কাজিপুরশিক্ষাঙ্গনসিরাজগঞ্জ

শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে কাজিপুর উপজেলা সদর প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়

যমুনা বেষ্টিত কাজিপুরের শিক্ষার হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। সাধারণ শিক্ষার সাথে কারিগরি ও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার পথ সুগম হওয়ায় চরবিড়া মিলে এখন শিক্ষার শুভযাত্রার ট্রেন সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। এই সামনে চলার পথকে আরও বেগবান করতেই প্রতিবন্ধীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে কাজিপুর উপজেলা সদর প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়।

জন্মসূত্রে আলাদা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ইতোপূর্বে তেমন করে কাজিপুরের কেউ ভাবেননি। বিশেষ করে উপজেলা সদরে এরকম একটি বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা কারো চিন্তায় ধরা পড়েনি। অবশেষে কাজিপুরের মাটি ও মানুষের নেতা সদ্য প্রয়াত এমপি মোহাম্মদ নাসিম বিষয়টি আমলে নেন। একদিন সচিবালয়ে একই গাড়িতে যেতে যেতে এ বিষয়ে কথা বলছিলেন কাজিপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র গোলাম মোস্তফা মধু তালুকদারের সাথে। এক পর্যায়ে তিনি জিএম তালুকদারকে উপজেলা সদরে প্রতিবন্ধীদের জন্যে একটি বিদ্যালয় স্থাপনের নির্দেশ দেন।

অবশেষে মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশনা মোতাবেক ২০০৮ সালে আলমপুর চৌরাস্তায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। নামকরণও মোহাম্মদ নাসিমই করলেন‘ কাজিপুর উপজেলা সদর প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়।’ এমন কথাই জানালেন কাজিপুর উপজেলা সদর প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গোলাম মোস্তফা তালুকদার ওরফে জিএম তালুকদার। গতকাল ওই বিদ্যালয়ে সরেজমিন গিয়ে কথা হয় তার সাথে।

তিনি জানান, যেসব শিশু জন্মগতভাবেই অদ্ভুত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে বেড়ে ওঠে, অস্বাভাবিক আচরণ করে, অন্যসবার সাথে মিশতে পারে না তাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতেই এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।’

আলমপুর পৌরসভাসহ পাশের চালিতাডাঙ্গা, সোনামুখী, গান্ধাইল, মাইজবাড়ি, কাজিপুর সদর ও শুভগাছা ইউনিয়নের প্রতিব›ধী শিশুরা এই বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। কুড়ি শতক জমির ওপর অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে বিদ্যালয়টির অবস্থান। কাজিপুর পৌরসভার মধ্যে অবস্থিত বিদ্যালয়টি কাজিপুর-সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত।

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে (ননএনডিডি ১২ ধরণের প্রতিবন্ধী) শিক্ষার্থী রয়েছে মোট ২৮৭ জন। এদের মধ্যে ছেলে ১৬৯ জন এবং মেয়ে ১১৮ জন। শিক্ষক সংখ্যা ২৬ জন, অফিস স্টাফ রয়েছে ১৪ জন, ভ্যানচালক ৫ জন।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নূর নবী জানান, ‘প্রতিদিন আমাদের ভ্যানগাড়ি প্রায় পনের কিলোমিটার দূর থেকে শিক্ষাথী ও তাদের অভিভাবকদের আনা নেয়া করে।’

প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার পদ্ধতি প্রচলিত শিক্ষার চেয়ে আলাদা। এ লক্ষ্যে এখানকার শিক্ষকেরাও ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। প্রথম থেকে পঞ্চশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে রয়েছে বিশেষ বিনোদন। রয়েছে হারমোনিয়াম, তবলা, সাউন্ডবক্স, ফুটবল, লুডু, কেরামবোর্ড।
প্রতিবন্ধীতায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকমন্ডলী অত্যন্ত যতেœর সাথে এসব সহায়ক উপকরণের মাধ্যমে পাঠদান করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের বিশেষ খাবার সরবরাহ করা হয়। দূরের শিক্ষার্থীদের আনা নেয়ার জন্যে রয়েছে ছয়টি অটোভ্যান। ছয়টি হুইল চেয়ারও শিক্ষার্থীদের কাজে ব্যবহৃত হয়।

করোনাকালিন সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জিএম তালুকদার। এরইমধ্যে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। তাছাড়া সারা বছরের খাতা কলম সব বিনামূল্যে স্কুল থেকে সরবরাহ করা হয়।

পুরো বিদ্যালয় ভবনটি টিনশেড বিল্ডিং। ছয়টি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া হয় দুই শিফটে। রয়েছে বিশেষ কম্পিউটার সুবিধা। শিক্ষার্থী অভিভাবকদের বসার জন্যে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। আছে তিনটি পাকা টয়লেট, দুইটি টিউবওয়েল।

কাজিপুর উপজেলা সদর প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এর পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রেরণ করেন মোসাঃ উম্মে কুলসুম, উপ-পরিচালক, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, সিরাজগঞ্জ। সহযেগিতার হাত বাড়িয়েছেন রান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, ধনবাড়ি টাঙ্গাইল। নিবন্ধনের তারিখ ৫-৮-২০১৮ নবায়নের তারিখ- ৪-৮- ২০২০।

স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার খাতিরে সম্পূর্ণ সরকারি নিময় মেনে প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে যাবতীয় লেনদেন সম্পন্ন হয়। হিসাব নং- ৪২০৭৭০১০১৮০৫৪। বর্তমান স্থিতি দুইলক্ষ ২৬ হাজার একশ টাকা।

প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ১ লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে উপজেলা সদরে অনুষ্ঠিত র‌্যালি এবং র‌্যালি পরবর্তী ডিসপ্লেসহ নানা কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে পুরস্কারও জিতে নেয় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের তত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা নানা সময়ে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রি ও কাজিপুরের সদ্য প্রয়াত এমপি মোহাম্মদ নাসিম গত ৫ -৯-২০১৯ তারিখে বিদ্যালয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষাপোকরণ বিতরণ করেন। এরপর কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদ হাসান সিদ্দিকী ও সেইসময়ের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এলিজা সুলতানা এ বছরের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে পড়ালেখার মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গোলাম মোস্তফা তালুকতার ওরফে মধু তালুকদার জানান,‘ যে নেতার কথায় প্রতিষ্ঠানটি গড়া তোলা হয়েছে তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। তার স্বপ্ন ও সম্মান ধরে রাখতে আমরা সচেষ্ট থাকবো। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সাথে চলছে এর পাঠদান কার্যক্রম। এখন দরকার সরকারি সহায়তা। এ লক্ষ্যে যাবতীয় শর্তই পূরণ করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যালয়টি এমপিওভূক্তিকরণের জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন রাখছি।’

Related Articles

Back to top button
x
Close
Close
%d bloggers like this: