করোনা ও বন্যায় অস্তিত্ব সংকটে তাঁতশিল্প; ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদান জরুরী


শাহজাদপুরে তাঁতীদের ৫’শ কোটি টাকার ক্ষতি !

করোনা ভাইরাস ও সাম্প্রতিক বন্যায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু শাহজাদপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তাঁতীরা হারিয়েছে তাদের পুঁজি। আর বন্যায় তাঁত কারখানার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পোকামাকড় কেটেছে কাপড়, তেনাসহ সরঞ্জমাদি। এসব কারণে শাহজাদপুরের তাঁতশিল্পে প্রায় ৫’শ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। গত ৫ মাস ধরে বন্ধ থাকা তাঁত পুঁজি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চালু করতে না পারায় ১ লাখেরও বেশী তাঁতী ও শ্রমিকের লোকসান দিনদিন বেড়েই চলেছে।

জানা গেছে, তাঁতসমৃদ্ধ শাহজাদপুরে ১ লাখেরও বেশি পাওয়ারলুম ও ৫০ হাজারের বেশি হ্যান্ডলুম (চিত্তরঞ্জন) রয়েছে। করোনা ও বন্যার কু-প্রভাবে গত ৫ মাসে এলাকার প্রায় ৮০/৯০ হাজার তাঁতই বন্ধ রয়েছে। এতে ১ লাখেরও বেশি তাঁতী ও শ্রমিক বেকায় হয়ে মানবেতরভাবে দিন কাটাচ্ছে। এ মন্দাবস্থার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শাহজাদপুরের অন্য সকল ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ওপর। শাহজাদপুরের তাঁতপল্লীতে তৈরি উন্নতমানের বাহারি ডিজাইনে শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি, থ্র্রি-পিছ এবং গামছা দেশে তাঁতবস্ত্রের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে আসছে। ভারতসহ বহির্ঃবিশে^র বেশ কয়েকটি দেশেও বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার তাঁতবস্ত্র রফতানি হয়ে আসছে। উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁতবস্ত্রের আমদানিকারক, দেশি ক্রেতা, ব্যাপারী ও পাইকারের আগমন শুণ্যপ্রায় হওয়ায় করোনার ক্রান্তিকালের পূর্বে উৎপাদিত তাঁতবস্ত্রের মজুদ অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে। নিরূপায় হয়ে অনেক তাঁতী মজুদকৃত তাঁতবস্ত্র সোহাগপুর, এনায়েতপুর, আতাইকুলা, পোড়াদহ, করটিয়া, বাবুর হাট ও গাউসিয়া হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে গিয়েও ক্রেতার অভাবে তা বিক্রি করতে পারছে না। ফলে তারা পুঁজিশূণ্য হয়ে প্রতিনিয়ত হাঁ-হুতাশ করছে। নতুন করে কাঁচামাল ক্রয়, বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁত ও তাঁতকারখানা মেরামত, তাঁতী ও শ্রমিক পরিবারে জীবিকা নির্বাহ, ঋণের কিস্তি ও সুদের ঘানি টানতে গিয়ে দিনে দিনে অথৈ ঋণের মরণ জালে তাঁতীরা আটকা পড়ছে। ফলে দেশের সর্ববৃহৎ কুঁটির শিল্প ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে অস্তিত্ব সংকটাবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সরেজমিন পরিদর্শকালে শাহজাদপুর পৌর এলাকার তাঁতপল্লী রূপপুর নতুন পাড়া ও উরির চর মহল্লার মৃত বছির উদ্দিনের ছেলে প্রান্তিক তাঁতী বৃদ্ধ রহমত আলী (৭০) কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, ‘২টি তাঁত বন্ধ থাকায় ৪ সদস্যের পরিবারের জীবন থমকে দাঁড়িয়েছে। ছেলের উচ্চশিক্ষাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ৫ মাসে তার ১ লাখ টাকা লোকসান হওয়ায় পুঁজিশুণ্য ও ঋণগ্রস্থাবস্থায় অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’ একইভাবে গত ৫ মাসে এ মহল্লার মৃত আমান মুন্সীর ছেলে শফিকুল ইসলামের ১৬টি তাঁত বন্ধ থাকায় ১০ লাখ টাকা, রূহুল আমিনের ১২টি তাঁত বন্ধ থাকায় ৫ লাখ টাকা, নুরু মিয়ার ছেলে শাহান আলীর ১৪টি তাঁত বন্ধ থাকায় আড়াই লাখ টাকা, আলম কাজীর ১০টি হ্যান্ডলুম ও ৮টি পাওয়ারলুম বন্ধ থাকায় ৬ লাখ টাকা, আব্দুর রহিমের ২টি পাওয়ারলুম বন্ধ থাকায় ১ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে। হাতে টাকা না থাকায় এসব তাঁতী তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও তাঁত মেরামত ও কাঁচামাল কিনে তাঁত চালু করতে পারছেন না। এ করুণাবস্থা শুধু এসব তাঁতীদের নয়, শাহজাদপুরের সকল তাঁতীই অর্থ সংকটে পড়েছে। ফলে তাদেরও লোকসানের হার উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে।

এসব বিষয়ে গতকাল বুধবার দুপুরে শাহজাদপুর হ্যান্ডলুম ও পাওয়ারলুম এসোসিয়েশনের আহবায়ক তাঁতী নেতা হাজী নজরুল ইসলাম চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা প্রকাশ করে জানান, ‘ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ও তাঁতীদের এমন করুণ দশা জীবদ্দশায় কখনও দেখিনি। এ দুরবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই শিল্পটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে ও সর্বশান্ত হয়ে যাবে এলাকার লাখ লাখ তাঁতী।’

এদিকে, বাংলাদেশ স্পেশালাইজ টেক্সটাইল এন্ড পাওয়ারলুম ইড্রাষ্ট্রিজ এসোসিয়েশসের উত্তরাঞ্চলের পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি কেন্দ্রীয় তাঁতী নেতা বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হায়দার আলী আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, এক সময়ে দেশিয় তাঁতে তৈরি মসলিন জগৎ জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলো। মসলিন তৈরির পথকে চিরতরে রূদ্ধ করতে বৃট্রিশ বোনিয়ারা তাঁতীদের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করলেও ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প তখনও টিকে ছিলো। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাব ও এবারের বন্যায় এলাকার তাঁতীদের ক্ষতি সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। গত ৫ মাসে শাহজাদপুরের তাঁতীদের কমপক্ষে ৫’শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিলুপ্তির হাত থেকে তাঁতশিল্পকে রক্ষায় প্রান্তিক তাঁতীদের মাঝে সরকারিভাবে কমপক্ষে ১ হাজার কোটি টাকা সহজ শর্তে ঋণ প্রদান অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে।’