শাহজাদপুরে বন্যার পানিতে ভেঙ্গে গেছে নির্মাণাধীন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাতায়াত সড়ক

মোঃ মুমীদুজ্জামান জাহানঃ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যহত রয়েছে। ফলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ স্থান রামকান্তপুর মৌজার বাথান এলাকার বুড়ির ভিটায় যাওয়ার জন্য সিসি ব্লক দিয়ে নির্মানাধীন পোতাজিয়া গ্রামের শিমুল বিশ্বাসের বাড়ি হতে রেশমবাড়ি পাঁকা সড়ক পর্যন্ত নির্মানাধীন ১ কিলোমিটার সড়কটি বন্যার পানির চাপে ভেঙ্গে গেছে। পোতাজিয়া ইউনিয়নের ৮নং মেম্বার নজরুল ইসলাম জানান, গতকাল সোমবার ভোরে এ সড়কটি ভেঙ্গে যাওয়ায় শাহজাদপুর এলজিইডি অফিসের প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা জলে চলে গেছে। এ ছাড়া উপজেলার পোতাজিয়া, কায়েমপুর, গাড়াদহ ও রূপবাটি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এ গ্রাম গুলি হল, আহাম্মদপুর, করশালিকা, ছোটবায়রা, শাকতোলা, নুকালি, রাউতারা, পোতাজিয়া, ভাইমারা, রেশমবাড়ি, চিথুলিয়া, কাশিনাথপুর, সড়াতৈল, বনগ্রাম, কাকিলামারী, মাদলা, বাড়াবিল, নলুয়া, বৃ-আঙ্গারু, চর আঙ্গারু ও চুলধরি।
এ সব গ্রামের অধিকাংশ রাস্তা-ঘাট বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় শাহজাদপুর উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে এ সব গ্রামের মানুষের সরাসরি সড়ক পথে যাতায়াত করতে পারছে না। এ ছাড়া এ সব গ্রামের মাঠ-ঘাট বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় কাঁচা ঘাসের অভাবে কৃষকরা তাদের শত শত গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। ফলে বাজারে দানাদার গো-খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সুযোগে খইল,ভুষি ও দানাদান প্যাকেট খাদ্য বিক্রেতারা বস্তা প্রতি ২/৩‘শ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে উপজেলার গো-খামার মালিক ও কৃষকেরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। অপর দিকে পোতাজিয়া-রেশমবাড়ি,বাড়াবিল-চুলধরি ও বৃ-আঙ্গারু লো-হাইড পাকা সড়ক বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় এ সব সড়কে অটো রিক্সা-ভ্যান,ভটভটি,মটর সাইকেল,নছিমন-করিমন,বাস,ট্রাক সহ সকল প্রকার যানবহণ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এ সব গ্রামের মানুষের যাতায়াত ও মালামাল পরিবহণে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অপরদিকে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যহত থাকায় শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি,সোনাতুনি,খুকনি ও জালালপুর ইউনিয়নের কমপক্ষে ১৭টি গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙ্গণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙ্গণ কবলিত গ্রাম গুলি হল, উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়নের ভাটপাড়া,গুদিবাড়ি,জগতলা,ঠুটিয়া ও হাটপাচিল,জালালপুর ইউনিয়নের পাকুরতলা,ভেকা,বাঐখোলা,খুকনি ইউনিয়নের আরকান্দি ও ব্রাহ্মণগ্রাম,সোনাতুনি ইউনিয়নের ধীতপুর,শ্রীপুর,মাকড়া,সোনাতুনি,বড় চানতারা,বারপাখিয়া ও বানতিয়ার। ইতিমধ্যেই এ সব গ্রামের অন্তত ২ শতাধিক ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ,৫‘শ বিঘা আবাদি জমি ও ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এলাকাবাসির মধ্যে চরম ভাঙ্গণ আতংক বিরাজ মধ্যে করছে।

এলাকাবাসি জানায়,বর্ষা মৌসুম শুরুর সাথে সাথে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। আর এই পানি বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে উপজেলার এ সব গ্রামে এ ভাঙ্গণ শুরু হয়েছে। গত ১ সপ্তাহে ভাটপাড়া এলাকার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের ৫টি স্থানের অন্তত ১ হাজার ফুট এলাকার সিসি ব্লক ও জিও টেক্সপেপার নদীগর্ভে ধসে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গণ কবলিত এলাকাবাসির অভিযোগ,সিরাজগঞ্জ পানিউন্নয়ন বোর্ড গত বছরের ভাঙ্গণ এলাকা মেরামত না করায় এবং এ বছর এখনো ভাঙ্গণ রোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় এই ভাঙ্গণ আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে বাড়িঘর ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ভাঙ্গণ আতঙ্কে এখানকার মানুষেরা প্রতিদিন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। যমুনার ভাঙ্গণে ভিটেমাটি ও আবাদি জমি হারিয়ে পগল প্রায় আলমাস হোসেন জানান, ভাঙ্গণের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। ৮ বার বাড়ি ভেঙ্গেছে। প্রতিবারই সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আবারও যদি বাড়িঘর যমুনার পেটে চলে যায়,তবে আর ঘুরে দাড়াতে পারব না।
এ ব্যাপারে কৈজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম,জালালপুর ইউনিয়নের সুলতান মাহমুদ ও সোনাতুনি ইউনিয়নের লুৎফর রহমান জানান, নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যহত থাকায় স্রোত তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে শাহজাদপুরের যমুনা নদীর তীর এলাকায় ব্যাপক ভাঙ্গণ শুরু হয়েছে। এ ভাঙ্গণের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না তীরসংরক্ষণ বাঁধ। এলাকাবাসি নিজেদের টাকায় বাঁশ-চাটাই কিনে ভাঙ্গণ রোধের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছে না। এ ভাঙ্গণ রোধে অতিদ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নিতে তারা অনুরোধ করেন।
এলাকাবাসি জানায়, সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন প্রকার কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তারা এবারও ভাঙ্গণের কবলে পড়েছে। এখনও এ ভাঙ্গণ রোধে কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় তারা চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছে।
এলাকাবাসি আরো জানায়,এ ভাঙ্গন রোধে গত ৬ বছর আগে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজাদপুরের কৈজুরী থেকে বেনুটিয়া পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এলাকায় তীরসংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। গত ৪ বছর ধরে এ বাঁধে কোন সংস্কার কাজ না করায় বাঁধের বিভিন্ন স্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওই সব দুর্বল স্থানে লিকেজ সৃষ্টি হওয়ায় সেখানে নতুন করে ধস দেখা দিয়েছে। এ ধসে মুহুর্তের মধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয় যাচ্ছে পাথরের ব্লক ও জিও টেক্স পেপার। এ জন্য তীরবর্তী হাজারো মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে আতংক।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, টাকার সংকুলান না থাকায় আপাতত বাঁধ রক্ষায় কাজ করা যাচ্ছেনা। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ভাঙ্গণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে।