বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

শামছুর রহমান শিশির: ‘দিন যে আর কাটে না দাদা!মাটির জিনিস পত্তের ত্যেমন চাহিদ্যা নাই, কামও (কাজ) কুইমচ্যে, মাটির দাম বাইরচে, খড়ির (জ্বালানী) দাম বাইরচে। খালি হব পাইল্যেই খরচ বাইরচ্যে। অইন্য কোন কামও পারি ন্যা যে হেই কাম কইরত্যাম।এ্যাহন ডাইল,চাইলের যে দাম ওইছে তাতে কিবাবে হকগোলেক লিয়্যা সামনের দিনগুলো চইলব্যে, হেই দুঃচিন্ত্যায়ই কইরতেছি।’-হ্যাঁ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এমন বক্তব্য শুধু শাহজাদপুরের প্রাণনাথপুর পালপাড়ার এক হতভাগা মৃৎশিল্পীর নয় ! শাহজাদপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত মৃৎশিল্পীদের বর্তমানে একই হাল পরিলক্ষিত হচ্ছে। বংশপরষ্পরায় জেনে ও শিখে আসা ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন পেশা মৃৎশিল্পের ধারক বাহক শাহজাদপুরসহ আশেপাশের শত শত মৃৎশিল্পীদের অবস্থা বর্তমানে বড়ই করুণ। বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বর্তমানে মৃৎশিল্পীরা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। আর যারা এখনো এ পেশায় সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের খেয়ে না খেয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। জানা গেছে, বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক যান্ত্রিক যুগে তৈরিকৃত প্লাষ্টিক, এ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি জিনিসপত্রের আগ্রাসনে দেশের ঐহিত্যবাহী প্রাচীনতম মৃৎশিল্প বর্তমানে হুমকির সন্মুখীন হয়ে পড়েছে। এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত শত শত শিল্পীরা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাটির হাড়ি,পাতিল,স্যানেটারী ল্যাট্রিনের চাক, পাটা, খাদা, কোলা, সড়া, ব্যাংক, ঝাঝুর ছাকনা, চারি, কাটাখোলা, ভাপাপিঠার খোলা, সাতখোলা, পাঁচখোলা, তিনখোলাসহ বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করে বাজারে নিয়ে গিয়ে পড়ছে মহাবিপাকে। অতিকষ্টে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও তৈরিকৃত মাটির জিনিসপত্রের ন্যয্য দাম না পেয়ে অনেক মৃৎ শিল্পীরাই ইতিমধ্যে লোকসানের ভার সইতে না পেরে ঐতিহ্যবাহী পেশা বদলিয়ে অন্য পেশায় যোগদান করেছে। অপরদিকে, মৃৎ শিল্পীদের তৈরিকৃত মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রের চাহিদা দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় তৈরিকৃত ওইসব মাটির সামগ্রী হাটবাজারে আশানুরূপ বেচাবিক্রি হচ্ছে না। ফলে দুই দিক থেকেই শাহজাদপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত মৃৎশিল্পীরা যন্ত্রনার যাতাকলে পিষ্ঠ হয়ে খেয়ে না খেয়ে কোন মতে এখনোও গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ওই পেশাটিকে টিকিয়ে রেখেছে।এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পরে হয়তো মাটির তৈরি জিনিসপত্র পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাদুঘরে স্থান করে নেবে-এমন আশংকা স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের।দিনভর অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাটির জিনিসপত্র তৈরি ও বিক্রি করে তারা যে অর্থ আয় করছে তা দিয়ে তাদের ভরণপোষনই অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে।এছাড়া মাটি ও মাটি পোড়ানোর জ্বালানী ব্যায় বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মাটির জিনিসপত্র তৈরির ব্যায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও তাদের আয় না বাড়ায় অতিকষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে তাদের ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটছে।তার পরেও‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’এর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় উর্ধ্বগতিতে রীতিমতো মৃৎশিল্পীদের জীবনজীবিকার প্রশ্নে কালো মেঘের ঘনঘটার মতো চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। শাহজাদপুর উপজেলার প্রাণনাথপুর পালপাড়া সরেজমিন পরিদর্শনকালে অসংখ্য মৃৎ শিল্পীদের সাথে এ প্রতিবেদকের আলাপ হয়।আলাপকালে প্রাননাথপুর পালপাড়া মহল্লার বেশ কয়েকজন মৃৎশিল্পী এ প্রতিনিধিকে বলেন, বংশ পরষ্পরায় জেনে ও শিখে আসা মৃৎ শিল্পের কাজে নিয়োজিত পাল সম্প্রদায়ের (মৃৎ শিল্পী) অনেকেই লোকসানের ভার সইতে না পেরে এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করেছে। পেশাটি পরিশ্রমের তুলনায় লাভজনক না হওয়ায় শাহজাদপুরসহ এর পার্শ্ববর্তী উল্লাপাড়া, চৌহালী, বেলকুচি, কামারখন্দ, বেড়া,সাঁথিয়া ও সুজানগরের শত শত মৃৎশিল্পীদের বর্তমানে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা ক্রমাগত হ্রাস পেতে পেতে বর্তমানে একেবারেই নীচে নেমে এসেছে। অপরদিকে মাটি ও পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত জ্বালানী ব্যায় বেড়েছে। সব জিনিসের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও দাম বাড়েনি তৈরিকৃত মাটির পন্যেও চাহিদা ও দাম। ফলে বহুমুখী সমস্যার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে এক সময়ের অতি জনপ্রিয় ও গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প হুমকির সন্মুখীন হয়ে পড়েছে। শাহজাদপুরের প্রাণনাথপুর পালপাড়া মহল্লার মহাদেব পাল, রংলাল পাল, সংকর পাল, ভোম্বল পাল, রনজিত পাল, অজিত পাল, অসিত পাল, অনিল পাল, অনন্ত পাল, পলান পাল, অধীর পাল, সুশীল পাল, নিখিল পাল, সনজয় পাল, সুজন পাল, সুশীল পাল, নিখিল পাল, তপন পাল, গোপাল পাল, পরিতোষ পাল, রুপম পাল, রাজকুমার পাল, বিমল পাল, প্রদীপ পাল, কৃষনো পাল ও সংকর পালসহ পার্শ্ববর্তী উল্লাপাড়া, চৌহালী, বেলকুচি, কামারখন্দ, বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর উপজেলায় কর্মরত শত শত মৃৎ শিল্পীদের বর্তমানে প্রতিটি দিন কাটছে অনাদরে, অর্ধাহারে। স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা জানান, প্রতি বছর পূঁজার সময় একেকটি প্রতিমা তৈরি করে তাদের আয় হয় ৬/৭ হাজার টাকা। এক ট্রাক এঁটেল মাটি ক্রয় করতে হচ্ছে এক হাজার টাকায়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ও বৃষ্টিপাত হলে তাদের কাজ বন্ধ রাখতে হয়।এছাড়া জ্বালানী ব্যায়ও অতীতের তুলনায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরিকৃত সকল মাটির পন্যের উৎপাদন ব্যায় বহুলাংশে বেড়েছে। কিন্তু তৈরিকৃত মাটির জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ও চাহিদা অমিত পরিমানে হ্রাস পাওয়ায় বর্তমানে শত শত মৃৎশিল্পীরা রীতিমতো চোঁখেমুখে সর্ষের ফুল দেখছে। অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী হওয়ায় অভাবের তাড়নায় ওই পল্লীর অনেক শিশুকিশোর বিদ্যালয়ে যেতে না পেরে ঝড়ে পড়ছে। অভাবজনিত কারণে ছোটবেলা থেকেই ওইসব শিশুদের কাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য হতে হচ্ছে। সমাজপতি বা কোন সরকারি বেসরকারি সংগঠন ওদের মতো চির অবহেলিত, চির পতিত, চির অপাংক্তেয় ভাগ্যবিড়ম্বিত মৃৎ শিল্পীদের ভাগ্যোন্নয়নে এগিয়ে আসতে দেখা না যাওয়ায় ওদের বিচারের রায় নিরবে নিভৃতে কাঁদছে প্রতিটি মুহুর্তে। আধুনিক যান্ত্রিক উপায়ে প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন ধরনের প্লাষ্টিক, এ্যালুমিনিয়মসহ ধাতব শিল্পের আগ্রাসনে বর্তমানে মৃৎ শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে দেশপট থেকে। অভাব অনটন আর ঋণপানে জর্জরিত হয়ে শাহজাদপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত মৃৎ শিল্পীদের জীবন চালাতে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা ওই ঐহিত্যবাহী এ পেশাটি ধরে রাখতে অনেক ত্যাগ, কষ্ট, দুঃখ সহ্য করেও পেশাটি টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন ধরনের ধাতব দ্রব্যের আগ্রাসনে আর কতদিন ঐতিহ্যবাহী ওই পেশাটি তারা ধরে রাখতে পারবেন তা নিয়ে তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ

সিরাজগঞ্জে নিষিদ্ধ ঔষধ রাখায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের লক্ষ টাকা অর্থদন্ড

সিরাজগঞ্জ জেলার সংবাদ

সিরাজগঞ্জে নিষিদ্ধ ঔষধ রাখায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের লক্ষ টাকা অর্থদন্ড

সিরাজগঞ্জ জেলার সিরাজগঞ্জ সদরের শিয়ালকোল বাজার এবং সলঙ্গা থানার অন্তর্গত হাটিকুমরুল নামক স্থানে এ অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্...

বগুড়ায় সিআইডির হাতে দুলালী হত্যা মামলার পলাতক আসামী গ্রেফতার

অপরাধ

বগুড়ায় সিআইডির হাতে দুলালী হত্যা মামলার পলাতক আসামী গ্রেফতার

সিআইডি বগুড়া জেলার বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কাউছার সিকদারের দিক নির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ হাসান শামীম ইকবালের...

ইসি সম্পর্কে ফখরুলের বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য, বানোয়াট : কাদের

রাজনীতি

ইসি সম্পর্কে ফখরুলের বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য, বানোয়াট : কাদের

নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা ও প্...

করোনায় ভালো নেই টিউশন শিক্ষার্থীরা

পড়াশোনা

করোনায় ভালো নেই টিউশন শিক্ষার্থীরা

দুটি টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতাম। ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা মিলিয়ে সংসারের খরচ বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎই মাথায় ব...

উন্নয়নের কারণেই চিরদিন শাহজাদপুর আসন নৌকার দখলে থাকবে- আলহাজ্ব হাসিবুর রহমান স্বপন এমপি

রাজনীতি

উন্নয়নের কারণেই চিরদিন শাহজাদপুর আসন নৌকার দখলে থাকবে- আলহাজ্ব হাসিবুর রহমান স্বপন এমপি

শামছুর রহমান শিশির : সিরাজগঞ্জ-২ সদর আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও সিরাজগঞ্জ জেলা আ.লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড...

‘ক্ষেত পরিচর্যা করেছি, আগাছা তুলে ফসল বুঁনেছি; ৩০ তারিখে ঘরে তুলবো’- জননেতা এসএ হামিদ লাবলু

রাজনীতি

‘ক্ষেত পরিচর্যা করেছি, আগাছা তুলে ফসল বুঁনেছি; ৩০ তারিখে ঘরে তুলবো’- জননেতা এসএ হামিদ লাবলু

শামছুর রহমান শিশির, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শুক্রবার, ২৮ ডিসেম্বর -২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ : নির্বাচনী প্রচারণার সময়সীমা আজ শুক্র...