স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজে প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ

গণভবনে ডেকে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাজকর্মে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ সকালে দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই অসন্তোষ জানান। বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ এবং সিএমএসডির নব নিযুক্ত পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী জুয়েনা আজিজ এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ।

চলমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেভাবে কাজ করছে তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় বৈঠকে। গণভবনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আজ গণভবনে আবুল কালাম আজাদকে ডেকে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা মোকাবেলায় যেসমস্ত সমন্বয়হীনতা এবং গাফিলতিগুলো করছে, সেই সমস্ত গাফিলতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গতকাল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রথম ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং এই ভিডিও কনফারেন্সে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা শুরুর পর থেকে কিভাবে একের পর এক দায়িত্বহীন আচরণ করছে এবং সঙ্কট মোকাবেলায় কিভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁর বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারাদেশে করোনা পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি কিভাবে যাচ্ছে সে তথ্য সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নয়। এর আগে করোনা যখন দাপট দেখাতে শুরু করে তখন থেকেই করোনা পরিস্থিতি মনিটরিং করার দায়িত্ব নেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সারাদেশে খোঁজখবর নিয়ে করোনা সংক্রমণের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করছে। দেখা যাচ্ছে যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা মোকাবেলায় যতটুকু দায়িত্বশীল, উদ্যমী এবং যতটুকু গতিশীল থাকা উচিত ছিল সেটা নেই। অথচ এইরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে সরকার আরো দায়িত্বশীল আচরণ আশা করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্রগুলো বলছে যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে দায়িত্বহীনতাগুলো রয়েছে তাঁর মধ্যে রয়েছে-

প্রথমত, করোনা পরীক্ষায় অনিয়ম, ধীরগতি। বারবার সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, ঢাকার বাইরে করোনা পরীক্ষার কার্যক্রম বাড়াতে হবে এবং দ্রুত পরীক্ষার রিপোর্ট দিতে হবে। কিন্তু এরকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যে, ঢাকার বাইরের অধিকাংশ জেলাগুলোতে পরীক্ষায় ধীরগতি হচ্ছে, মানুষ উপসর্গ নিয়েও পরীক্ষা করাতে পারছে না এবং পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এই ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

দ্বিতীয়ত, করোনা সংক্রমণের সময় অন্যান্য রোগে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন ডায়বেটিস, ক্যান্সার, কিডনি রোগে যারা আক্রান্ত তাঁদের চিকিৎসা ব্যাপকভাবে ব্যহত হচ্ছে এবং এই সমস্ত চিকিৎসাহীনতার কারণে বহু মান্নুষ মারা যাচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবগত হয়েছে। কাজেই এই ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

তৃতীয়ত, করোনা নিয়ে যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে প্রক্ষেপণ করেছে, সেই প্রক্ষেপণগুলো যথাযথ কার্যকর হয়নি বলেও মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। কারণ এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রক্ষেপণে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে ১ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে এই সংখ্যা অনেক দূর ছাড়িয়ে যাবে। কাজেই এখন পর্যন্ত পরবর্তীত পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ কতদিন পর্যন্ত থাকবে, কতদূর বিস্তৃত হবে বা কতজন আক্রান্ত হবে এই ব্যাপারে সঠিক কোন বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিতে পারছে না।

চতুর্থত, করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে যে জোনভিত্তিক ম্যাপিং করা এবং কোন কোন এলাকাগুলো রেডজোনে থাকবে এবং সেগুলোকে লকডাউন করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বহীনতা এবং ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় মনে করছে এবং এই ধীরগতির কারণে রেড জোন ভিত্তিক যে ব্যবস্থা গ্রহণ তা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আর এই বিষয়গুলো নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.