১’শ বছরের টেকসই বাঁধে ৬ বছরে ৩ স্থানে ধ্বস

নিজস্ব প্রতিনিধি : ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধের জগতলা পূর্বপাড়, বাসুরিয়া পূর্বপাড় ও কাশিপুর-এসব এলাকার ৩টি স্থানে ফের নতুন করে ধ্বসে গেছে। ফলে যমুনা নদী তীরবর্তী ১৩ গ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ১শ’ বছরের টেকসই ওই বাঁধটি নির্মানের ৬ বছরের মধ্যে নতুন করে ৩টি স্থানে জিও টেক্সটাইল সরে গিয়ে সিসি ব্লকের নীচের মাটি যমুনার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ধ্বসে যাওয়ার পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। সেইসাথে বাড়ছে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ-দুর্দশা। এলাকাবাসী জানায়, শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত নির্মিত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধের কাজ সম্পন্ন হবার পর যমুনা তীরবর্তী হাজার হাজার হৎদরিদ্র, অসহায়, ছিন্নমূল জনসাধারন নতুন করে বাচাঁর স্বপ্ন দেখে। কিন্তু শত বছরের টেকসই বাঁধে যখন ৬ বছরের মাথায় ব্যাপক ধ্বসের সৃষ্টি হয় তখন এলাকাবাসী সেই আশা ক্রমশ বুকভরা হতাশায় পরিণত হয়। ধ্বসজনিত কারণে হুমকির সন্মুখীন হয়ে পড়েছে ১৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত ওই বাঁধটি। শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রফেসর আজাদ রহমানের মতে, ‘আমাদের মতো দরিদ্র দেশে জনকল্যানে ১ শ’৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যমুনা নদী তীর সংরক্ষন বাঁধের ৩ স্থানে ধ্বসে যাওয়ায় জনমানুষের জন্য তথা দেশ ও জাতির সীমাহীন ক্ষতিরই আশংকা জোড়ালো হচ্ছে। নীর্ভরযোগ্য ঠিকাদার দ্বারা দ্রুত ওই বাঁধে নতুন করে ধ্বসে যাওয়া ৩টি স্থান মেরামত আশু প্রয়োজন। অন্যথায় এটি যমুনা নদী তীরবর্তী হাজার হাজার হৎদরিদ্র জনসাধারনের তথা দেশ ও জাতির সীমাহীন ক্ষতি কারণ হতে পারে।’ শাহজাদপুরের কৈজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ও পোরজনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম মুকুল জানান, ‘ বিগত প্রায় এক যুগে শাহজাদপুরের এ দুই ইউপির মোট ৪৮টি গ্রামের মধ্যে ৩০টি গ্রামই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ওই বিলীন হওয়া গ্রামগুলোতে বসবাসকারী সাড়ে ৫ সহস্রাধিক পরিবার সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ভেঙে গেছে তিন সহস্রাধিক তাঁত ফ্যাক্টরী, ২টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৭ টি বে-সরকারী, ৬টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রায় কোটি টাকা ব্যায়ে ২টি স্কুল কাম ফ্লাড সেল্টার, ১৮টি মসজিদ, ৮টি মাদ্রাসা , জনতা ব্যাংক, গ্রামীন ব্যাংকের পাকা ভবন, গালা ইউনিয়নের হাতকোরা, বেনুটিয়া, তারুটিয়া হাটবাজার এবং বিপুল পরিমান ফসলী জমি। যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে ভাঙনের কবলে পড়বে কৈজুরী হাট এলাকার ২ শতাধিক আধাপাকা ছোটবড় দোকানঘড়, ২টি স’মিল, ৩টি তেল মিল, ৪টি ধানভাঙ্গা মিল, ঠুটিয়া হাইস্কুল এন্ড কলেজের কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত দুটি পাকা দ্বিতল ভবন, সরকারী খাদ্যগুদাম, সারের গুদাম, বিএস কোয়ার্টার, তহসিল অফিস, স্বাস্থ ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র, পোষ্ট অফিস, দাতব্য চিকিৎসালয়, বাংলা ১৩৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী কৈজুরী হাট জামে মসজিদ, কৈজুরী ফাজিল মাদ্রাসা, ও প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যায়ে হুরা সাগরের ওপর নির্মিত সেতু। এদিক বিবেচনায় বাঁধটির ধ্বসে যাওয়া স্থানগুলি শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত মেরামত জরুরী।’ ঢাকাস্থ সিরাজগঞ্জ নদী ভাঙ্গন রক্ষা ও উন্নয়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাজ্জাদুল আলম খান তপু ও সাধারণ সম্পাদক এড. রায়হান মোর্শেদ জহুরুল জানান, ‘সিরাজগঞ্জ জেলার বৃহৎ জনগোষ্ঠি যমুনা ভাঙ্গনজনিত কারণে চরম আতংক, উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় দিনাতিপাত করে থাকে। সিরাজগঞ্জে বছরের পর বছর ভয়াল রাক্ষুসী নদীর আগ্রাসনে একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার, এমনকি তার অধিক বারেও অসংখ্য পরিবারের ভিটেমাটি সহায় সম্বল নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। যেভাবে সিরাজগঞ্জে নদীভাঙ্গন চলছে তাতে অচিরেই দেশের মানচিত্র থেকে সিরাজগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অস্তিত্ব বিলীন হবার আশংকা রয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলাকে রক্ষার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং যথাপোযুক্ত ব্যবস্থাগ্রহন করা জরুরী।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)’র অর্থায়নে পদ্ম, মেঘনা ও যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় পাবনা জেলার বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে গত ’২০০৯ সালে ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পকাজ শুরুর পর অত্যাধুনিক জিও টেক্সটাইল ব্যাগে বালি ভরে পল্টন ও ক্যারেনের সাহায্যে যমুনা নদীর তলদেশে স্তরে স্তরে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তীরের উপরিভাগের দিকে তুলে আনা হয়। শুষ্ক মৌসুমে যমুনায় পানির স্তর যে পর্যন্ত নেমে যায় সে পর্যন্ত এই বালি ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং করা হয়। এরপর শুষ্ক মৌসুমে পানির সর্বনিম্ন স্তরের উপর থেকে সিসি ব্লক দিয়ে তীরের সম্পূর্ণ উপরিভাগ পর্যন্ত বেধে দেয়া হয়। ফলে যমুনা নদীর স্রোতের ধাক্কা ও পানির ঘুর্ণাবর্তে নদীর তীর ভেঙ্গে যাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা কমতে থাকে। ওই বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হয় গত ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। পাউবো কর্তৃপক্ষ সে সময় জানিয়েছিল, ‘যেহেতু টেকসই ও উন্নতমানের জিও টেক্সটাইল ব্যাগ পানির নিচে থাকা অবস্থায় ১শ’ বছরেও পচন ধরবে না সেহেতু বাঁধ নিমার্ণকাজ সম্পন্ন হবার পর আগামী ১শ’ বছরেও যমুনা নদীর তীর ভাঙ্গার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। ৬ বছরের মাথায় ৩ স্থানে ফের ধ্বসে গেছে। এলাকাবাসী জানায়, শাহজাদপুরের কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন হবার পর শান্ত ও থমকে দাড়ায় প্রমত্তা, প্রবলা, প্রগলভা যমুনার আগ্রাসী ভাঙ্গন। ফলে কৈজুরী থেকে শুরু করে গুদিবাড়ী, ভাটপাড়া, লোহিন্দাকান্দি, জামিরতা, জগতলা, বালিয়াহাটা, খাউর‌্যা, মৌকুড়ি, কাশিপুর, মারজান, ফকিরপাড়া, বেনুটিয়া, গুপিয়াখালী, ভেড়াখোলা, তারুটিয়া ও চর পেচাকোলা গ্রামের এলাকাবাসী এর সুফল পেতে শুরু করে। পোরজনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেন, ‘ইতিপূর্বে প্রতি বছর যমুনা ভাঙ্গনের ফলে ভিটেমাটি হারিয়ে কত মানুষ যে ছিন্নমূল বাস্তুহারায় পরিণত হতো তার সঠিক পরিসংখ্যান দেয়া দূরহ। কিন্তু রাক্ষুসী যমুনা আধুনিক পদ্ধতিতে শাসন শুরু করায় নদী ভাঙ্গন পুরোপুরি রোধ হয়ে নদী বক্ষে চর জেগে উঠছে। ফলে সহায় সম্বলহীন বাস্তুহারা হতদরিদ্র জনসাধারনের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।’ কাশিপুর এলাকার রাজিব উদ্দিন সরকারের পুত্র জাহিদুল ইসলাম, আজিম মোল্লা, মৃত ময়েনের পুত্র মোসলেম, জামিরতা গ্রামের আজমল হকের পুত্র সরোয়ার হোসেন, বড় মহারাজপুর গ্রামের লক্ষী মোল্লার পুত্র তারাব আলীসহ অসংখ্য এলাকাবাসী এ প্রতিবেদককে জানান, যমুনায় নদীভাঙ্গন কমে যাওয়ায় এলাকার সার্বিক পরিবেশ পাল্টাতে শুরু করেছে। বাঁধ নির্মানের মাত্র ১ বছর আগে জামিরতা এলাকার রাস্তা সংলগ্ন যে জমি শতাংশ প্রতি ৩/৪ হাজার টাকায় কেনাবেচা হয়েছে নদীভাঙ্গন না হওয়ায় সেইজমি দাম বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে ৩০/৪০ হাজার টাকা শতাংশ প্রতি বেচাকেনা হচ্ছে। ফসলি জমি আগে যেখানে বিঘাপ্রতি ৩০/৩৫ হাজার টাকায় কেনাবেচা হাতো, সেইজমিই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। নদীভাঙ্গন থেকে রক্ষা পাওয়ায় জমির দাম এভাবে অতি স্বল্প সময়ে ১০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে । কিন্তু এ বাঁধের ৩ স্থানে নতুন করে ধ্বস দেখা দেয়ায় জনমনে নতুন করে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। কাশিপুর গ্রামের আব্দুল হাকিম জানান, অতীতে প্রতি বছরই যমুনাগর্ভে বিশাল এলাকা বিলীন হয়ে যেতো। ফলে এসব এলাকার মানুষেরা তাদের বসতবাড়ি নদী থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হতো। বারবার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পথে বসে যেতো। কিন্তু ওই বাঁধটি নির্মাণ করার পর থেকে নদী ভাঙ্গন পুরোপুরি রোধ হওয়ায় নদী তীরের দরিদ্র এলাকাবাসী কী পরিমাণে যে উপকৃত হচ্ছে তা বলে শেষ করা যাবে না। তাছাড়া নদী তীরবর্তী ফসলি জমি যেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকতো, বর্তমানে সেসব জমিতে পটল, বেগুন, কাচামরিচ, শাকসবজি, গো-খাদ্য ডেমা ঘাসসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে এলাকাবাসী অর্থনৈতিক ভাবে উপকৃত হচ্ছে। এছাড়া যমুনা তীর সংরক্ষণ বাঁধের ওপর দিয়ে সিএনজি টেম্পু, নসিমন-করিমনসহ ছোটখাটো পরিবহন চলাচল করায় অত্র এলাকার ১৩ গ্রামের মানুষ যাতায়াতে বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু বাঁধটির ৩ স্থানে নতুন করে ধ্বসে যাওয়ায় ওইসব ছোটখাটো পরিবহন তো দূরের কথা, বাইসাইকেল নিয়েও আর যাতায়াত করা যাচ্ছে না। ফলে নদী তীরের বাঁধ নীর্ভর ১৩ গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এলাকাবাসীকে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ-দুর্গতি। শতশত কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধের জগতলা পূর্বপাড়, বাসুরিয়া পূর্বপাড় ও কাশিপুর এলাকার ৩ স্থানে ধ্বসে যাওয়ায় ১৩ গ্রামের হাজার হাজার এলাকাবাসী নিত্যদিন চলাচল ও মালামাল পরিবহন নিয়ে বিচলিত হয়ে পড়েছে । এছাড়া বর্ষা মৌসুমে ধ্বসে যাওয়া অংশগুলো পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হবার শংকাও সৃষ্টি হয়েছে। তারা শুষ্ক মৌসুমে ধ্বসে যাওয়া ওই স্থান ৩টি দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপকালে তারা আরও জানিয়েছেন, ‘সংশ্লিষ্টদের বার বার অবহিত করা হলেও অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি তাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। ফলে কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না। যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধের ধ্বসে যাওয়া ৩ স্থান সংস্কার বা মেরামতে এলাকাবাসী সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।