স্বাধীনতা,এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

সাত সকালে টুনুরা দল বেঁধে এসেছে তাদের দাদু, মোসলেহ উদ্দীনের বাড়িতে। সাত সকাল বললে অবশ্য কম বলা হয় সকাল বাজে ছয়টা। মাত্র নরম আলো ছড়াতে শুরু করেছে সূর্যের এখনও দেখা পাওয়া যায়নি।

শীত বিদায় নিয়েছে, তবে এখনও হিম হিম গন্ধ। ফাগুনের আরাম বাতাসের সঙ্গে আজ যোগ হয়েছে সামান্য কুয়াশাও হয়েছে। এত সকালে পাড়ার রাস্তা-ঘাট ঘুমিয়ে থাকলেও মোসলেহ উদ্দীনের সকাল হয়েছে আরও এক ঘণ্টা আগে। এই বছরের শীত থেকে তিনি বাচ্চাদের সঙ্গে নতুন নিয়ম করেছেন। সবাইকে সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে এক ঘণ্টা তার বাসায় কাটাতে হয়। বাচ্চারা এই সময়ে খেলাধুলা করে, পত্রিকা পড়তে চাইলে পরে। মোসলেহ উদ্দীন নিজে খবরের কাগজ পড়েন। বাচ্চাদের সঙ্গে টুকটাক বিষয় নিয়ে আলাপ করেন।

আজকের দিনটা অন্য সব দিনের মতো না। আজ ৭ই মার্চ। বাচ্চারা সবাই জানে আজকে অন্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা। আজকে একটা বিশেষ দিন।

টুনু আর নীলা বাড়িতে ঢুকল শ্লোগান দিতে দিতে, জয় বাংলা! জয় বাংলা!!

মোসলেহ উদ্দীন বাগানেই বসে ছিলেন, তিনিও বুক টান করে হাত তুলে গলা মিলালেন। তিনজনে কিছুক্ষণ জয় বাংলার শ্লোগান দেওয়ার পরে আরাফ, বিন্তি আর কাজল ঢুকল। নীলা বলল, জয় বাংলা আরাফ, বিন্তি, কাজল। বাকিরা কই?

আরাফ বলল, জয় বাংলা নীলা। বাকিরা প্ল্যাকার্ড বানাচ্ছে।

দাদাই ওদের তাড়া দিলেন, তোদের কিন্তু আবার স্কুলে যেতে হবে। জলদি কর।

নীলা হাসতে হাসতে বলল, কোনো চিন্তা নেই দাদাই, দেখো না আজ স্কুলের জন্য রেডি হয়েই বের হয়েছি। এখান থেকেই স্কুলে চলে যাবো।

সবাই কথা বলায় ব্যস্ত এদিকে টুনুর যে কী হয়েছে সে এক কোণায়। দাদাই হাতছানি দিয়ে ডেকে বললেন, এই টোনাই পণ্ডিত। কী ভাবছিস একা একা? আয় সবাই মিলে ভাবি, তোর চিন্তার বোঝা একটু কমাই।

যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেখানে দাড়িয়েই টুনু বলল, আচ্ছা দাদাই, আমরা কেন ‘জয় বাংলা’ বলি? এই জয় বাংলা শ্লোগানটা কোথা থেকে আসলো।

আরাফ কপালে চাপড় দিয়ে বলল, হে খোদা! টুনু তুই আবার এত ভেবেছিস? কেন ভাই তোকে কে বলেছে এত ভাবতে? তুই একটু কম কম ভাবতে পারিস না? পরে একদিন

তোর মাথা ফটাস করে ফেটে যাবে সে খবর আছে?

আরাফের কথা বলার ঢং এ সবাই হো হো করে হেসে দিলো। টুনু বেশ বিরক্ত হলো। এ জন্যই সে কারও সঙ্গে কথা বলতে যায় না, দাদাইটা শুধু শুধু বকায়!

দাদাই অবশ্য ওদের হাসিতে যোগ দেননি। তিনিও কী যেন ভাবনায় ডুবে গেলেন। সবার হাসি আর টুনুর রাগ করার এক পর্যায় বললেন, তোরা কি আসলেই জানতে চাস ‘জয় বাংলা’ কোথা থেকে এলো?

টুনু তো বুঝল বাকিরাও বুঝল এখন আর হাসাহাসি রাগারাগি করা যাবে না, এখনই ইতিহাসের পাতা থেকে বের হয়ে আসবে দারুণ কিছু ঘটনা।

ভারী গলায় দাদাই শুরু করলেন, তোরা তো জানিস আমাদের দেশ স্বাধীনের গল্পটা শুধু ১৯৭১ এর না। এটা অনেক লম্বা দিনের গল্প। আমাদের এই সংগ্রাম চলছে সেই ১৯৪৭ থেকে যখন আমাদের অযাচিতভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এরপর ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ’৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন সর্বশেষে ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। এ দীর্ঘ সময়ের সংগ্রামে আমাদের যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি করে ভাবতে হয়েছিল টা ছিল আমাদের জাতি স্বত্বা। আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অবস্থান। পাকিস্তানিদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আমাদের এইসব নিজস্ব বিষয় কেড়ে নিয়ে যাওয়া, যেটা আমরাও মানতে পারছিলাম না।

তখন কি আমরা রেগে গিয়ে জয় বাংলা বলে চিৎকার করে উঠলাম দাদাই? চোক বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো কাজল।

কাজলের সরল প্রশ্নে দাদাই হেসে দিলেন। বিষয়টা অনেকটা এমনই রে কাজল। আমরা তখন খুব রেগে যেতাম। আমাদের এই রাগ বুকের মধ্যে কুড়েকুড়ে খেতো কিন্তু আমরা কোন ভাষায় সেই কথা প্রকাশ করবো তা বুঝে উঠতে পারতাম না।

নীলা বলল, কেন আমাদের বাংলা ভাষা তো ছিলই।

দাদাই বললেন, হ্যাঁ বাংলা ভাষা তো আমাদের ছিলই। তবে ভেবে দেখ পাকিস্তানীরা আসার আগেও আমাদের শাসন করেছে ইংরেজরা দুইশ বছর। এর আগে ছিল মোঘল আফগানরা, তার আগে ছিল পর্তুগিজ ওলন্দাজ। আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্গে তখন তারা মিশে গিয়েছে অনেকটা নিজেদের মতো করেই। আমাদের নিজেদের খুঁজে বের করতে তখন একটা যুদ্ধ আমাদের নিজেদের সঙ্গেও চলছিল যে।

এরপর কী হলো দাদাই? আগ্রহ নিয়ে বলল আরাফ।

আমাদের আন্দোলন চলছিল, ৫২ তে, ৬৬ তে, ৬৯ এ। আমরা নানাভাবে স্বাধীন বাংলার কথা বলতাম। ছয় দফাতেও আমরা আলাদা অস্তিত্ব তৈরি করতে চেয়েছি। কিন্তু একদম আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা সেখানে ছিল না। কিন্তু ছয় দফার পরে যখন আমাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যেতে থাকলো তখন থেকে আমাদের মনে হতে থাকলো, অনেক হয়েছে আর না।

এই আর না চিন্তাটা থেকেই একটা স্বাধীন বাংলার প্রচেষ্টা তৈরি হয়েছে। তখন নেতারা শ্লোগান দিতেন। বাংলা কথাটা বার বার নানাভাবে আসতো। বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বর্ষীয়ান নেতা তখন মাওলানা ভাসানী। তিনি শ্লোগান দিতেন “স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ” মধ্যে মধ্যে বলতেন “আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ” এগুলো দিয়েও তিনি স্বাধীন বাংলার ইঙ্গিতই করতেন।

টুনু ফস করে বলে উঠলো, ইশ এগুলো তো উর্দু শব্দ!

দাদাই হাসতে হাসতে বললেন, ঠিক এই কথাটা আমিও তখন ভাবতাম। শুধু আমি কেন? আমার মতো যারা তরুণ ছিল তারা সবাই ভাবতো।

এরপর কী হলো দাদাই? তর আর সইছে না বিন্তির।

এরপর যে কী হল বিন্তি সেটা সঠিক করে কেউ বলতে পারবে না। আমি সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম না। দিনটা ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটা সভা ছিল। কথা ছিল সামনে ১৭ মার্চে শিক্ষা দিবস আমরা কীভাবে পালন করব তা নিয়ে আলোচনা হবে। সেদিন নাকি রাষ্ট্র বিজ্ঞানের দুই ছাত্র আফতাব আহমেদ আর চিশতী হেলালুর রহমান সর্ব প্রথম “জয় বাংলা” শ্লোগান দেয়। পরে আমি অবশ্য অনেক খোঁজ করেছই তবে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি কে এটা শুরু করেছিল। তবে কেউ না কেউ করেছিল। তারা এমন যোদ্ধা ছিল যারা শুধু যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধকেই সত্য জানে। দেশকে ভালোবেসে যুদ্ধ করে, বীর খেতাব পাওয়া বা পদবীর বলে কিছু আদায় করা তাদের উদ্দেশ্য থাকে না। তো যেই করে থাকুক তাদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য কেউ দিতে পারেনি।

আমি তো ভেবেছিলাম, এটা প্রথম বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। বলল নীলা।

সে সময়ের সবচেয়ে মজার বিষয় কী ছিল জানিস? সবাই যার যার মতো করে কাজ এগিয়ে নিতেন। বঙ্গবন্ধু শেষ অনুমোদন দিতেন। এরপরই সেটা হয়ে যেত। তো সিরাজুল আলম খান বলে একজন ছাত্রনেতা ছিলেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন, সিপাহী জনতার গণ- অভ্যুত্থান ইত্যাদি তিনি পরিচালনা করেছিলেন এমন কথিত আছে। তার অনুসারীরা দাবী করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার রহস্যময় অবস্থান আছে।

সিরাজুল আলম খান ১৯ জানুয়ারি ১৯৭০ ঢাকার পল্টনে একটা ভাষণ দেন তখন তিনি জয় বাংলা শ্লোগানটা উচ্চারণ করেন। বাংলা শব্দ। বাংলার জয়ের কথা বলা হচ্ছে, এই শ্লোগান সকলের বেশ মনে ধরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও এই শ্লোগানটা মনে ধরে। তিনি এই শ্লোগান তার ভাষণে প্রথম যুক্ত করেন ৭ জুন ১৯৭০ রেসকোর্স ময়দানের বিশাল এক জনসভায়।

এভাবে এই শ্লোগান আমাদের হয়ে যায়। অবশেষে আসে ৭ই মার্চ। বলতে পারিস আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা আসে সেদিনই। ৭০র নির্বাচন বাতিল হয়ে গিয়েছেই বলা চলে, বিরাট জলোচ্ছ্বাসে পশ্চিম শাসকরা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। অনেক অনেক অনেক অবজ্ঞা সঙ্গে নির্বিচারে ক্ষুব্ধ জনতাকে হত্যা করা হচ্ছে। সবাই বসে আছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা পেতে। সবার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে। লাঠিসোটা হাতে সবাই দলে দলে মিছিল করে রেসকোর্সের দিকে আসছে। রেসকোর্স কোনো ময়দান নেই আর। সেদিন রেসকোর্স একটা মহা সমুদ্র। মানুষের স্লোগানে উত্তাল সমুদের মতো গর্জন করছে।

অবশেষে বঙ্গবন্ধু আসেন, তার দীর্ঘ সুঠাম শরীর নিয়ে দাঁড়ান মঞ্চে। তার ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন।

ছেলে মেয়েরা উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠে। এই শ্লোগান ওদের মুখস্থ। এক আঙ্গুল তুলে ওরা বলে উঠে, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

ওদের আলাপ উচ্ছ্বাসের মধ্যেই দাদাই দরাজ গলায় আবৃত্তি শুরু করেন, কবি নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত কবিতাটি, স্বাধীনতা,এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো,

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে

লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জন সমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি’?

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,

এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না।

তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?

তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে

ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত

কালো হাত। তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ

কবির বিরুদ্ধে কবি,

মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,

বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,

উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,

মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ…।

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,

শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে তুমি

একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে

লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।

সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।

না পার্ক না ফুলের বাগান, – এসবের কিছুই ছিল না,

শুধু একখণ্ড অখণ্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত

ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।

আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল

এই ধু ধু মাঠের সবুজে।

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে

এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,

লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,

পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক।

হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,

নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে

আর তোমাদের মতো শিশু পাতা- কুড়ানিরা দল বেঁধে।

একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল

প্রতীক্ষা মানুষের: ‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,

রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল

হৃদয়ে লাগিল দোলা, জন সমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতা খানি:

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

 

Source: bangla.bdnews24.com