অর্থ-বাণিজ্যকরোনাশাহজাদপুর

করোনা ও বন্যায় ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে ভয়াবহ বিপর্যয়


শাহজাদপুরে তাঁতী-শ্রমিকদের ঘরে নেই ঈদের আমেজ

করোনা ভাইরাসের ক্রান্তিকালে দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু শাহজাদপুরের তাঁতীরা পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরের বাজারে চরমভাবে মার খেয়েছে। সারা বছরের পুঁজি হারিয়ে ধার-দেনা, ব্যাংক ঋণ ও দাদন নিয়ে কোন মতে ঊদুল আযাহার বাজার ধরার জন্য শাড়ি লুঙ্গি তৈরিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে তাঁতীরা। এরই মধ্যে ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে সর্বনাশা চলমান বন্যা। একের পর এক দূর্যোগে সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে তাঁতীদের। শাহজাদপুরে যমুনা নদীর পানি বিপদ সীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাঁত কারখানায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় তাঁতীদের কারখানায় হ্যান্ডলুম ও পাওয়ারলুমই শুধু নষ্ট হয়নি, ব্যাংক ঋণ ও দাদনের টাকায় কেনা তাঁতের তেঁনার সুতাও নষ্ঠ হয়ে হয়েছে। অনেক তাঁত কারখানায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় হাজার হাজার তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক তাঁতী ও শ্রমিক। এসব বানভাসি পরিবারে নেই ঈদের আনন্দ ও আমেজ। ফলে সার্বিকভাবে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়!
গতকাল মঙ্গলবার ও বুধবার (২৮ ও ২৯ জুলাই) দুই দিন সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন তাঁতপল্লী পরিদর্শনকালে তাঁতীরা জানায়, প্রতি বছর ঈদ উল আযহাকে ঘিরে এ সময় বাহারি নানা ডিজাইনের কাপড় বুনতে নির্ঘুম সময় পার করত তাঁতী ও শ্রমিকরা। এ সময় খট খট শব্দের মুখরিত ও প্রাঞ্জলিত হয়ে থাকতো। কিন্তু এবছর করোনাভাইরাসের প্রকোপে লকডাঊনের কারণে হাত ছাড়া হয়ে গেছে নববর্ষ ও ঈদুল ফিতরের বাজার। মজুত হয়ে আছে শত শত কোটি টাকার কাপড়। ঈদুল আযহার বাজার ধরার জন্য অনেক কারখানা মালিক ধারদেনা, দাদন ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফের কারখানা চালু করলেও ভয়াবহ বন্যার কারণে কয়েক হাজার তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া, নগরডালা, হাসাকোলা, রতনকান্দি, বেলতৈল, ডায়া, কৈজুরী, জামিরতা, ভাটপাড়া, জগতলা, রুপনাই, জালালপুর, প্রাণনাথপুর, রুপপুর, রুপপুর নতুনপাড়া, উরিরচর, নগরডালা, বাদলবাড়ী, হামলাকোলা, ডায়া নতুনপাড়া, চর পোরজোনা, খুকনীসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে অসংখ্য তাঁতপল্লী। করোনার কারণে পাওয়ার লুম, হস্তচালিত তাঁত, প্রক্রিয়াজাত রং এবং ডিজাইনের সাথে জড়িত প্রায় ৫০ হাজার তাঁত শ্রমিক এমনিতেই বিপর্যস্থ অবস্থায় দিনযাপন করছিলো। বন্যা তাঁদের পথে বসিয়েছে। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বসতঘরগুলো। পানিতে ডুবে থাকায় তাঁতযন্ত্রগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। এখন তাঁরা জীবন জীবীকা নিয়ে উদ্বেগ-উৎক›ঠায় রয়েছেন। তাঁতঘর, বসতঘর ও অকেজো তাঁত অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া ও মেরামতের দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। এর সঙ্গে খাবার যোগাড়ের চিন্তা তাদের দুঃশ্চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শাহজাদপুর উপজেলার চরপোরজনা গ্রামের হাতেগোনা ৮-১০টি তাঁত কারখানা ছাড়া প্রায় সবকটি কারখানায় বন্যার পানি ঢুকেছে। কারখানায় হাটু পানির মধ্যে কেউ কেউ শাড়ি তৈরীর বৃথা চেষ্টা করছেন। তবে বন্যা যেভাবে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তাতে আগামী ২-৩ দিনের মধ্যেই এসব কারখানার টানা ডুবে যাবে বলে তাঁত শ্রমিকেরা শংকা প্রকাশ করেছেন। ওই গ্রামের তাঁত কারখানা মালিক আব্দুল্লাহ বললেন, ‘করোনার জননো এ্যবাই আমাদের কামাই-কাজি বন্ধ হয়্যা গেছিল। শেষ সম্বল দুই হ্যান তাঁত দাদনে টেহা নিয়্যা চালু কইরা বাইচতে চাইচিল্যাম। কিন্তু বইনন্যায় হেই আশাও শেষ ওয়্যা গেলো।’ বেশ কয়েকজন তাঁতী আরও জানায়, গত বছর বাংলা নববর্ষ ও ঈদ উপলক্ষে তৈরি কাপড় বিক্রি করে ঋণ ও ধারদেনা শোধ করেছিলো তাঁতীরা। কিন্তু এবছর ঈদুল-আযহায় ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় কেনা তো দুরের কথা; পেটের ক্ষুধা কিভাবে মিটবে তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁতী ও শ্রমিকেরা। প্রতি বছরের এ সময়ের অতিরিক্ত আয় দিয়েই সংসারের বাড়তি খরচ মেটাতেন তাঁতী ও শ্রমিকেরা। কিন্তু এ বছর সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে এই করোনা আর বন্যা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্পেশালাইজ টেক্সটাইল মিলস এন্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স এসোসিয়েশনের পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হায়দার আলী বলেন, ‘ করোনা ভাইরাসের ক্রান্তিকালের মধ্যে ভয়াবহ বন্যায় এলাকার অসংখ্য তাঁতকারখানা বন্ধ থাকায় তাঁতীরা তীব্র পুঁজি সংকটে পড়ে। লকডাউন উঠে গেলেন পুঁজির যোগান দিতে না পারায় শাহজাদপুরের শতকরা ৭০ ভাগ তাঁত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেড় লাখ তাঁত মালিক ও শ্রমিকদের জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছে। অবিলম্বে তাদের মাঝে সরকারিভাবে পুঁজির যোগান দেয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের ভয়াবহ বিপর্যয় কোন ভাবেই রোধ করা সম্ভব হবে না।’

একই বিভাগের সংবাদ

Back to top button
x
Close
Close
%d bloggers like this: