শাহজাদপুরে ষাঁড় হৃষ্টপুষ্ট করে শতশত বেকার স্বাবলম্বী!

করোনার ক্রান্তিকালের ভেতরেও কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে দেশের গবাদীপশুর কেন্দ্রবিন্দু শাহজাদপুর উপজেলার পৌর এলাকাসহ ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানের শতশত গো-খামারে দেশি ও বিদেশি জাতের ষাঁড় গরু হৃষ্টপুষ্টকরণের কাজে ব্যতিব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে গো-খামারিরা।

ষাঁড় গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ করে দারিদ্রতা জয় করে স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হয়েছেন শাহজাদপুরের শতশত বেকার যুবক ও খামারিরা। বিগত বছরগুলোতেও খামারিরা বাড়ির অন্যান্য কাজের পাশাপাশি ষাঁড় হৃষ্টপুষ্ট করে ৫০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা আয় করে লাভবান হয়েছেন। তাদের গো-খামারে হৃষ্টপুষ্টকৃত ষাঁড় গরু বিক্রি হবে দেশের বিভিন্ন কোরবানীর পশুর হাটে।

জানা গেছে, শাহজাদপুর পৌর এলাকাসহ ১৩ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশী ষাঁড় গরু হৃষ্টপুষ্ট করা হচ্ছে উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নের টেপরি ও পুরান টেপরি গ্রামে।

এছাড়া উপজেলার বাজিয়ার পাড়া, পোতাজিয়া, রেশমবাড়ী, আঙ্গারু, বাড়াবিল, রুপবাটি, রাউতারা, পোরজনা, পুঠিয়া, ডায়া, নগরডালা, কাকুরিয়া, কাদাইবাদলা, চিথুলিয়া, কাশিনাথপুর, বনগ্রাম, সরিষাকোল, মশিপুর, নুকালী, শেলাচাপড়ী, চরাচিথুলিয়া, ভাইমারা, বহলবাড়ী, আহম্মদপুর, বিন্নাদায়ের, মাদলা, টিয়ারবন্দ, শাকতোলা, বিলকলমী, বৈলতৈল, যমুনার দুর্গম চরাঞ্চল বানতিয়ার, ছোট চামতারা, বড় চামতারা, হাতকোড়া, মুনপুর, রতনদিয়ার, বাঙালা, বৃ-দাশুরিয়া, দাশুরিয়া, ক্ষিদ্র-দাশুরিয়া, শ্রীপুর, ঠুটিয়া, মনাকষা, স্থল, ধীতপুর, মৌকুড়ি, নোহাটা, শোনতোষা, বসন্তপুর, দিঘলকান্দি, ঘাটাবাড়ী, বাঐখোলা, জালালপুর, রূপসী, ঘোরজান, কুরশী, সোনাতনীর বিভিন্ন বাড়ি ও গো-খামারে এবার ৩০ হাজার ষাঁড় হৃষ্টপুষ্ট করছে খামারিরা। তারা স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে দেশি ও বিদেশি জাতের ফ্রিজিয়ান, শাহীওয়াল, দেশি শংকর, অষ্ট্রেলিয়ান, জার্সিসহ বিভিন্ন জাতের ষাঁড় বাছুর ক্রয় করে হৃষ্টপুষ্ট করছেন।

মাত্র ৬ মাসে এঁড়ে বাছুর লালন পালন করে আসন্ন কোরবানীর ঈদের গরুর হাটে বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়েও বিনিয়োগের চেয়ে ৩/৪ গুণ বেশী অর্থ আয় করতে পারবেন বলে খামারিরা আশা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় গো-খামারিরা জানান, শাহজাদপুরে লো-ল্যান্ড ও বন্যা প্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানে এমনিতেই প্রচুর দুর্বা ঘাস জন্মে। গরুকে এসব দুর্বা ঘাস খাওয়াতে তাদের বাড়তি খরচ করতে হয় না। ফলে একজন লোক ৩/৪ টি ষাঁড় গরু খুব সহজেই বাড়ির অন্যান্য কাজের পাশাপাশি হৃষ্টপুষ্ট করে অধিকহারে লাভবান হতে পারেন।

৫০/৫৫ হাজার টাকার একটি ষাঁড় ৬ মাস হৃষ্টপুষ্ট করে কোরবানীর পশুর হাটে এক দেড় লাখ টাকায় সহজেই বিক্রি করা যায়। প্রতি বছর কোববানীর ঈদে এসব ষাঁড় গরুর অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। ফলে বেশ লাভজনক দামেই হৃষ্টপুষ্ট করা গরুগুলো সহজেই খামারিরা বিক্রি করতে পারে। অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় এলাকার শতশত বেকার একে অন্যের দেখাদেখিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গরু হৃষ্টপুষ্ট করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

উপজেলার স্বাবলম্বী খামারীরা জানান, পুরান টেপরি গ্রামে বংশপরষ্পরায় আদি পুরুষের কাছ থেকে গ্রামের মুষ্টিমেয় খামারি ষাঁড় ও বলদ হৃষ্টপুষ্ট করার কাজ করে আসছেন। পেশাটি ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ও লাভজনক হওয়ায় শতাধিক বেকার গরু হৃষ্টপুষ্ট করে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। তাদের ধারাবাহিক সাফল্য উপজেলার অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে।

গো-খামারিরা আরও জানান, ফসলের মাঠে কৃষিকাজ বা বাড়ির অন্যান্য কাজের পাশাপাশি গরু হৃষ্টপুষ্ট করে অতি অল্প সময়ে শাহজাদপুরের শতশত আত্মপ্রত্যয়ী বেকার স্বাবলম্বী হবার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবাদন রাখছেন। স্থানীয় অসংখ্য বেকারদের গরু হৃষ্টপুষ্ট করার কাজে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে প্রতি বছর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গরু হৃষ্টপুষ্ট করে দেশে গো-মাংসের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে গরু রফতানির মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমান বৈদশিক মুদ্রা অর্জনে তারা সক্ষম হবেন। এতে বেকারত্বের হার ক্রমাগত হ্রাস পাবে ও স্বাবলম্বীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

শাহজাদপুরের গো-খামারিদের মাঝে সহজশর্তে ও বিনা সুদে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণসহ সরকারি-বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা অতীব জরুরী বলে এলাকার গো- খামারিরা জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ পশুবিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, ‘আগেকার মানুষ দু’একটি গরু পালতো শখ করে। বলদ গরু হলে হাল চাষের ক্ষেত্রে, আর ষাঁড় গরু হলে তা মাংসের জন্য অনেক খামারিই তৈরি করতেন। গো-মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ষাঁড় গরুর সংখ্যা বেশী হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ গরুর স্বাস্থ্যই জীর্ণশীর্ণ। অথচ এসব গরুর সামান্য যত্ন নিলেই হৃষ্টপুষ্ট করার মাধ্যমে অধিক মাংস উৎপাদন করা সম্ভব । যা দেশে মাংসের চাহিদা পূরনের পাশাপাশি অনেক লোকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে; যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে শাহজাদপুরের ষাঁড় গরু হৃষ্টপুষ্ট করার অসংখ্য গো-খামার।’

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ‘আপটুডেট রিপোর্ট অনুযায়ী শাহজাদপুর উপজেলায় মোট ২ লাখ ৮৭ হাজার গাভী, ষাঁড় ও বাছুর রয়েছে। আসন্ন কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে শাহজাদপুরে প্রায় ৩০ হাজার ষাঁড় হৃষ্টপুষ্ট করছে খামারিরা।

আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ষাঁড় হৃষ্টপুষ্ট করার কাজে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে খামারিদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা ও ভ্যাকসিন প্রদান করার মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।