃষির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের ঘনিষ্ঠতা এ সন প্রবর্তনের সূচনা থেকেই। আদিকাল হতে এ আধুনিক যুগ পর্যন্ত কৃষিকাজের সঙ্গে ঋতুর রয়েছে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। ঋতুর ওপর ভিত্তি করেই হয় ফসলের চাষাবাদ। মুঘল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন বাংলা সনের। এর আগে মুঘল বাদশাহগণ রাজকাজে ও নথিপত্রে ব্যবহার করতেন হিজরী সন। হিজরী চান্দ্র বছর, যা ন্যূনধিক ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়। কিন্তু সৌরবছর পূর্ণ হয় ৩৬৫ দিনে। বছরে প্রায় ১১ দিন পার্থক্য হওয়ায় হিজরী সন আবর্তিত হয় এবং ৩৩ বছরের মাথায় সৌরবছরের তুলনায় এক বছর বৃদ্ধি পায়। ফসল উৎপাদনে ঋতুর ভিত্তিতে কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে হলে সারাদেশে একটি অভিন্ন সৌরবছরের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ ধারণা থেকেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ অথবা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নবেম্বর থেকে। আকবরের সভাসদ ফতেউল্লাহ খান সিরাজী বাংলা সন প্রবর্তনের কাজটি সম্পন্ন করেন। প্রথম এ সনের নাম ছিল ফসলী সন। পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
বাংলা সন যে হিজরী চান্দ্র সনেরই সৌররূপ তা সর্বজনবিদিত।
বাংলাদেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম। এই বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর হৃদয়-মনে বিম্বিত, গ্রন্থিত ও লালিত বিশ্বাসের শাশ্বত আলোকধারার চির সুন্দর উৎস থেকে উদ্ভূত ও উৎসারিত রুচিনীতি যে আলোকোজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন রুচিবোধের সুরম্য সড়ক নির্মাণ করেছে সেটাই এ দেশের মানুষের সংস্কৃতির আসল পরিচয়। একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সেই জাতির প্রকৃত পরিচয় বিশ্ব দরবারে সমুন্নত করে তোলে এবং সেই জাতির নিজস্বতাকে সুদৃঢ় বুনিয়াদের ওপর সংস্থাপিত করে। সেই বুনিয়াদের ওপর গড়ে ওঠা সুবিশাল সাংস্কৃতিক বলয় অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ থেকে, বিপরীতমুখী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে জাতিকে রক্ষা করে এবং সেই জাতির স্বকীয়তাকেও রক্ষা করে। সংস্কৃতির নানামাত্রিক উপাদান রয়েছে। সন বা বর্ষ গণনারীতি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রধান প্রধান উপাদানসমূহের অন্যতম। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সনগুলোর প্রচলন রয়েছে তা হচ্ছে হিজরী সন, বাংলা সন ও ইংরেজী সন। ইংরেজী সনকে সংক্ষেপে বলা হয় এডি যার, পূর্ণ বাক্য হচ্ছে অহহড় উড়সরহরং অর্থাৎ আমাদের প্রভুর বছরে। এই ইংরেজী সন আমাদের দেশে খ্রিস্টাব্দ হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ ইংরেজী সনকে ঈসায়ী সন বলার প্রয়াসী হন, কিন্তু মওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদীতে খ্রিস্টাব্দ ঈসাব্দ শীর্ষক আলোচনায় ঈসাব্দ লেখায় আপত্তি জানিয়ে বলা হয় যে, বাইবেলে বর্ণিত যিশুখ্রিস্ট এবং কুরআনে বর্ণিত হযরত ঈসার শিক্ষা ও জীবনের আদর্শ সম্বন্ধে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। বাইবেলের যিশু ও কুরআনের ঈসা দু’জন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যক্তি। খ্রিস্টাব্দকে ঈসাব্দ বলিয়া গ্রহণ করিলে উভয়ের অভিন্নতা স্বীকার করা হয়।
এই বাংলা নববর্ষের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। খুব সম্ভব বাংলা সনের সঙ্গে যোগ আছে বাংলা নববর্ষ পালনের। বাংলা সনের ভিত্তি হিজরী চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন। বাংলার তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়েছিল বাংলা সন। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, বাংলা সনের ভিত্তি কৃষি এবং বাংলা সনের শুরম্নর সময়টা কৃষকের খাজনা আদায়ের। যেমন, চৈত্রে বৃষ্টি হলেও কিন্তু কৃষক লাঙ্গল দেয় না খেতে, লাঙ্গল দেয়া হয় সাধারণত বৈশাখে। বৃষ্টির কামনাও সে জন্য। অবশ্য, চৈত্রে বৃষ্টি হলে একেবারে লাঙ্গল দেয়া হয় না সেটিও ঠিক নয়। যাই হোক, এখনও সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামের, তার নিজকর্ম সম্পাদন করেন বাংলা সনের নিরিখে। আর শহরবাসীরা জুলিয়াস ক্যালেন্ডারের নিরিখে।
বাংলা নববর্ষ নিয়ে এ যাবত অনেক গবেষণা হয়েছে। যে যুক্তিটি এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য তা হলো- মুঘলের তৃতীয় সম্রাট আকবর বঙ্গাব্দকে চান্দ্র (লুনার) সন থেকে সৌর (সোলার) সনে রূপান্তর করেন। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসলের মৌসুমের দিকে দৃষ্টি দিয়ে হিজরী মাসের বদলে বাংলা সনকে গ্রেগরিয়ান সোলার ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি রাখা হয়। চান্দ্র মাস বা হিজরী মাস গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে প্রতিবছর গড়ে ১১ দিন করে পিছিয়ে যায়। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী গড়ে ২৯ দশমিক ৫৩০৫৮৯ দিনে হয় এক মাস। ১২ মাস মিলে এক বছর হয় ৩শ’ ৫৪ দিন। আর সৌর বর্ষ বা সোলার ক্যালেন্ডারে এক বছর হয় ৩শ’ ৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। সম্রাট আকবর ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বাংলা সনকে সৌর সনের আওতায় নিয়ে আসেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় এই রূপান্তরে আকবরের দরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহ সিরাজী বড় ভূমিকা পালন করেন। ওই সময়ে ফসল ঘরে তোলা হতো অগ্রহায়ণে। অগ্রহায়ণেই খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা হয়। সে কালে অগ্রহায়ণই ছিল বাংলার প্রথম মাস। অন্যান্য মাসের নাম ওই সময়ের নক্ষত্রের নামের সঙ্গে মিল রেখে ঠিক করা হয়। যেমন বৈশাখ নাম এসেছে নক্ষত্র বিশাখা থেকে। বঙ্গাব্দ মুঘলী সন ও ফসলী সন হিসাবেও পরিচিতি পায়। দীর্ঘ সময় পরে বৈশাখ বাংলার প্রথম মাসে পরিণত হয়। বাঙালীর শেকড়ের সত্তায় বাংলা নববর্ষ এতটাই আনন্দের যে শহর বন্দরে আনুষ্ঠানিক দৃশ্যমান মেলার সঙ্গে বাঙালীর প্রতিটি ঘরে গ্রামের কিষাণ ও গৃহস্থ বাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক বন্ধনে অদৃশ্য মেলা বসে।
বাঙালির বর্ষপঞ্জি বা পঞ্জিকা বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। নববর্ষ উৎসব সব দেশেই সর্বজনীন উৎসব। সে জন্যই সমাজ বিকাশের ধারায় একটা উন্নত পর্যায়েই কোনো জাতির নববর্ষ উৎসব ও তার পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটে। তাই এর একটা ধারাবাহিক ইতিহাস থাকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের দিক থেকে ব্যাখ্যা করলে বাংলায় বর্ষবরণ ও বাঙালির বর্ষপঞ্জি উদ্ভাবনের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা অন্যান্য সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত প্রক্রিয়ারই পরিচয় বহন করে।
এ ক্ষেত্রে ইংরেজি ‘ক্যালেন্ডার’ শব্দটি মূলে লাতিন শব্দজাত। যত দূর জানা যায়, এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো : ‘হিসাব-বই’। অন্যদিকে, ইংরেজি ‘আলমানাক’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে বলে অনুমিত হয়। ‘আলমানাক’ যে অর্থ প্রকাশ করে তার বাংলা অর্থ করলে ‘পঞ্জিকা’ বলা যেতে পারে। ক্যালেন্ডার বলি, আর আলমানাক বলি_ দুয়েরই জন্মস্থান প্রাচীন মিসর। পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন পঞ্জিকা মিসরে প্রস্তুত হয়েছিল বলে পঞ্জিকাকে মিসরীয় সভ্যতার অবদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মিসরীয়রাই প্রায় ৬ হাজার বছর আগে চান্দ্র হিসাবের ভুল চিহ্নিত করে সৌর পদ্ধতির গণনা শুরু করে। নীলনদ-তীরবর্তী এই বাসিন্দারা অত আগে প্রায় ৩৬৫ দিনে বছরের হিসাবের খুব কাছাকাছি পেঁছেছিল। এখানে খুব তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো কৃষির সঙ্গে পঞ্জিকার অপরিহার্য সম্পর্ক। মিসরকে নীলনদের দান বলেছেন বিশ্বের প্রথম ঐতিহাসিক হেরোডেটাস। নীলনদের একদিকে সবুজ কৃষিক্ষেত্র, অন্যদিকে ধূসর মরুভূমি। নীলনদ না থাকলে মিসর কৃষি সভ্যতার জননীস্বরূপ হতে পারত না। অন্যদিকে, পাশ্চাত্যের সমুদ্রতীরবর্তী রোমে রোমান ক্যালেন্ডার (ইংরেজি ক্যালেন্ডার কথাটি ভুল। কারণ ওই ক্যালেন্ডারের সঙ্গে রোমের ক্যাথলিক ধর্মের সম্পর্ক ছিল_ প্রটেস্টান্ট ইংরেজরা তাই ওই ক্যালেন্ডার ১৭০ বছর পর্যন্ত গ্রহণ করেনি) বা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়ে তা পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বহাল থাকে। পরে সে ক্যালেন্ডারের ভুলভ্রান্তি শুধরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়। সে ক্যালেন্ডার এখন সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে চালু হয়ে গেছে।
আমরা জেনেছি, কৃষির সঙ্গে পঞ্জিকার সম্পর্ক নিবিড় ও অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ আমরা মিসরীয় ক্যালেন্ডার এবং ইউরোপের জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের কথা বলব। মিসরীয় সভ্যতায় বিশ্বের প্রথম যে ক্যালেন্ডার তৈরি হয় তাতে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির প্রভাবই ছিল প্রধান। কারণ কৃষি ঋতুনির্ভর। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ফসলের বীজ সংগ্রহ, বীজ বপন, ফসলের পরিচর্যা, ফসল কাটা_ সবকিছুই সময়মতো করা চাই। তাই চান্দ্র ক্যালেন্ডার কৃষির জন্য উপযোগী নয়। চান্দ্র ক্যালেন্ডারে বছরে সাড়ে ১০ দিনের হেরফের হয়। তাই চান্দ্র ক্যালেন্ডার (হিজরি ইত্যাদি) অনুসরণ করলে এ বছরে যখন ফসল বোনা হবে, তিন বছর পরে তা এক মাস পিছিয়ে যাবে। কৃষি উৎপাদন ও তার ব্যবস্থাপনায় তাই চান্দ্র ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে সৌর ক্যালেন্ডার প্রচলন হয়। মিসরীয় ক্যালেন্ডারেই এ সংশোধন করা হয়। বহু পরে (১৫৫২) ইউরোপের জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটি দূর করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চন্দ্র ও সূর্যের আবর্তনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়। ফলে জাগতিক কর্মকাণ্ড সূর্যের আবর্তননির্ভর বা ঋতুনির্ভর আর ধর্মীয় উৎসবাদি চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আসলে পঞ্জিকার মধ্যেও আমাদের সমাজ জীবনের ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ দুই সত্তাই একত্রে অবস্থান করাতে পঞ্জিকা জীবনের পূর্ণতারও প্রতীক।