শাহজাদপুরে দিনে উৎপন্ন ৪ লাখ লিটার খাঁটি গরুর দুধ দেশের দুধের চাহিদা পূরণ করছে

শামছুর রহমান শিশির : দুগ্ধশিল্পের রাজধানী ও দেশের নিউজিল্যান্ড খ্যাত জনপদ শাহজাদপুর উপজেলার পৌর সদরসহ ১৩ টি ইউনিয়নে প্রতিদিন উৎপন্ন হচ্ছে ৪ লাখ লিটার গরুর টাটকা দুধ। এ ৪ লাখ লিটার দুধ খামারীদের বাথান ও গোহাল থেকে প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড, মধ্যস্বত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বাঘাবাড়ীস্থ মিল্কভিটা কারখানা, বেসরকারি ডেইরি প্রজেক্টের স্থ’ানীয় কুলিং সেন্টার প্রান, এমোমিল্ক, আফতাব, কোয়ালিটি, আড়ং, টাটকা, আকিজসহ বিভিন্ন সংস্থায় সরবরাহ করা হচ্ছে। সরবরাহকৃত ওই বিপুল পরিমান দুধ মিল্কভিটাসহ অন্যন্য সংস্থার কারখানায় প্রক্রিয়াজাত ও শীতলীকরনের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে যা দেশে দুধের চহিদার সিংহভাগ পূরণ করছে।
শাহজাদপুর উপজেলা পশুসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, শাহজাদপুর উপজেলায় গবাদীপশুর মোট সংখ্যা ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭শ’৮৫ টি। এর মধ্যে দেশী জাতের গরু সংখ্যা ৮৪ হাজার ৩শ’ ৭৬ টি। সংকর জাতের গরুর সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ১শ’ ২০টি।বেসরকারী দুগ্ধ খামার ৩ হাজার ৬ শ’৫০ টি। রেজিষ্ট্রিকৃত খামারের সংখ্যা ২ হাজার ৫ শ’ ৮৮ টি। দেশী বক্না গরুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬ শ ৯২ টি, দেশী এঁড়ে বাছুরের সংখ্যা ২৮ হাজার ৩ শ’২০টি, বক্না বাছুরের সংখ্যা ১৯ হাজার ৫ শ’ ৩৬ টি। সংকর জাতের বকনার সংখ্যা ১৪ হাজার ২শ’টি, সংকর জাতের বকনা বাছুরের সংখ্যা ২৫ হাজার ৪ শ’ ৭৫ টি। কাগজে কলমে গো-সম্পদের এই পরিসংখ্যান পরিলক্ষিত হলেও বাস্তবে তা সংখ্যায় প্রায় দ্বিগুণ হবে। এই বিপুল সংখ্যক গাভী থেকে বর্তমানে মিল্কভিটার বাঘাবাড়ীস্থ কারখানসহ অন্যান্য বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কারাখানায় প্রতিদিন সকাল ও বিকাল এ দুই বেলায় চার লাখ লিটার টাটকা দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জানা গেছে,বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ অঞ্চলের গো -সম্পদের ওপর ভিত্তি করে বাঘাবাড়ীতে গড়ে ওঠে মিল্কভিটার বিশাল কারখানা। মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ষাঁড়ের সঙ্গে স্থানীয় জাতের গাভীর প্রজননের মাধ্যমে উন্নতজাতের সংকরজাতের গাভীর জন্ম দেওয়া হয়। শাহজাদপুরে বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়ান, শাহীওয়াল , জার্সি, ফ্রিজিয়ান, এফএস ও সিন্ধিসহ বিভিন্নজাতের সংকর গাভী রয়েছে। শাহজাদপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশী দুধ উৎপাদিত হয় জনবিচ্ছিন্ন বিস্তৃর্ণ বাথান ও পোতাজিয়া, রেশমবাড়ী, আঙ্গারু, টেপরি, পুরান টেপরি, বাড়াবিল, রুপবাটি, রাউতারা,
পোরজনা, পুঠিয়া, ডায়া, নগরডালা, কাকুরিয়া, কাদাইবাদলা, চিথুলিয়া, কাশিনাথপুর, বনগ্রাম, সরিষাকোল,মশিপুর, নুকালী, শেলাচাপড়ী, চরাচিথুলিয়া, ভাইমারা, টিয়ারবন্দ, বহলবাড়ী, আহম্মদপুর, বিন্নাদায়ের, মাদলা, শাকতোলা, বিলকলমী, যমুনা নদী তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও চরাঞ্চল এলাকার বিভিন্ন বসতবাড়ী ও গো-খামারে। বানিজ্যিক ভিত্তিতে এসব এলাকায় সবচেয়ে বেশী দুধ উৎপাদিত হয়ে থাকে। হাজার হাজার ক্যানে করে ভ্যান ও ট্রলিযোগে দুধ পৌছে দেওয়া হয় বাঘাবাড়ীর মিল্কভিটা কারখানাসহ বিভিন্ন এলাকায়। গবাদীপশু সমৃদ্ধ শাহজাদপুরে ছিটিয়ে আছে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক গো-সম্পদ। অনেকে শখে, অনেকে পারিবারিক দুধের চাহিদা মেটাতে আবার অনেকে বানিজ্যিক ভিত্তিতে উন্নতজাতের গাভী লালন পালন করছেন । উৎপাদিত দুধের সিংহভাগ উপজেলার বাঘাবাড়ীস্থ মিল্কভিটা কারখানার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। মিল্কভিটার বাইরে প্রান ,এমোমিল্ক, আফতাব, কোয়ালিটি, আড়ং, টাটকা, আকিজসহ বিভিন্ন সংস্থাও শাহজাদপুর থেকে দুধ সংগ্রহ করে শীতলীকরন করে সারাদেশে সরবরাহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। শাহজাদপুর উপজেলার বিভিন্ন বসতবাড়ী ও বাথানো গোখামারে বিভিন্ন ধরনের উন্নতজাতের জাতের গাভী রয়েছে। তন্মদ্ধে উল্লেখযোগ হচ্ছে, কোরিয়ান, অষ্ট্রেলিয়ান, শাহীওয়াল, ফিজিয়ানসহ দেশী জাতের গাভী। খামারীরা জানান, একটি অষ্ট্রেলিয়ান গাভী ১৫ থেকে ২৫ লিটার দুধ দেয়। সেইসাথে ১২-১৫ টি বাছুর জন্ম দিতে পারে। একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী ১২-২৩ লিটার দুধ দেয়। অন্যান্য জাতের গাভীও আশাব্যঞ্জক দুধ দিয়ে থাকে। গো-চাষীরা প্রাথমিকভাবে দুধ সংগ্রহ করে সেই দুধ তারা মিল্কভিটার আওতাভূক্ত দুধ সমিতিসহ বিভিন্ন বেসরকারী দুগ্ধ প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে। এখানে উন্নতজাতের গাভী থেকে দুধ প্রক্রিয়াকরনের মাধ্যমে তরলদুধ ,গুঁড়োদুধ, ঘি, মাখন, কনডেন্সড্ মিল্ক ও আইসক্রিম তৈরি করে পরিবেশকের মাধ্যমে সারাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে যা দেশে তরল দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা পূরণ করছে।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.