সাংবাদিক শিমুল হত্যাকারী যে দলেরই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে: মোহাম্মদ নাসিম

শামছুর রহমান শিশির/ফারুক হাসান কাহার : ‘সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের হত্যাকারী যে দলেরই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ শাহজাদপুরে পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর গুলিতে নিহত সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের নিজ বাসভবন উপজেলার মাদলা গ্রামে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ কথা বলেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘হত্যাকারী যত প্রভাবশালী হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে । পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু হত্যাকারী প্রমানিত হলে দলীয় গঠনতন্ত্র ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।’ তিনি সমকালের সাংবাদিক শিমুলের অসহায় পরিবারকে নগদ এক লাখ টাকা প্রদান করেন এবং তার স্ত্রী নুরুন্নাহারকে তাৎক্ষনিকভাবে বগুড়ার একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চাকুরি প্রদানের জন্য তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট প্রধানকে এ নির্দেশ দেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব হাসিবুর রহমান স্বপন, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা, স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকতাসহ দলীয় নেতৃবৃন্দ। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক নিহত সাংবাদিক শিমুলের পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। সেইসাথে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের দুই কোমলমতি সন্তান আল-নোমান নাজ্জাফি সাদি (১২) ও তামান্নায়ে ফাতেমা (৬) এর লেখাপড়ার দায়িত্বভার গ্রহন করেন।
এদিকে, পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে পৌর মেয়র মিরুর গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবিতে আজ রোববার দুপুর ১২ টায় শাহজাদপুরে কর্মরত সকল সাংবাদিবৃন্দ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে। শাহজাদপুরে কর্মরত সাংবাদিকবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘ মেয়র ও তার সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীকে গ্রেফতারের জন্য প্রশাসনকে বেধে দেয়া ৪৮ ঘন্টা সময়সীমা আগামীকাল সোমবার দুপুর ১ টায় শেষ হবে। এই সময়সীমার মধ্যে তাদের গ্রেফতার করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে। আজ রোববার বিকেলে শাহজাদপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে নিহত সাংবাদিকের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সাংবাদিক শিমুল হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত ৫ আসামীকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো পৌর সদরের ছয়আনী পাড়া মহল্লার মৃত খন্দকার করিম বক্স ওরফে লাফা মিয়ার ছেলে কেএম নাছির উদ্দিন, বাড়াবিল গ্রামের মৃত হাজী ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো: আলমগীর (৪২), নলুয়া মধ্যপাড়া মহল্লার মতিন খার ছেলে মো: নাজমুল খা (২৬), নলুয়া ভূঁইয়াপাড়ার মৃত শুকুর আলী ভূঁইয়ার ছেলে মো: আরশাদ ভূঁইয়া (৪০) ও শক্তিপুর পশ্চিমপাড়া মহল্লার মৃত কাশেম শেখের ছেলে মো: জহির শেখ (৪৫)। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই কমল কুমার দেবনাথ সাংবাদিক হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত ৭ আসামীকে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানালে বিজ্ঞ আদালত ১৩ ফ্রেব্রুয়ারি শুনানীর দিন ধার্য করেন। এছাড়া এ দিন বিকেলে শাহজাদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ পৌর মেয়রের বাসায় তল্লাশী চালিয়ে পৌর মেয়রের দু’টি পাসপোর্ট এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্র জব্দ করেছে।
অপরদিকে, সকালে শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে স্থানীয় এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ্ব হাসিবুর রহমান স্বপনের সভাপতিত্বে এক জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কেএম নাছির উদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করে তা কার্যকর করা জন্য সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের মাধ্যমে কেন্দ্রের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত পৌর শহরে মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আজাদ রহমান বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওই জরুরী সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলাম, উপজেলা ও পৌর কমিটির সকল নেতৃবৃন্দ।
সিপিজে ও আইএফজের বিবৃতি : সাংবাদিক শিমুল হত্যাকারীদের শাস্তির আহ্বান : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে পৌর মেয়রের শর্টগানের গুলিতে সমকাল সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সাংবাদিকদের দুটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। একই সঙ্গে তারা এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে। গত শুক্রবার নিউইয়র্ক ভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং ব্রাসেল্স ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর জার্নালিস্টস (আইএফজে) বিবৃতি দিয়ে সাংবাদিক শিমুল হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে সাজা দেয়ার আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে সিপিজের এশিয়ার সমন্বয়ক স্টিভেন বাটলার বলেন, বহু লোকের সামনে ঘটেছে গুলির ঘটনা। পুলিশ অস্ত্রটি উদ্ধার করেছে এবং সেটির মালিককে শনাক্ত করেছে। ফলে দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে বিলম্ব হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। সিপিজের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কমপক্ষে ২০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। পৃথক বিবৃতিতে সাংবাদিক শিমুল হত্যার নিন্দা জানায় আইএফজে। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক অ্যান্থনি ব্যালেঞ্জার বলেন, আব্দুল হাকিম শিমুল সেখানে কেবল তাঁর দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় সারা বিশ্বে সাংবাদিকেরা কী পরিমাণ আত্মত্যাগ করছেন। জনগণকে তথ্য দেওয়ার জন্য তাঁরা নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করছেন।