শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ সালের জানুয়ারী মাসে শাহজাদপুরে প্রথম এসেছিলেন। একই বছরের ২০ জানুয়ারী শাহজাদপুরের ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছিলেন তিনি। বিদ্যালয়ের পরিদর্শন বইয়ে কবির সহস্তে লেখা সন্তব্য এবং রবীন্দ্রনাথের অর্ডার বুক এ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করছে। নদীপথে বোটে চেপে কুঠিবাড়ির পূর্ব দিক ও দক্ষিণ দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া বড়াল ও ফুলঝোর নদীর সংযোগ খাল (ছোট নদী) দিয়ে তিনি কুঠিবাড়ীতে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই ছোট নদীর এখন আর কোন অস্তীত্ব নেই। সেটি নানা পন্থায় এখন ভূমি দস্যুদের দখলে চলে গেছে। খালের পূর্বাংশে ভিড়তো কবিকে বহনকৃত বোট। খালের পাড়েই ছিল হলদে রঙের দোতালা বিরাট অট্টালিকা (নীলকরদের কুঠিবাড়ী-যা পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের আবাশস্থল ছিল)।

শাহজাদপুরে এসেই চার কামরা বিশিষ্ট ঐ দোতালায় কবি তাঁর সাময়িক আস্তানা গড়ে তুলতেন। ঐ খালের পাড়েই ছিল বিড়াট অশ্বত্থ গাছ ও খেয়া ঘাট। কবিগুরু খেয়াঘাট কবিতায় উল্লেখ করেছেন-‘খেয়া নৌকা পারাপার করে কত নদী স্রোত। কেহ যায় ঘরে কেহ আসে ঘর হতে’। বর্তমানে ঐ খেয়াঘাট ও অশ্বত্থ গছের কোন চিহ্ন নেই। কুঠি বাড়ির উত্তর ও দক্ষিণে দুটি বাগান ছিল। ঐ বাগানে কৃত্রিমভাবে তৈরী হ্রদের মধ্যে ১২ মাস পদ্ম ফুল ফুটে থাকতো। পাকা পিলারের সাথে লোহাড় শিক দিয়ে বেড়া ঘেড়া উত্তরের বাগানে বড় বড় ঝাউ, লিচু, আম,দারুচিনি দক্ষিনে কামিনি ফুলের গাছসহ অন্যান্য দুস্প্রাপ্য গাছের অবস্থান ছিল।

ঐ বাগানের কথাই রবীন্দ্রনাথ ‘ছিন্নপত্র’ কবিতায় লিখে গেছেন-“দক্ষিণের বারান্দায় কেবল মাত্র কামিনী ফুলের গন্ধে মস্তিস্কের রন্ধ্র পূর্ণ হয়ে ওঠে”। এখন একমাত্র দুটি লিচু গাছ ছারা এর আর কোন গাছের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাগান পেড়িয়ে কুঠিবাড়ির উত্তর দিকের দরজা দিয়ে বারান্দায় উঠে ডানে দোতালায় উঠবার সিঁড়ি। উপরে উঠেই উত্তর পূর্বকোনে রবীন্দ্রনাথের স্নানের ঘড়। স্নান ঘড়ে স্নান করতে করতে তিনি অনেক গানের সুর দিয়েছেন। এর সামনের দরজা দিয়ে আরেকটি ঘড়ে প্রবেশ করা যায়।

রবীন্দ্রনাথ ‘ছিন্নপত্রে’ কুঠিবাড়ি সম্পর্কে লিখেছিলেন-‘আমি চারটি বড় বড় ঘড়ের মালিক’- তার মধ্যে এই কক্ষটিই বৃহত্তম। ঐটিই ছিল জমিদার রবীন্দ্রনাথের দরবার কক্ষ। ০৫-০৯-১৮৯৪ শাহজাদপুরে বসে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,‘অনেককাল বোটের মধ্যে বাস করে হঠাৎ শাহজাদপুরের বাড়িতে এসে উত্তীর্ণ হলে বড় ভালো লাগে।

বড় বড় জানালা,দরজা,চারিদিক থেকে অবারিত আলো এবং বাতাস আসতে থাকে। যেদিকে চেয়ে দেখি সেই দিকেই গাছের সবুজ ডাল চোখে পড়ে এবং পাখির গান শুনতে পাই। দক্ষিণের বারান্দায় বেরোবা-মাত্র কামিনী ফুলের গন্ধে মস্তিস্কের রন্ধ্রগুলি পূর্ণ হয়ে ওঠে। হঠাৎ বুঝতে পারি এতদিন বৃহৎ আকাশের জন্য ভিতরে ভিতরে একটা ক্ষুধা ছিল, সেটা এখানে এসে পেট ভরে পূর্ণ করে নেয়া গেল। আমি চারটি বৃহত ঘরের একলা মালিক- সমস্ত দরজাগুলি খুলে বসে থাকি। এখানে যেমন আমার মনে লেখবার ভাব এবং লেখবার ইচ্ছা আসে, এমন আর কোথাও না। রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরে বসেই পোষ্টমাষ্টার গল্প লিখেছিলেন।

শাহজাদপুর থেকে ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দ্রিরা দেবীকে পোষ্টমাষ্টার সম্পর্কে একাধিক চিঠি লিখেছিলেন। ফেব্রুয়ারি, ১৮৯১ সালে লিখেছিলেন,‘আমাদের কুঠিবাড়ির একতলাতেই পোষ্ট অফিস। বেশ সুবিধা চিঠি আসবামাত্রই পাওয়া যায়। পোষ্টমাষ্টারের গল্প শুনতে আমার বেশ লাগে। বিস্তর অসম্ভব কথা বেশ গম্ভীরভাবে বলে যায়। পরে ২৯-০৬-১৮৯২ সালে লেখা অন্য এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,‘বাতিটা জ্বালিয়ে টেবিলের কাছে কেদারিটি টেনে যখন বেশ প্রস্তুত হয়ে বসেছি,হেনকালে কবি কালিদাসের পরিবর্তে এখানকার পোস্টমাস্টার এসে উপস্থিত।

মৃত কবির চেয়ে একজন জীবিত পোষ্টমাষ্টারের দাবি ঢের বেশি। অতএব পোষ্টমাষ্টারকে চৌকিটি ছেরে দিয়ে কালিদাসকে আস্তে আস্তে বিদেয় নিতে হল। এই লোকটির সাথে আমার একটু বিশেষ যোগ আছে। যখন আমাদের কুঠিবাড়ির এক তলাতেই পোষ্ট অফিস ছিল এবং আমি প্রতিদিন এঁকে দেখতে পেতুম, তখনি আমি একদিন দুপুর বেলায় এই দোতালায় বসে পোস্টমাস্টারের গল্পটি লিখেছিলুম। সে গল্পটি যখন হিতবাদীতে বেরোল,তখন আমাদের পোষ্টমাষ্টার বাবু তার উল্লেখ করে বিস্তর লজ্জামিশ্রিত হাস্য বিস্তার করেছিলেন।

যাই হোক, এই লোকটিকে আমার বেশ লাগে। নানা রকম গল্প করে যায়, আমি চুপ করে শুনি । পোষ্টমাষ্টার গল্পের শেষটা অনেকটা বেদনা বিধুর।‘পোষ্টমাষ্টার’ চলে যাচ্ছেন, বেদনাভারাতুর রতন আর বিষন্ন পোষ্টমাষ্টারের মনোভঙ্গি ও মনোবেদনা বোঝানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- “যখন নৌকায় উঠিলেন এবং নৌকা ছাঁড়িয়া দিল, বর্ষাবিস্ফোরিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মতো চারিদিকে ছলছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন- একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল।

একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল,‘ফিরিয়া যাই,জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি’-কিন্তু তখন পালে বাতাশ পাইয়াছে,বর্ষার স্রোত খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে। নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ,কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কি ! পৃথিবীতে কে কাহার। কিন্তু রতনের মনে কোনো তত্ত্বের উদয় হইল না।

সে সেই পোষ্ট অফিসের গৃহের চারিদিকে কেবল অশ্রুজলে ভাসিয়া ঘুরিয় ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বোধ করি তাহার মনে ক্ষীণ আশা জাগিতেছিল, দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে। রবীন্দ্র নাথের অর্ডার বুক/হুকুমনামার স্বাক্ষর অনুযায়ী তার শেষ হুকুম নামা স্বাক্ষর করেছিলেন বাঙলা ১৩০৩ সালের ১১ ফাল্গুন অর্থাৎ ১৮৯৭ সালের ২১ ফেবরুয়ারি। এ থেকে বলাযায়, ১৮৯০ এর জানুয়ারী থেকে ১৮৯৭ ফেবরুয়ারী পর্যন্ত রবীন্দ্র শাহজাদপুরে এসেছেন।

১৮৯৭ সালে রবীন্দ্রনাথদের যৌথ জমিদারি ভাগ হয়ে শাহজাদপুরের অংশ রবীন্দ্রনাথের মেঝকাকা গিরীন্দ্রনাথের বংশধরদের হাতে গেলে তখন থেকে কবি শাহজাদপুরে আসা ছেরে দেন। শাহজাদপুরের অংশ গিরীন্দ্রনাথদের হাতে চলে যাওয়ার কয়েকমাস পরে ১৩০৪ সালের ৮ আশ্বিন রবীন্দ্রনাথ পতিসর যাওয়ার পথে তাঁর প্রিয় শাহজাদপুরে আর একবার এসেছিলেন। সেদিন তাঁর শাহজাদপুরের বিচ্ছেদ স্মরণ করে এখানে বসেই বৈষ্ণম কবিদের বিরহ-বিচ্ছেদের গানের অনুসরণে তাঁর বিখ্যাত সেই ‘যাচনা’ কবিতাটি বা গানটি লিখেছিলেন-‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে-আমার নামটি লিখিয়ো- তোমার মনের মন্দিরে।

পোষ্টমাষ্টার গল্পে পোষ্টমাষ্টারের বিদেয় রতনের মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বিদেয় বেলাতেও রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রভক্তদের অনুভূতি কেমনতর ছিল সেটি যুক্তিশাস্ত্রের বিবেচনায় অনুধাবন করা যেতে পারে।

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার
মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক
প্রধান সম্পাদক, শাহজাদপুর সংবাদ ডটকম
শনিবার, ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৮ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ