হাটে হাড়ি ভাঙলেন সিএমএসডি’র বিদায়ী পরিচালক

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্ত দুর্নীতি ফাঁস করে দিলেন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ। বিদায় নেওয়ার আগে গত ৩০ মে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির আদ্যোপ্যান্ত তুলে ধরেন।

সিএমএসডি’র পরিচালক কোনো চুনোপুঁটি নন, তিনি একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। কাজেই তার এই চিঠিটা গুরুত্বের দাবি করে এবং তদন্তের দাবি করে।

জনপ্রশাসন সচিবের কাছে দেওয়া চিঠিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদউল্লাহ লিখেছেন, করোনা মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং সিএমএসডি কী কী কেনাকাটা করবে, সে সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কখনোই সঠিক কোনো পরিকল্পনা করেনি। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে পরিচালক সিডিসির সঙ্গে সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ আলাপ করে। সিডিসি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে সিএমএসডি নিজস্ব উদ্যোগে পিপিইসহ অন্যান্য সামগ্রী মজুদ করতে থাকে। পরে ১০ মার্চ সিডিসি পরিচালক সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৫ কোটি টাকার একটি চাহিদা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এর আগে মার্চের প্রথম সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পিপিই, মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী পাঠাতে নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই সময় এরিস্টোক্রেট, এসিআই, আএফএল, গেটওয়েল ও জেএমআই ছাড়া আর কেউ এসব পণ্য উৎপাদন করত না। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য উৎপাদন শুরু করে। এর মধ্যেই লকডাউন শুরু হয়। ক্রয় প্রক্রিয়া কীভাবে অনুসরণ করা হবে, অর্থের সংস্থান আছে কিনা, স্পেসিফিকেশন কী হবে, কী পরিমাণ সামগ্রী ক্রয় করতে হবে- এ সংক্রান্ত কোনো দিকনির্দেশনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় সিএমএসডি মৌখিকভাবে বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করে তা হাসপাতালগুলোতে পৌঁছে দেয়।

পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদউল্লাহ দাবি করেন, তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের (বাজেট) মৌখিক নির্দেশনায় সিএমএসডি সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়বাবদ ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। মার্চ মাসের দিকে এই টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে সমস্ত ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার কেনাকাটার কথা উল্লেখ করে পরিচালক আরও বলেন, এ পর্যন্ত আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার কেনাকাটা হলেও মাত্র ১০০ কোটি টাকার সংস্থান করা হয়েছে। বারবার বাকি অর্থের চাহিদার কথা জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও অর্থছাড় করা হয়নি। এ কারণে সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে শহীদউল্লাহ চিঠিতে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিএস তাকে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার ছেলের ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বলে তাকে জানান ওই দুই কর্মকর্তা।

ওই প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য খাতের আলোচিত ঠিকাদার মিঠুর উল্লেখ করে পরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তা মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখে। ওই কোম্পানির পাঠানো তালিকা ও মূল্য অনুযায়ী দ্রব্যাদি কেনাকাটা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং ক্রয় তালিকায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেননি। এতে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ সহযোগী ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ হন।

পরিচালক বলেন, সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কভিড হাসপাতালের আইসিইউর জন্য ডিপিএম পদ্ধতিতে কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চাহিদা দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে মেডিটেক ইমেজিংয়ের কাছ থেকে ওইসব সামগ্রী ক্রয়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেডিটেক ইমেজিংয়ের যন্ত্রপাতি ছিল নিম্নমানের এবং দাম বেশি। ফলে তারা বাদ পড়ে। এতে মিঠু বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রসঙ্গত যে, গত মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পরে চিকিৎসকদের নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের অভিযোগ আসে সিএমএসডির বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটির দেওয়া রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। সিএমএসডি’র পরিচালক এবং স্বাস্থ্য সচিবকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরূদ্ধে মূল অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.