♦♦ জঙ্গী দমন কোন যুদ্ধ নয় ♦♦ মুক্তিযুদ্ধতো নয়’ই ♦♦

এক ফেসবুক বন্ধু আবেগপ্লুত হয়ে সিলেটের শিববাড়ীর আতিয়া মহলে জঙ্গী দমনে আইন শৃংখলা বাহিনী সহ সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের কর্মতৎপরতাকে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করে একটি পোষ্ট দিয়েছেন। এ কারনে অগ্নিঝড়া মার্চ মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আমার কিছু কথা বন্ধুদের জ্ঞাতার্থে উপস্থাপিত হলো। জানি এর কোন গুরুত্ব নেই। তবুও অরোণ্যে রোদন।

জঙ্গী দমন, জঙ্গী হত্যা, আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ। এখন প্রশ্ন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ কি? শুধু আবেগ দিয়ে নয়, প্রশ্নের গভীরে উত্তর খুঁজতে হবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনী গভীর রাতে অতর্কীত অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙগালিদের হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, বাঙগালিদের প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্যদিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৬ ডিসেম্বর পাকবিহিনীর পরাজয়ের মধ্যদিয়ে বিজয় অর্জিত হয়। একটি স্বাধীন সুনির্দিষ্ট ভুখন্ডের মানচিত্র ও ভিন্ন একটি পতাকার মান মর্যাদার মালিকানা আমরা অর্জন করি।

এই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল, গণতান্ত্রীক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের মধ্যদিয়ে বাঙগালি জাতিস্বত্বা ও ভাষা রক্ষার সংস্কৃতি,বৈষম্যহীন শিক্ষা ও চিকিৎসা নীতি,ধর্মীয় স্বাধীনতা,সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যতা, শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্যহীন ও দূর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থ্য কায়েম করা।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকবাহিনীর আত্নসমর্পনের মধ্যদিয়ে বাঙলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী মুল লক্ষ্য অর্জনের পূর্বেই পরাজিত শক্তিরা প্রশাসন সহ সমাজের সর্বস্তরে অর্থবিত্তে বলিয়ান হয়ে থেকে গেল। পাশাপাশি দেনা পাওনাহীন অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পন করিয়ে তাদের খালি হাতে এক অনিশ্চিত জীবনে ফেরত পাঠানো হলো। নিরবে নিভৃত্তে চোখের জল ফেলে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা পরস্পরের কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে ফিরে গিয়েছিল নিজ পরিবারে। সেদিনও মুক্তিযোদ্ধাদের শঙ্কা ছিল, এ ধরনের ভুল রাজনৈতিক সিন্ধান্তের কারনে আগামি দিনে নিজেদেরকেও এবং জাতিকে খেসারত দিতে হবে।

আমরা চরম খেসারত দিলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ জাতীয় নেতাদের নির্মম হত্যান্ডের মধ্যদিয়ে, হাড়িয়ে। রক্তে রঞ্জিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। এর পর সেই পরাজিত শক্তি পাকিস্থান পন্থিরাই ক্ষমতায় অধিষ্টিত হলো। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা খেসারত দিয়েই চলেছি।

এরপর থেকে পূর্বাপর রাষ্ট্র ক্ষমতার রদবদল হলেও রাষ্ট্র তার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথে হাটেনি, হাটতে পারেনি, হাটতে পারছে না। পাকিস্থান পর্বে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল বিজাতীয় শাসক, শোষক। এখন স্বজাতীয় শাষক,শোষক আমাদের শাসন করছে। খোল নলচে বদলিয়ে পাকিস্থান পন্থীরাই এ দলে সে দলে বিভাজনের মধ্যদিয়েই সৈরতন্ত্র, গণতন্ত্রের নামে মূলতঃ তারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায়। একদিকে ধর্মের নামে ধর্মান্ধ উগ্র পাকিস্থান পন্থীদের কাছ থেকে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ ও কথিত গণতন্ত্রীদের কাছ থেকে দেশের সাধারন মানুষ বারবার প্রতারনার শিকার হচ্ছে।

জঙ্গী আকাশ থেকে বাংলাদেশের মাটিতে পরেনি। জঙ্গী বাংলাদেশেরই মানুষ। ৭১’র ছিল, ভিন্ন ভাষার বিজাতীয় শত্রু। এখন ঘড়ের শত্রু বিভিষণ। একভাই আওয়ামীলীগ, আরেক ভাই বিএনপি, অন্যভাই জামাত, জাতীয় পার্টি ও জঙ্গী। কেউবা পরস্পরের আত্নীয় স্বজন। এ দেশের মধ্যেই তাদের অবস্থান। চেতনার ঐক্য নেই। আপন আপন স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তারা দলে দলে বিভক্ত। ধর্মান্ধ গোষ্ঠি চিন্তা চেতনার দিক থেকে, চেতনার জগতে অন্ধকারে আলোর পথ খুঁজতে তারা জঙ্গী। তারা ইহকালের সুখভোগের চেয়ে পরকালের সুখভোগে আত্মবলিদান করছে। এ জঙ্গী কারা সৃষ্টি করছে? কি জন্য সৃষ্টি হচ্ছে সে বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনীতিতে,অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভাষা, শিক্ষা, চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক নানা বৈষম্যের কারনে পাকিস্থান পন্থীদের জঙ্গী তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় ও রাজনৈতিক অঙ্গনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাদের অবস্থান। সুতরাং আমরা কেউই নিরাপদ নই।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বে- স্বাধীন ভূখন্ড ও জাতিয় পতাকা অর্জীত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যার সুবিধা এখন আমরা ভোগ করছি। সারাবিশ্বে আত্ন পরিচিতি ঘটেছে। উন্নয়ন হচ্ছে, বৈষম্য বাড়ছে পাহাড় পরিমান। এ বিজয়ে ও উন্নয়নের অর্থযোগান দাতা, দেশের কৃষক ও শ্রমজীবি মেহনতি মানুষ। তারা নানা বৈষম্যে ও বঞ্চনার শিকার।

দ্বিতীয় পর্বে- গণতান্ত্রীক ব্যবস্থাপনায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক,চিকিৎসা ও ধর্মীয় সাম্যতা অর্জনের যুদ্ধে অবতীর্ন হবার লক্ষ্য ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাঙগালি জাতির এ কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ছিল। এ কারনে ৩০ লাখ মানুষ আত্নহুতি দিয়েছিল, এবং ২ লাখ মা-বোন ইজ্জত খুইয়েছিল।

কিন্তু কেন? কি কারনে? দ্বিতীয় পর্বের যুদ্ধ শুরু না করেই জীবন দানে প্রস্তুত ঘোষনায় আত্ম উৎসর্গীত বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নিয়ে কেন তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর আজো মেলেনি।

এ রাজনৈতিক সিন্ধান্তটি যে, কতবড় ভুল ছিল ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে।পুরো জাতি আজ পর্যন্ত তার খেসারত দিচ্ছে।

উগ্রপন্থা,জঙ্গীবাদ রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার কূফলে সামাজিক ভাবে সৃষ্ট দ্বান্দিক ফসল। এ ফসল আপনার আমার ঘড়েই জন্ম হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ মুক্তিযুদ্ধের মুল চেতনার পথে ফিরে যাওয়া। কখনো তাদের সাথে আপোষ রফার কৌশলে সুফল আসবে না। অর্থনৈতিক সামাজিক বৈষম্য কুমিয়ে ফেলতে হবে। উগ্র ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও কারিকুলাম বন্ধ করে,শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন একই ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বিনামূ্ল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা জনগনের দাড় গোড়ায় পৌঁছাতে হবে। ধনী দরিদ্রের চিকিৎসার মান এক হতে হবে। ঘুষ, দূর্নীতি ( প্রাইমারি স্কুলের দারোয়ান, পিওন, পুলিশের সিপাহী পদে ১০ লাখ টাকা, অন্যান্য পদে আরো লাখ লাখ টাকা এলাকার নেতা, আমলাদের দিতে হয়) নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

সকল ক্ষেত্রে অনিশ্চিত ও ঘুষ দূর্নীতি, বৈষম্যের ও অসাম্যের জীবন ব্যবস্থা জাতির কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনা। এ ধরনের অসুভ রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার মদ্যদিয়েই উগ্রপন্থা জঙ্গীবাদ ও জঙ্গী তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়, অন্য শক্তিধরেরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে জঙ্গি তৈরি করে।

কেউ ক্ষমতায় যাবার লক্ষ্যে, কেউ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে, ভিন্নরা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য, কেউবা রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের আর্শীবাদ পুষ্টদের বসাবার জন্যও ধর্মের নামে তালেবান,উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদকে ব্যবহার করছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রশক্তির মূল উৎস্য, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্র্যাব,পুলিশ বাহিনীকে ভাবতে হবে জঙ্গী দমন,জঙ্গী খতম এটি মুক্তিযুদ্ধ নয়, কিম্বা আরেকটি মুক্তিযুদ্ধতো নয়’ই।

মুক্তিযুদ্ধ ৭১’র এ শুরু হয়েছিল, এখনও চলমান। যারা বলে শেষ হয়েছে তারা ৭১’র প্রেতাত্মা। পাকিস্থানের ভূত অথবা জঙ্গী।

সুতরাং জাতির মঙ্গলের জন্য,স্থিতিশীল রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রীক ব্যবস্থা কায়েমের জন্য, দ্বিতীয় পর্বের যুদ্ধ অনিবার্য সত্য। সবাইকে স্বচেতন ভাবে বিষয়টি উপলোদ্ধি করতে হবে। শুভ উপলোব্ধির যায়গা থেকেই সকল শক্তি একত্রিত হয়ে জঙ্গীবাদ ও জঙ্গী সংস্কৃতিকে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে মূল উৎপাটন করতে হবে। নচেত নয়।

* তবে দেশ স্বাধীনের পর থেকে শুরু করে ৪৫ বছর ধরে চলমান পরিক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কলংকের শেষ ধাপ পরিপূর্ণ হতে চলেছে মুক্তিযোদ্ধার জাতিয় তালিকা-২০১৬ প্রণয়নের মধ্যদিয়ে। এ তালিকায়, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী,রাজাকার,আলবদর, মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কহীন ব্যাক্তি ও গোষ্ঠির নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, হচ্ছে। লাখ-লাখ, কোটি-কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে। সেখানেও রাজনৈতিক নেতারা শীর্ষে। আবার যাচাই বাছাই কমিটির নামে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কথিত ভুয়া, উপজেলা, জেলা, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নেতারাসহ জামুকা (যা খালেদা জিয়া সৃষ্টি করেছিলেন) নামক জগদ্দল পাথর হাতিয়ে নিলেন, খেয়ে নিলেন আখেরি খাওয়া। এ তালিকাতেও যে জঙ্গী থাকবেনা সেটা নিশ্চিত বলা যায়না। টাকা দিলেই যেখানে সব হওয়া যায়, সেখানে আগামি দিনে জঙ্গী সম্ভাবনা মুক্তিযোদ্ধা তালিকাতেও রয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এসকল তালিকাভুক্তদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত সনদ ও আইডি কার্ড দেয়া হবে। তাহলে ভেবে দেখুন ইতিহাস কোন পথে হাটছে?

* সঠিক রাজনৈতিক সিন্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে আরো রক্ত ঝড়বে, জাতিকে আরো ভোগান্তি ভুগতে হবে, আরো অনেক খেসারত দিতে হবে। তবে আইন শৃংখলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে এটি মনে রাখতে হবে যে, জঙ্গী দমন কিম্বা জঙ্গী হত্যা কোন যুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধতো নয়’ই। যে মিথ্যা মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিগুলো এবং লোভী জাতিগোষ্ঠিরা সে যুদ্ধ যেন আমাদের ঘাড়ে চেপে না বসে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার
সম্পাদক, শাহজাদপুর সংবাদ ডট কম
তারিখ- ২৭’ মার্চ/২০১৭ ইং।

মন্তব্য