শাহজাদপুরে কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণ

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ৯’শ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে এসব বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মোঃ শামসুজ্জোহার সভাপতিত্বে সার ও বীজ বিতরণের সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রফেসর আজাদ রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম প্রমূখ। উদ্বোধনী দিনে উপজেলার পোতাজিয়া ও গাড়াদহ ইউনিয়নের ১’শ ২০ জন কৃষকের মাঝে এসব সার ও বীজ বিতরণ করা হয়।

পাটের দুটি নতুন শাকের জাত উদ্ভাবন

এবার শাকের সঙ্গে সোনালী আঁশ পাটের দু’টি নতুন জাত যুক্ত হলো। জাত দুটি হচ্ছে বাংলাদশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) কর্তৃক সদ্য অবমুক্তকৃত-বিজেআরআই দেশি পাটশাক-২ (ম্যাড়া লাল) ও বিজেআরআই দেশি পাটশাক-৩ (ম্যাড়া সবুজ)। দীর্ঘ ৫ বছরর গবেষণায় জাত দুটি উদ্ভাবন করেন বিজ্ঞানী মো. জ্যাবলুল তারেক। বুনো পাট থেকে শাকের এ দুটি জাত উদ্ভাবন করা হয়।জ্যাবলুল তারেক বলেন, স্বাদ তিতাহীন বলে এটি অধিক সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। পুষ্টিগুণসম্পন্ন হওয়ায় মানুষের শাকের চাহিদা মেটানার পাশাপাশি পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে। শাকটি মালভেসি পরিবারের, যার বৈজ্ঞানিক নাম (Corchorus capsularis)।  নতুন পাটশাকের জাত দুটিতে গড়ে প্রায় ক্যালসিয়াম (২.১৫%), পটাশিয়াম (১.৬৪%), আয়রন (৭৯০.৫ মিলিগ্রাম/কেজি), প্রোটিন (২০.৫০%), ভিটামিন-এ (১২৬.৪৫ মাইক্রোগ্রাম/গ্রাম) এবং ভিটামিন-সি (৭৫.১৭ মিলিগ্রাম/১০০গ্রাম) বিদ্যমান।

এ সম্পর্ক গবেষক মো. জ্যাবলুল তারেক বলেন, দীর্ঘদিন বাংলাদেশ পাট গবষণা ইনস্টিটিউটের বাস্তবায়নাধীন পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা প্রকল্পে চাকরির সুবাদে প্রায়ই বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে গবেষণা মাঠ পরিদর্শন কিংবা মাঠ দিবসে যাওয়ার সময় এক ধরনের বুনো পাট দেখতে পেতাম। রংপুরের তৎকালীন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আইয়ুব খানের পরামর্শ নিয়ে গবেষণা শুরু করি। এই বুনো পাট থেকে উন্নত মানের আঁশ পাওয়া যায় কিনা সেটাই ছিল আমার গবেষণার লক্ষ্য। দেখা গেল, বীজ বপনের ৪০-৪৫ দিনের মধ্যই শাখা-প্রশাখা হয়ে ফুল-ফল আসতে শুরু করে। ফলে এ জাত থেক কোনা লাভজনক আঁশ পাওয়া সম্ভব হয় না। তব উক্ত প্রকল্পের আওতায় শাক হিসেবে ব্যবহারের লক্ষে নতুন করে গবেষণা চলতে থাকে। অবশেষে ৩ বছর ধরে গবেষণার পর এটি তিতাহীন সুস্বাদু সুমিষ্ট শাকের ন্যায় সকল পুষ্টিগুণ ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় অতি সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ম্যাড়া লাল ও ম্যাড়া সবুজ লাইন দু’টি শাকের জাত হিসেবে অনুমোদিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘এ কাজে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন উক্ত প্রতিষ্ঠানের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম, ড. মো. আইয়ুব খান, ড. মো. সামিউল হক এবং প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আবুল ফজল মোল্লা, ড. মো. শহিদুল ইসলাম। গবষণালব্ধ উপাত্ত বিজেআরআইয়ের প্রজনন বিভাগ কর্তৃক উপস্থাপনের মাধ্যমে জাত দু’টি পাটেরশাক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়া পুষ্টিমান ও অন্যান্য তথ্যসম্বলিত একটি গবষণা প্রবন্ধ Taylor & Francis গ্রুপের আমরিকান ভিত্তিক আন্তজার্তিক জার্নাল ‘International Journal of Vegetable Science’ এ ইতোমধ্য প্রকাশিত হয়েছে।’

তিনি আরও বলন, ‘বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী দিনের আলো নিরপেক্ষ স্বল্প জীবনকাল উদ্ভিদ বলে এটি সব ধরণের জমিতে প্রায় সারা বছর চাষ করা যায়। এমনকি এটি অল্পমাত্রার লবণাক্ত এলাকাতেও আবাদ করা সম্ভব। পোকামাকড় ও রোগবালাই কম হয় বলে ভালোভাবে পরিচর্যা করলে এই শাকগাছ থেকে কয়েকবার শাকপাতা সংগ্রহ করা সম্ভব। বীজ বপনের ২৫-৩৫ দিনের ভেতরই শাকপাতা সংগ্রহ করা যায় এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৩-৪ টন পাওয়া সম্ভব। বুনাজাত থেকে বাছাইকৃত বলে বর্তমানে এ শাক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ক্যানসার প্রতিরাধী উপাদান এবং পরিমাণ নির্ণয়র উদ্দশ্য গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

লোকসানের মুখে শাহজাদপুরের চরের বোনা আমন ধান, বাদাম ও তিল চাষিরা


যমুনার চরাঞ্চলে সাড়ে ৩’শ বিঘা জমির ফসল তলিয়ে গেছে

উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ও প্রবল বর্ষণে যমুনা, করতোয়া ও বড়াল নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী, গালা ও জালালপুর এ ৩ ইউনিয়নের যমুনার চরে নিন্মাঞ্চলের রোপণ করা সাড়ে ৩’শ বিঘা জমির বাদাম, তিল, বোনা আমন ধান, শাক-সবজিসহ উঠতি ফসল তলিয়ে গেছে। নিমিষেই এসব ফসল ডুবে যাওয়ায় ফলে চরাঞ্চলের কৃষকেরা অপূরনীয় লোকসানের তোপের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে শাহজাদপুর উপজেলায় ২২ হাজার ৮’শ ৭০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করা হয়। ইতিমধ্যে বোরো ধান কাটা প্রায় শেষ। কিন্তু চরের নিম্নাঞ্চলের কাঁচা, আধা-পাঁকা জামিতে রোপিত বোনা আমন ধান, বাদাম, তিল, সবজিসহ উঠতি ফসলের ক্ষেত হঠাৎ যমুনার বানের বানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের বুকভরা আশা বানের পানিতে হতাশায় পরিণত হয়েছে। একদিকে দ্রুত পানি বৃদ্ধি ও অন্যদিকে শ্রমিক না পাওয়ায় কাঁচা, অপরিণত ফসলও কেটে ঘরে তুলতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে এসব এলাকার কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও যমুনার চরাঞ্চলবাসী সূত্রে জানা গেছে, যমুনায় পানি বৃদ্ধির ফলে ইতিমধ্যেই উপজেলার যমুনার দুর্গম চরাঞ্চল সোনাতনী ইউনিয়নের সোনাতনী, চামতারা, ছোট চামতারা, বানতিয়ার, বানিয়া সিংগুলী, বাঙালা, ভাটদিঘুলিয়া, শ্রীপুর চরের প্রায় ২’শ বিঘা বোনা আমন ধান, বাদাম ও তিল পানির নীচে তলিয়ে গেছে। গালা ইউনিয়নের রতনদিয়ার, মোহনপুর, শিমুলকাদি চরের প্রায় ৮০ বিঘা বোনা আমন, বাদাম ও তিল বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া জালালপুর ইউনিয়নের জালালপুর, পাকুড়তলা, ঘাটাবাড়ী এলাকায় রোপিত প্রায় ৭০ বিঘা জমির বোনা আমন ও তিল, সবজিসহ উঠতি ফসল তলিয়ে গেছে। এতে চরাঞ্চলের কৃষকদের অবর্ণনীয় সাধিত হওয়ায় কৃষকেরা বুক ফাঁটা আর্তনাদে হা-হুতাশ করছেন।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো: আব্দুস সালাম জানান, ‘যমুনায় অকষ্মাৎ পানি বৃদ্ধিতে উপজেলার সোনাতনী,গালা ও জালালপুর ইউনিয়নের যমুনার চরাঞ্চল অধ্যুষিত নিম্নাঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৩’শ বিঘা জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে।

শাহজাদপুরে বোরো ধান সংগ্রহে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন

১ হাজার ৪'শ ১৫ জন

‘শেখ হাসিনা’র দর্শন কৃষকের উন্নয়ন’ এ শ্লোগানকে সামনে রেখে শাহজাদপুর উপজেলায় অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে। আজ বুধবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা খাদ্য শষ্য সংগ্রহ মনিটরিং কমিটির আয়োজনে লটারির মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রান্তিক ১ হাজার ৪’শ ১৫ জন কৃষক নির্বাচন করা হয়।

জানা গেছে, শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ৮ হাজার ৫’শ ১ জন কৃষকেরা সরকারের কাছে ধান বিক্রয়ের জন্য এ লটারিতে অংশ নেন। ২৬ টাকা কেজি দরে প্রতিজন কৃষকের কাছ থেকে ৩ মেট্রিকটন করে মোট ৪ হাজার ২’শ ৪৫ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করা হবে।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মোঃ শামসুজ্জোহা, সিরাজগঞ্জের সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ মাসুদুর রহমান, শাহজাদপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ মাসুদ হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী, কৈজুরী ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম, রূপবাটি ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম শিকদার প্রমূখ।

শাহজাদপুর উপজেলা খাদ্য শষ্য সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ইউএনও শাহ মোঃ শামসুজ্জোহা জানান, ‘প্রকৃত কৃষকেরা যাতে ন্যায্যমূল্যে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারে, সেজন্যই স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে আবেদন নিয়ে সরকারি বরাদ্দ মোতাবেক লটারির মাধ্যমে ১ হাজার ৪’শ ১৫ জন কৃষক নির্বাচিত করা হলো।

খাদ্য উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে চেষ্টা চলছে: কৃষিমন্ত্রী

করোনার কারণে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন আরও অনেক বাড়াতে হবে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, দেশে খাদ্য উৎপাদনে যে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে এবং উৎপাদনের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা আরও বেগবান ও ত্বরান্বিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আউশের জন্য বীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। আগামীর ফসল আমন ও রবি মৌসুমে বীজ, সার, সেচ প্রভৃতিতে যাতে কোন সমস্যা না হয় ও সংকট তৈরি না হয় সেজন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে।

সোমবার কৃষিমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন থেকে আমন ও রবি শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও সংস্থাপ্রধানদের সাথে অনলাইন সভায় এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে কোনো কোনো দেশে খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষও হতে পারে।

এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল ফলানোর নির্দেশনা দিয়েছেন জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, করোনার দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বর্তমান ধারা শুধু অব্যাহত রাখা ও তা আরও বেগবান ও ত্বরান্বিত করতে কৃষি মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করছে।

সভায় জানানো হয়, ২০২০-২১ অর্থ বছরে আমন আবাদের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৯ লাখ হেক্টর ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এক কোটি ৫৪ লাখ টন চাল।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো নাসিরুজ্জামানের সঞ্চালনায় সভায় অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. আরিফুর রহমান অপু, অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) কমলারঞ্জন দাশ, অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) মো. মাহবুবুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সায়েদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর, বাংলাদেশ কৃষি গবষেণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. নাজিরুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহ আলম, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম, কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক ড. এম. সাহাব উদ্দিনসহ অন্যান্য সংস্থাপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসকের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পরিদর্শণ; চরাঞ্চলের ১’শ হেক্টর ধান, বাদাম, তিল ও সবজির ক্ষেত প্লাবিত


যমুনায় অস্বাভাবিক পানিবৃদ্ধিতে ধানকাটা নিয়ে শাহজাদপুরের কৃষকেরা মহাবিপাকে!

আম্ফানের প্রভাবে সৃষ্ট উজানের ঢলে গত কয়েক দিনে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চলে রোপিত প্রায় ২০ হেক্টর কাঁচা-পাঁকা ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। এ বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে শাহজাদপুর উপজেলার প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর ধানের জমিসহ বৃহত্তর চলনবিলের বিভিন্ন উপজেলায় রোপিত বিপুল পরিমান ধান ও অন্যান্য ফসল বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সেইসাথে উপজেলার বিস্তৃর্ণ বাথান এলাকা প্লাবিত হয়ে গো-খাদ্যেরও তীব্র সংকট সৃষ্টি হবে। একদিকে পানি বৃ্িদ্ধ ও অন্যদিকে শ্রমিক সংকটে পড়ে ধান কাটা নিয়ে এলাকার হাজার হাজার কৃষক মহাবিপাকে পতিত হয়ে বর্তমানে প্রতিটি মুহুর্ত চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় কাটাচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এদিন রোববার দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহমদ বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পরিদর্শন করে বাঁধের সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ নির্দেশ দিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে শাহজাদপুর উপজেলায় ২২ হাজার ৮’শ ৭০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করা হয়। ইতিমধ্যে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট ১৪ হাজার ৮’শ ৭০ হেক্টর জমির পাঁকা, আধা-পাঁকা জামির ধান কাটতে এখনও কমপক্ষে ৭ দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কৃষকদের ধান ঘরে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এদিকে, যমুনায় পানি বৃদ্ধির ফলে ইতিমধ্যেই যমুনার চরাঞ্চলের চামতারা, ছোট চামতারা, বানতিয়ার, বানিয়া সিংগুলীতে রোপিত প্রায় ১’শ হেক্টর জমির ধান, বাদাম, তিল, পটল, কাঁচা মরিচ, করোলাসহ সবজির ক্ষেত প্লাবিত হয়েছে। এতে চরাঞ্চলের কৃষকদের অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলার সোনাতুনী ও হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের লূৎফর রহমান, আব্দুল মালেক, রমজান মোল্লা, রায়হান মোল্লা ও শুকচাঁদ মীরসহ স্থানীয় কৃষকেরা জানান,‘হঠাৎ করে যমুনায় পানি বৃৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ধানসহ সবজির ক্ষেত ডুবে গেছে। অধিক মজুরী দিয়েও ধান কাটা শ্রমিক না পাওয়ায় তারা নিজেরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পাঁকা, আধা-পাঁকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।’

এদিকে, উপজেলা কৃষি অফিসার মো: আব্দুস সালাম জানান, ‘যমুনায় গত ৩ দিনে ৬ ফুট পানি বৃদ্ধিতে প্রায় ২০ হেক্টর ধানের জমিতে পানি ঢুকেছে। ডুবে যাওয়ার আগেই কৃষকেরা এসব ধান কেটে ফেলছে। ধান কাটার জন্য সরকারি প্রণোদনার ১৬ টি ও বাইরে থেকে আনা আরও ৩০ টিসহ মোট ৫৬টি কম্বাইন্ড হার্ভেষ্টার দিয়ে দ্রুত গতিতে ধান কাটার কাজ চলছে যা সপ্তাহখানিকের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

অপরদিকে, বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পরিদর্শনকালে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন,‘শাহজাদপুরসহ চলনবিলাঞ্চলবাসী ও এ অঞ্চলের ফসলী জমিকে বন্যার হাত থেকে রক্ষায় এ বাঁধটি অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধের সুরক্ষায় পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে যথাযথ ব্যবস্থাগ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাঁধটি স্থায়ীভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’

তাড়াশে কৃষকের ভুট্টা তুলছে ছাত্রলীগ

শ্রমিকদের পাশে তাড়াশ ছাত্রলীগ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে কৃষকের ভুট্টা তুলে বাড়িতে পৌছে দিলেন স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বুধবার ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহবায়ক মোনায়েম হোসেন জেমস এর নেতৃত্বে উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের ধামাইচ গ্রামের কৃষক রঞ্জু প্রামাণিকের ভুট্টা তুলে বাড়ি পৌছে দেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এসময় ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহবায়ক মোনায়েম হোসেন জেমস বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্দেশনায় আমাদের প্রতিটি ইউনিটির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কৃষকের পাশে দাড়িয়েছে। দেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ধারাবাহিকা অব্যহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা সব সময় ঐক্যবদ্ধ। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত আছে। এসময় কৃষকের ভুট্টা তুলে দেন সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রাকন ফারুকী, সগুনা ইউনিয়নের ৬নং ওয়াড ছাত্রলীগের সভাপতি মিরন হোসেন, ইমতিয়াজ আহাম্মদ, শাহীন, বাধন, সেলিম, রবিন, বাদল প্রমুখ ছাত্রলীগ কর্মীরা।

শঙ্কায় স্থানীয় কৃষক


তাড়াশে ব্লাস্ট রোগে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের শীষ

তাড়াশে ব্লাস্ট রোগে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের শীষ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ব্লাস্টরোগের প্রাদুর্ভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানের শীষ। এ রোগের আক্রমণে গোড়া থেকে কালো হয়ে শত শত হেক্টর জমিতে ধানের শীষ মরে যাচ্ছে। এতে ব্যাপক ফলন হ্রাসের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।

গত এক সপ্তাহ ধরে হঠাৎ করেই উপজেলার ভোগলমান, আড়ঙ্গাইল, আসানবাড়ী, কোহিত তেঁতুলিয়া, বিনসাড়া, তালম, পাড়িলগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার ধানক্ষেতে এই রোগটি দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত জমি থেকে ধীরে ধীরে বিস্তারলাভ করে আশপাশের জমিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

উপজেলার পাড়িল গ্রামের কৃষক সেলিম বলেন, আমার কাটারিভোগ ধানে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করেছে। অনেক ওষুধ ছিটিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না। ভাদাসের মানসুর রহমান, আব্দুল মজিদ ও আসানবাড়ীর শাহ আলমসহ একাধিক কৃষক বলেন, বোরো আবাদ শুরুর দিকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তেমন কোন রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়নি। কৃষকরা ভাল ফলনের আশা করেছিল। কিন্তু ধানে পাক ধরার সাথে সাথে হঠাৎ করেই ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ ছিটিয়ে কোনও কাজ হয়নি। এতে ভয়াবহ ফলন বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শস্যভাণ্ডার খ্যাত চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলায় চলতি বছর বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে চাষ হয়েছে ২২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে এই অঞ্চলের কৃষকরা আবাদ করেছেন উচ্চ ফলনশীল ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৩৬, মিনিকেট, ভারতীয় জাত গুটি স্বর্ণা, কাটারিভোগ ও স্থানীয়জাত নাটোর, রণজিৎসহ বিভিন্ন প্রকার ধান।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিন বলেন, ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ ঠেকাতে প্রতি বিঘায় ১৬ লিটার বালাইনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে। প্রথম ডোজ দেওয়ার ১০ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। কিন্তু কৃষকরা কৃষি অফিসের পরামর্শ মেনে চলেন না। তারা তাদের মতো করে কাজ করার চেষ্টা করেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার লুৎফুন্নাহার লুনা বলেন, হঠাৎ করে আবহাওয়া পরিবর্তন, পরাগায়নের সময় বৃষ্টি কিংবা ঝড় হওয়ার কারণে কিছু জমিতে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। খবর পেয়ে আমরা আক্রান্ত জমিগুলো পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছি। নিয়মমতো স্প্রে করলে ব্লাস্ট রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু কৃষকেরা কোন পারমর্শই মানতে চায় না। এ রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।

সূত্রঃ বাংলা নিউজ ২৪

কৃষি-মৎস্যখাত ও জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব


খরস্রোতা করতোয়া শুকিয়ে এখন ফসলের মাঠ!

শামছুর রহমান শিশির : ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার যাতাকলে পড়ে এক সময়ের প্রবলা, প্রমত্তা, প্রগলভা, সমুদ্রের যোগ্য সহচারী, স্রোতস্বিনী করতোয়া নদী বর্তমানে যৌবন হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অতীতের তুলনায় উদ্বেগজনক হারে নীচে নেমে যাওয়ায় করতোয়া নদী শুকিয়ে নদীবক্ষে চলছে বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ। চলতি সেচ মৌসুমে করতোয়া নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী তীরবর্তী অঞ্চলের গভীর-অগভীর নলকূপ থেকে পর্যাপ্ত পানি প্রাপ্তি বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এ কারণে, দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশংকা করা হচ্ছে।

করতোয়া নদী নির্ভর শাহজাদপুরসহ উত্তর জনপদে সেচ কাজে ভ‚-গর্ভস্থ পানির অপরিকল্পিত ও অতিমাত্রায় ব্যবহার রোধ করা না গেলে কৃষি প্রধান বাংলাদেশ ভবিষ্যতে মহাসংকটের মুখোমুখী হবে বলে বিশেষজ্ঞরা হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। শুষ্ক মৌসুমে করতোয়াসহ দেশের নদ-নদীর বক্ষে পর্যাপ্ত পানির অভাবে দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্প, তিস্তা প্রকল্প, পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের সেচকাজ বিঘিœত হচ্ছে।

ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে মরুকরণ করার প্রক্রিয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ করায় বর্তমানে করতোয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে তীব্র নাব্যতা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলশ্রæতিতে, এসব নদ-নদীর বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য ছোট বড় ধূঁ-ধূঁ বালুচরের দিকে তাকালে হাহাকার করে উঠছে মন। কালের আবর্তনে, সময়ের পরিধিতে অনেক স্থানে করতোয়া নদীর পানিপ্রবাহ এলাকা অতীতের তুলনায় বহুলাংশে পেয়েছে। করতোয়ার শাখা নদী বক্ষে এক ফোটাও পানি দেখা যাচ্ছে না।

মরুকরণের বিরূপ প্রভাবে নাব্যতা সংকট, বাসযোগ্য পানির অভাব ও প্রতিকূল পরিবেশ বিরাজ করায় করতোয়া নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে প্রায় ৪০ প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে! এসব কারণে, করতোয়া নির্ভর কৃষক ও এলাকাবাসীর বুকভরা আশা ক্রমশঃ হতাশায় পরিণত হচ্ছে। এছাড়া করতোয়া নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন নৌ-চলাচল মারাত্বকভাবে বিঘিœত হচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

করতোয়া নদীর বিস্তীর্ণ জলসীমা শুকিয়ে ও সংকুচিত হয়ে প্রায় ৪০ দেশীয় জাতের ছোট বড় মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। মরুকরণের বিরূপ প্রভাবে করতোয়াসহ মিঠা পানির প্রায় ২০ শতাংশ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের বসবাস বিঘিœত ও প্রজনন বিপন্ন হচ্ছে। করতোয়াসহ এসব নদীতে মলা, ঢেলা, মৌছি, চ্যালা, সরপুঁটি, খসল্লা, ভ‚ল, বৌ, ঘাইর‌্যা, বাঁচা, পুঁটি, বায়েম, বাতাসি, কাজলী, বাইল্যা, রাণী, পবদা, টেংরা, পোয়া, মলা, ঢেলা, কাকিলা, চাঁন্দা, খলিসা, ছোট চিংড়ি, টাকি, চ্যাং, গোচি, চাপিলা, ভেঁদা, তারা, মেনি, তিতপুঁটি, খরকুটি, দেশীয় জাতের শিং ও কৈ, দারকিনা, পটকা, কাশ খয়রা, টাটকিনি, লোলসা, রায়না, তেলা টাকি, তারাবাইন, শালবাইনসহ মিঠা পানির দেশীয় এসব প্রায় ৪০ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তি’র পথে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেটিভ ন্যাচার (আইইউসিএন) এর এক সমীক্ষায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার বিরূপ প্রভাবে শাহজাদপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বুক চিরে প্রবাহিত খর¯্রােতা করতোয়া নদী এখন মৃতপ্রায়; ধুকছে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। হিমালয় থেকে প্রবাহিত এ নদী ঐতিহাসিকভাবে নানান রূপ-লাবণ্য আর মৎস্য সম্পদে ছিল সমৃদ্ধ করতোয়া। এই নদীটিই এ অঞ্চলের কৃষিতে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। করতোয়াই শাহজাদপুরসহ এ অঞ্চলের মানুষসহ প্রাণিকুলের ভেতর প্রাণ সঞ্চার করে। অথচ, নদীটি বহুমূখী কারণে হারিয়ে ফেলেছে যৌবন। করতোয়া নদীর দিকে তাকালে এখন বৃদ্ধ মানুষের রক্ত নালির মতো সরু মনে হয় । কালো রক্ত নালীর মতো নালা নর্দমার মতই বয়ে যায় শুষ্ক মৌসুমে করতোয়ার পানি। এক সময় নদীটি ছিল উত্তাল ¯্রােতঃস্বিনী। দূ’কুল ছাপিয়ে উত্তাল করতোয়া ধুয়ে দিত এ অঞ্চলের প্রকৃতিকে। নদীর বুকে রাজহাঁসের মতো ভাসতো বড় বড় নৌকা, ছোট বড় জাহাজ। সেই যৌবনা নদী এখন খাঁ খাঁ মরুভূমি। প্রাণহীন নদীর ওপর দিয়ে এঁেক বেঁেক চলে গেছে পায়ে হেঁটে চলার রাস্তার মতো পানি। মাটির গভীর থেকে পানি তুলে নদীর উপর চাষ করা হচ্ছে ধান।

প্রাচীন কাল থেকেই করতোয়া ছিল বানিজ্যিক ভাবে এবং উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ। ইতিহাসের পাতায় তাকালে অনেক কিছুই এখন স্মৃতি। ১১ শতকের শেষের দিকে সাহিত্যে কর্মে রয়েছে এর রূপ লাবন্য ও বাণিজ্যিক বর্ণনা। পৌÐ্রবর্দ্ধন রাজা পরশুরাম সংস্কৃত ভাষায় ধর্মীয় ভাবাবেগপূর্ণ একটি উৎকৃষ্ট কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যার নাম ‘করতোয়ার মাহাত্ম্য’। তাতে উল্লেখ এই করতোয়া নিয়ে এক অপূর্ব সাহিত্য! ‘করতোয়ার মাহাত্ম্য’- ‘পার্ব্বতী কহিলেন, হে প্রভু! নদীমধ্যে করতোয়া ও পৌÐ্রক্ষেত্র মাহাত্য শ্রবণ করিনাই। কোন্ কালে কি প্রকারে কোথা হইতে করতোয়া নদীর উৎপত্তি হইয়াছে, শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি; যদি আমাতে অনুগ্রহ থাকে তবে বিশেষ করিয়া বলুন; আর কাহা দ্বারা ও কি প্রকারেই বা সেই অত্যুত্তম পৌÐ্রক্ষেত্র প্লাবিত হইয়াছে, শুনিতে ইচ্ছা করি।’ মহাদেব বলিলেন- ‘হে দেবি! তোমার পাণিগ্রহণসময়ে হিমালয় কর্ত্তৃক যে সম্প্রদানীয় জল আমার হস্তে অর্পিত হইয়াছিল, ঐ জল আমার হস্ত নির্গত হইয়া পৃথিবীতে পতিত হয়, পরে করতোয়া নামে খ্যাত হইয়াছে।
যে করতোয়া একদিন বাণিজ্যের গতিময় পথ ছিল যার গা বেয়ে দূর দূড়ান্ত থেকে বনিকেরা ছুটে আসতো উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদে। পাট সমৃদ্ধ বাংলাদেশে এক সময়ে পাটের বৃহৎ বাজার ছিল করতোয়ার নদীর পাড়ে পাড়ে। এখান থেকে জাহাজ ভরে চলে যেতো দূর দূরান্তের দেশে দেশে। মৎস্য সম্পদ আহরণের করতোয়া এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এক আপন নাম। আগের দিনে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে উৎসব করে মাছ ধরতে মহিষের সিংহায় ফুঁ দিয়ে জানান দিয়ে বাউত, নামতো করতোয়ার পাড়ে ও শাখা নদীতে। পলো, ঢেলা জাল, ঝাঁকি জাল, ধর্ম জাল, ব্যার জালের ব্যবহার করতো নদী পাড়ের মানুষরা। এখন সবই প্রায় অতীত স্মৃতি।
জানা গেছে, প্রতি বছর ১ জানুয়ারী থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এসময় পানির অভাবে করতোয়া নদী এবং এর শাখানদী, খাল-বিল শুকিয়ে যায়। ফলে করতোয়া বিধৌত উত্তরাঞ্চলে শুরু হয় দুঃখ দুর্দশার পালা। প্রকৃতি নির্ভর কৃষিপ্রধান দেশের এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা হয়ে যায় মিনি মরুভূমি। দ’ুচোখ যেদিকে যায় সেদিকেই দেখা যায় ধূঁ-ধূঁ বালুচর। উজানে প্রতিবেশী দেশ ভারত ৫৩ টি নদ-নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রূদ্ধ করে দেওয়ায় সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যামলা বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে মরু অঞ্চলে পরিণত হতে চলেছে। ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার বিরূপ প্রভার পড়ায় পানির অভাবে শাহজাদপুরসহ উত্তর জনপদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে করছে ভারসাম্যহীন। এসব কারণে, করতোয়া শাখানদীসহ খাল-বিলের গতি প্রকৃতির প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। আমরা হারাতে বসেছি আমাদের অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য। আবহমান কাল থেকে গ্রামীণ জনপদের মানুষের প্রিয় সুস্বাদু দেশী মাছ এখন সোনার হরিণের মতো। এখন আর দেখা যায় না গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনুসঙ্গ নৌকা বাইচ, খরা জাল, সূতি ফাঁদ, সেঁচের মাধ্যম দাঁড়। মৎস্য ভান্ডার সংকুচিত হওয়ায় ও শুকিয়ে যাওয়ায় অসংখ্য মৎস্যজীবী বর্তমানে বেকার হয়ে পড়েছে। আবার অনেকেই পেশার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রকৃতি মূলত চারটি নদী-প্রণালীর স্রোতধারার ওপর নীর্ভরশীল। এই নদীগুলোকে ঘিরে শুরু হয়েছে ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়া। ব্রক্ষপুত্র-যমুনা নদী প্রণালী, পদ্মা- গঙ্গা নদী প্রণালী, সুরমা-মেঘনা নদী প্রণালী ও চট্রগ্রাম অঞ্চলের নদী প্রণালী এ চারটি নদী প্রণালীতে ১৭ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে স্রোতধারা প্রবাহিত হয়। অথচ এর মাত্র ৭ শতাংশ স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে বাংলাদেশে। এসব নদী প্রণালীগুলোর গতিপথ পরিবর্তন ও রূদ্ধ করার ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বরেন্দ্র এলাকা, বৃহত্তর রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়াসহ দেশের মোট ভূমির ১১ শতাংশ এলাকা। বাংলাদেশে আগত নদীগুলোর প্রধান যোগানদাতা ভূটানের উপ-নদীগুলোতে বাঁধ দিয়েছে ভারত। এতে ব্রক্ষপুত্র যে স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আগে তার প্রশস্ততা ১৫ কিলোমিটারের ওপর থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ২ কিলোমিটারের নীচে। ফলে প্রায় ১৩ কিলোমিটার বিশাল এলাকা জুড়ে বিরাজ করছে ধূঁ-ধূঁ বালুচর। এছাড়া ভারতের ফারাক্কা বাঁধও বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ, একইভাবে মেঘনার উজানে আসামের বরাক নদীতে কাছাড়-মনিপুর-মিজোরামে প্রায় শোয়া তিন’শ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন ড্যাম নির্মাণ, তেঁতুলিয়ার উজানে মহানন্দা নদীতে বাধ নির্মাণ, ভৈরবের উজানে নদীয়া জেলার করিমপুর থানার গঙ্গারামপুরের জলঙ্গী নদীতে রেগুলেটর ও ক্রসবাধ নির্মাণ, কুশিয়ারা নদীতে গ্রোয়েন নির্মাণ, গোমতীর উজানে মাথারানী নামক স্থানে বাঁধ নির্মান করে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় করতোয়াসহ নদ-নদীগুলো শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভারত অধিকাংশ নদ-নদীতে বাঁধ নির্মান করে শুধু করতোয়া নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকেই বাধাগ্রস্থ করেনি। একতরফা পানি প্রত্যাহারের জন্য আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনাও গ্রহন করেছে। ভারত এই পরিকল্পনায় গঙ্গা, ব্রক্ষপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ,করতোয়া ও মহানন্দা নদী থেকে এক তৃত্বীয়াংশ বা এর চাইতেও বেশী পানি প্রত্যাহার করে নেবে। ফলে করতোয়াসহ দেশের প্রায় সব নদ-নদীই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। নদী বক্ষে পানিপ্রবাহ এলাকা কমে গেলে সমুদ্রের লোনাপানি মিঠাপানিকে গ্রাস করবে। ভূ-গর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। ভূ-গর্ভের পানি নেমে যাওয়ার কারণে সেচ প্রকল্পে পানির প্রধান উৎস গভীর- অগভীর নলক‚প থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৭৫ শতাংশ পানি প্রাপ্তি মারাত্বকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শুধু কৃষিখাতে সেচকাজে পানির সংকট ছাড়াও গৃহস্থালী কাজেও পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। দেশের পানিসম্পদ বিষয়ক গবেষকদের মতে, ‘নয়-দশ বছর ধরে করতোয়া নদীর পানির স্তর ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তরেরও নীচে নেমে গেছে। সরাসরি এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে শাখা নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে। এ দুরবস্থার আরও একটি কারণ হচ্ছে করতোয়া নদী অববাহিকায় অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিমাত্রায় অগভীর নলকূপের ব্যবহার।’ জানা গেছে, করতোয়া নদী বিধৌত দেশের শষ্যভান্ডারখ্যাত উত্তরাঞ্চলে সেচকাজে প্রায় ১৫ সহস্রাধিক গভীর ও প্রায় দেড় লক্ষাধিক অগভীর নলকূপ ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি দুই কিউসেক গভীর নলক‚প থেকে পানির অপচয় রোধসহ ৪০ থেকে ৪৫ একর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। ড্রেনেজ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে পানির অপচয় রোধ করা হলে ওই একই গভীর নলক‚প থেকে প্রায় ১শ’ ৫০ থেকে ১শ’ ৬০ একর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব । করতোয়া বিধৌত উত্তরাঞ্চল ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ায় নির্মম, নিষ্ঠুর যাতাকলে পিষ্ট হয়ে এবং বিশেষত গভীর ও অগভীর নলক‚প থেকে অপরিকল্পিতভাবে অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনের ফলে করতোয়া নদীর পানির স্তর অতীতের তুলনায় স্বাভাবিকের চেয়ে ২০/২৫ ফুট নীচে নেমে গেছে। এতে মরা খালে পরিণত হয়েছে করতোয়া। চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি, মৎস্যখাতসহ প্রকৃতি নির্ভর বহুমূখী খাতগুলো যার বিরূপ প্রভাব সরাসরি পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। সেইসাথে, করতোয়াসহ বিল-নদী-নালায় প্রায় দেশীয় ৪০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। মিঠা পানির মাছের প্রায় ২০ শতাংশ প্রজাতির মাছের স্বাভাবিক বসবাস ও প্রজননক্ষেত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আবারও জীবিত হবে যৌবন ফিরে পাবে ঐতিহাসিক করতোয়া-এমনটাই দাবী এ অঞ্চলবাসীর।

ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি, মৎস খাতসহ প্রকৃতি নির্ভর বহুমূখী খাত


মন্তব্য কলাম : ‘মরুকরণের কু-প্রভাবে আবহাওয়া ও জলবায়ুর বৈরী আচরণ প্রসঙ্গে।’

শামছুর রহমান শিশির : বহুল প্রচলিত খনার বচন ‘চৈতে কুয়া ভাদ্রে বান, নরের মুন্ড গড়াগড়ি যান’ অর্থাৎ চৈত্র মাসে কুয়াশা আর ভাদ্র মাসে বন্যা হলে সেটা ‘মহামারী’ হবার ঈঙ্গিত বহন করে। ভারতের একতরফা মরুকরণ প্রক্রিয়ার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের দেশে ষড় ঋতুর বৈচিত্রময়তায় বিরূপ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে আবহাওয়া ও জলবায়ুর স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মাঝে মধ্যেই ছন্দপতন ঘটছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে আগত নদ-নদী ও উপনদীর মুখে বাঁধ, ড্যাম, রাবার ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে নদ-নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ রুদ্ধ করে দেয়ায় সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামল এ দেশ ক্রমান্বয়ে মিনি মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার যাতাকলে পড়ে শুষ্ক মৌসুমে স্রোতস্বিনী যমুনা, পদ্মা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ দেশের নদীগুলো ও এর শাখানদীসহ খাল-বিল শুকিয়ে যায় প্রতি বছর। ফলে নদ-নদী বিধৌত দেশে দুঃখ দুর্দশার পালা ভোগ করতে হয় দেশবাসীকে। প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় প্রকৃতি নির্ভর কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় মিনি মরুভূমিতে। দ’ুচোখ যেদিকে যায় সেদিকেই দেখা যায় ধূঁ-ধূঁ বালুচর। ওই চর দেখলে হাহাকার করে ওঠে মন। প্রতিবেশী দেশ ভারত নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে নদ-নদীগুলো অবস্থান করায় মরুকরণের কু-প্রভাব এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে করছে ভারসাম্যহীন। এসব কারনে এ অঞ্চলের নদীগুলোর গতি প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটছে। আমরা হারাতে বসেছি আমাদের অনেক গ্রামীন ঐহিত্য। আবহমান কাল থেকে গ্রামীন জনপদের মানুষের প্রিয় সুস্বাদু দেশী মাছ এখন সোনার হরিণের মতো। এখন আর দেখা যায়না গ্রামীন ঐহিত্যের অনুসঙ্গ নৌকা বাইচ, খরা জাল, সূতি ফাঁদ, সেঁচের মাধ্যম দাঁড়। মৎসভান্ডার সংকুচিত বা শুকানোর ফলে অনেক মৎসজীবী হয়ে পড়েছে বেকার। আবার অনেকেই পেশার পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ১৯৫৭ সালে জাতিসংঘের অধীনে ক্রুগ মিশন এর সুপারিশক্রমে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের লক্ষে ১৯৫৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যূৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ইপিওয়াপদা) গঠন করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ইপিওয়াপদা এর পানি উইং হিসাবে দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেঁচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কৃষি ও মৎস সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রধান সংস্থা হিসাবে কার্যক্রম শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-৫৯ মোতাবেক ইপিওয়াপদা এর পানি অংশ একই ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাইবো) সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা হিসাবে আতœপ্রকাশ করে। এরপর পর্যায়ক্রমে সংস্কার ও পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় পানি নীতি-১৯৯৯ ও জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা-২০০৪ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাপাউবো আইন-২০০০ প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের আওতায় মাননীয় মন্ত্রী,পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট পানি পরিষদের মাধ্যমে বোর্ডের শীর্ষ নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
জানা গেছে, নাব্যতা সংকট,বাস যোগ্য পানি ও প্রতিকূল পরিবেশ বিরাজ করায় উত্তরাঞ্চলের নদী থেকে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি’র পথে ! এসব কারণে এ অঞ্চলের নদী নির্ভর কৃষক ও এলাকাবাসীর বুকভরা আশা ক্রমশঃ হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। এছাড়া এসব নদীগুলোতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় একদিকে যেমন নৌ-চলাচল মারাত্বকভাবে বিঘিœত হচ্ছে,অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বেশ কয়েকজন প্রবীণ এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ছোট বেলায় তারা ভয়াল উত্তাল যমুনা, পদ্মা, করতোয়া, বড়াল, হুরাসাগর, নন্দকুজা, বেশানী, আত্রাই, গুমানী, গুর, ফকিরনী, শিববারনই, নাগর, ছোট যমুনা, মুসাখান, নারদ ও গদাইসহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর এপাড় (পশ্চিম) থেকে ওপারে (পূর্ব) তাকালে চোখে পড়তো দিগন্তছোঁয়া পানি আর পানি আর এখন চোখে পড়ে ধুঁ-ধুঁ বালু চর। আর এখন বিজলী বাতি জ্বলা জাহাজ তো দুরের কথা! পানির অভাবে পাল তোলা নৌকাও কালে ভাদ্রে চোখে পড়েনা। দেশের নদ-নদীগুলোর বিস্তীর্ণ জলসীমা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে ও বালির চরের প্রশস্ততা বাড়ছে। মরুকরণের কু-প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের জীব বৈচিত্র হুমকির সন্মুখীন হয়ে পড়েছে। মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এ অঞ্চলের কৃষক।
বিজ্ঞমহলের মতে, দেশের পানি হিস্যা আদায়ে বহুমুখী পরিকল্পনা ও কর্মপস্থার কথা বলা হলেও ভারতের সাথে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বছরের পর বছর শুধু সময়ই অতিবাহিত হচ্ছে। কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। এজন্য বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমায় যেভাবে নটিক্যাল মাইল যোগ হয়েছে ঠিক সেভাবেই আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেতে পারে। এর ব্যত্যয় হলে বর্তমানের উত্তরাঞ্চলের মিনি মরুভ‚মিগুলো পরিণত হবে বৃহৎ মরুভ‚মিতে। আবহাওয়া-জলবায়ু ও নদ-নদী বিশেষজ্ঞরা আমাদের দেশে আবহাওয়ার বৈরি আচরণের জন্য ভারতের মরুকরণ পক্রিয়ার কু-প্রভাবকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ কারণে মরুকরণের কু-প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে দেশের নদ-নদী বক্ষে সময়মতো পানি থাকছে না। ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি, মৎস খাতসহ প্রকৃতি নির্ভর বহুমূখী খাত যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। ’ – সমাপ্ত।