শাহজাদপুরে যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধে ধ্বস

যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধে ধ্বস

১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধের কৈজুরী ইউনিয়নের ভাটপাড়ার ৩ স্থান, গালা ইউনিয়নের কাশিপুরের ৩ স্থান, বাসুরিয়া কবরস্থান সংলগ্ন এলাকার ১ স্থান ও ফকিরপাড়ার ১ স্থানসহ গত ১ সপ্তাহে যমুনার ভাঙ্গনে এ বাঁধের ১০ অংশ নতুন করে ধ্বসে গেছে। বাঁধের এ ১০ স্থানে সিসি ব্লক ও জিও টেক্সটাইল সরে গিয়ে এবং ধ্বসে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বাঁধের সিসি ব্লকের ওপর দিয়ে নদী তীরবর্তী ১৩ গ্রামের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

বাঁধের এসব ভাঙ্গন কবলিত স্থানের পরিধি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে নদী তীরবর্তী এলাকাবাসীর উদ্বেগ উৎকন্ঠাও ক্রমশঃ চরম আকার ধারণ করছে। এ ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে যে কোন মুহুর্তে বাঁধটি ভেঙ্গে অসংখ্য ঘরবাড়ি, ফসলী জমি, নির্মাণাধীন অবদা বাঁধও ব্যাপক ক্ষতির সম্মূখীন হতে পারে বলে বিজ্ঞমহল আশংকা প্রকাশ করেছেন। অবিলম্বে বাঁধটি স্থায়ীভাবে মেরামতের জোর দাবী জনিয়েছে এলাকাবাসী।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাঁধটি সরেজমিন পরিদর্শনকালে ভাটপাড়ার নওশাদ আলী, ফজলুল হক, ময়দান, বাতেনসহ নদী তীরবর্তী এলাকাবাসী জানায়, শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত নির্মিত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধের কাজ সম্পন্ন হবার পর যমুনা তীরবর্তী হাজার হাজার হৎদরিদ্র, অসহায়, ছিন্নমূল জনসাধারন নতুন করে বাচাঁর স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ১’শ বছরের টেকসই বাঁধ নতুন করে ধ্বসে যাওয়ায় এলাকাবাসীর সেই বুকভরা আশা ক্রমশঃ হতাশায় আর দুর্ভাবনায় পরিণত হয়েছে। ধ্বসজনিত কারণে হুমকির সন্মুখীন হয়ে পড়েছে ১৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত ওই বাঁধটি।

শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রফেসর আজাদ রহমানের মতে, ‘আমাদের মতো দরিদ্র দেশে জনকল্যাণে ১ শ’৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যমুনা নদী তীর সংরক্ষন বাঁধের ১০ স্থানে ধ্বসে যাওয়ায় স্থানীয় জনমানুষের সীমাহীন ক্ষতির কারণ হতে পারে । নীর্ভরযোগ্য ঠিকাদার দ্বারা দ্রুত ওই বাঁধে নতুন করে ধ্বসে যাওয়া স্থানগুলি মেরামত আশু প্রয়োজন।’

উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, ‘গত প্রায় ১ যুগে যমুনা তীরবর্তী ৪৮টি গ্রামের মধ্যে ৩০টি গ্রামই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ওই বিলীন হওয়া গ্রামগুলোতে বসবাসকারী সাড়ে ৫ সহস্রাধিক পরিবার সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ভেঙে গেছে তিন সহস্রাধিক তাঁত ফ্যাক্টরী, ২টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৭ টি বে-সরকারী ও ৬টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি স্কুল কাম ফ্লাড সেল্টার, ১৮টি মসজিদ, ৮টি মাদ্রাসা, জনতা ব্যাংক, গ্রামীন ব্যাংকের পাকা ভবন, গালা ইউনিয়নের হাতকোরা, বেনুটিয়া, তারুটিয়া হাটবাজার এবং বিপুল পরিমান ফসলী জমি। যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে ভাঙনের কবলে পড়বে কৈজুরী হাট এলাকার ২ শতাধিক আধাপাকা ছোটবড় দোকানঘড়, ২টি স’মিল, ৩টি তেল মিল, ৪টি ধানভাঙ্গা মিল, ঠুটিয়া হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সরকারী খাদ্যগুদাম, সারের গুদাম, বিএস কোয়ার্টার, তহসিল অফিস, স্বাস্থ ও পরিবার কল্যান কেন্দ্র, পোষ্ট অফিস, দাতব্য চিকিৎসালয়, বাংলা ১৩৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী কৈজুরী হাট জামে মসজিদ, কৈজুরী ফাজিল মাদ্রাসা, ও প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যায়ে হুরা সাগরের ওপর নির্মিত সেতু। এদিক বিবেচনায় বাঁধটির ধ্বসে যাওয়া স্থানগুলি শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত মেরামত জরুরী।’

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)’র অর্থায়নে পদ্ম, মেঘনা ও যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় পাবনা জেলার বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে গত ’২০০৯ সালে ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পকাজ শুরুর পর অত্যাধুনিক জিও টেক্সটাইল ব্যাগে বালি ভরে পল্টন ও ক্যারেনের সাহায্যে যমুনা নদীর তলদেশে স্তরে স্তরে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তীরের উপরিভাগের দিকে তুলে আনা হয়।

শুষ্ক মৌসুমে যমুনায় পানির স্তর যে পর্যন্ত নেমে যায় সে পর্যন্ত এই বালি ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং করা হয়। এরপর শুষ্ক মৌসুমে পানির সর্বনিম্ন স্তরের উপর থেকে সিসি ব্লক দিয়ে তীরের সম্পূর্ণ উপরিভাগ পর্যন্ত বেধে দেয়া হয়। ফলে যমুনা নদীর স্রোতের ধাক্কা ও পানির ঘুর্ণাবর্তে নদীর তীর ভেঙ্গে যাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা কমতে থাকে। ওই বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হয় গত ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে।

পাউবো কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়, ‘যেহেতু টেকসই ও উন্নতমানের জিও টেক্সটাইল ব্যাগ পানির নিচে থাকা অবস্থায় ১শ’ বছরেও পচন ধরবে না সেহেতু বাঁধ নিমার্ণকাজ সম্পন্ন হবার পর আগামী ১শ’ বছরেও যমুনা নদীর তীর ভাঙ্গার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তবে তেমন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাঁধটি দফায় দফায় নতুন করে ১০ স্থানে ফের ধ্বসে গেছে।

এলাকাবাসী জানায়, শাহজাদপুরের কৈজুরী থেকে বিনোটিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন হবার পর শান্ত ও থমকে দাড়ায় প্রমত্তা, প্রবলা, প্রগলভা যমুনার আগ্রাসী ভাঙ্গন। ফলে কৈজুরী থেকে শুরু করে গুদিবাড়ী, ভাটপাড়া, লোহিন্দাকান্দি, জামিরতা, জগতলা, বালিয়াহাটা, খাউর‌্যা, মৌকুড়ি, কাশিপুর, মারজান, ফকিরপাড়া, বেনুটিয়া, গুপিয়াখালী, ভেড়াখোলা, তারুটিয়া ও চর পেচাকোলা গ্রামের এলাকাবাসী সরাসরি এর সুফল পাওয়ায় এলাকার আর্থ-সামাজিক পটের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু, বর্তমানে জনগুরুত্বপূর্ণ এ বাঁধটির ধ্বসে যাওয়া অংশ দ্রত স্থায়ী ভাবে মেরামত করা না গেলে অনাগত ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে কোন ভাবেই এলাকাবাসীকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

ভিডিওটি: