শাহজাদপুরে ঈদ ফ্যাশানে নব্য সংযোজন কাজললতা; যাচ্ছে ভারত জার্মানী ইটালী ইংল্যান্ডসহ বহির্বিশ্বে

শামছুর রহমান শিশির, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র দ্বারিয়াপুর বাজারে অবস্থিত উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁতবস্ত্র ব্যবসায়ের ভরা মৌসুমে আসন্ন রোজার ঈদ ও শারদীয় দুর্গাপূজাকে উপলক্ষ করে উৎসবকালীন মজুদ গড়তে প্রতি হাটে কোটি কোটি টাকার দেশি তাঁতে তৈরি তাঁতের শাড়ি রফতানি হচ্ছে ভারতসহ বহিঃর্বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে। ফলে দেশি তাঁতে তৈরি শাড়ির জন্য বহিঃর্বিশ্বে খুলে গেছে সম্ভাবনার নবদিগন্তের দ্বার। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত তাঁতের শাড়ির শতকরা ৪০ ভাগ রফতানি হচ্ছে ভারতে। নানা রং-বেরংয়ের বাহারী ডিজাইনের দেশি তাঁতের শাড়ির গুণগত মান ও বাজার দর ভারতীয় বস্ত্র বাজারের অনুকূলে থাকায় শাহজাদপুরসহ দেশের তাঁতসমৃদ্ধ এলাকায় উৎপাদিত তাঁতের শাড়ির কদর ও চাহিদা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ক্রমশই বাড়ছে। ভারতে ব্যাপকভিত্তিতে দেশি তাঁতের শাড়ি রফতানি করতে পারায় তাঁতীরা সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে। এছাড়া শাহজাদপুর কাপড়ের হাট থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে তাঁতের শাড়ি জার্মানী, ইটালী, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে।
আসন্ন রোজার ঈদের ফ্যাশানের নব্য সংযোজন শাহজাদপুর পৌরসদরের রূপপুর নতুনপাড়া মহল্লার নুসরাত ফ্যাক্টরীর স্বত্বাধিকারী সিঙ্গার বরাত এবারের ঈদে অত্যন্ত মিহি সুতা ব্যবহার করে সুনিপুন হাতের কোমল স্পর্শে হৃদয় উজাড় করে দিয়ে দেশীয় তাতে ‘কাজললতা’ নামের একটি নতুন শাড়ি প্রস্তুত করেছেন যা ইতিমধ্যেই সাড়াদেশে ব্যাপক চমক সৃষ্টি করেছে।
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ঐহিত্যবাহী শাহজাদপুর কাপড়ের হাটের লালমিয়া সুপার মার্কেটের আকন্দ টেক্সটাইল পরিদর্শনকালে তাঁতবস্ত্র রফতানিকারক লুৎফর রহমান লিটন আকন্দ জানান,‘ ঐহিত্যবাহী শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সিজনের প্রতি হাটে শতাধিক ভারতীয় ক্রেতা শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে শাড়ি কাপড় ক্রয়ে আসছেন। তারা একেকজন কমপক্ষে ২ হাজার জোড়া তাঁতের শাড়ি থেকে শুরু করে ১৫ হাজার জোড়া তাঁতের শাড়ি ক্রয় করছেন। তার দোকানে সাড়ে ৭’শ টাকা জোড়া থেকে শুরু করে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষনীয় ডিজাইনের সাড়ে ৩৫’শ টাকা জোড়া আধুনিক ও উন্নতমানের তাঁতের শাড়ি রয়েছে। যার সিংহভাগ কাপড়ই ভারতীয় পাইকাররা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।’
বাংলাদেশ স্পেশালাইজ্ড পাওয়ারলুম এন্ড হ্যান্ডলুম ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ এর উত্তরাঞ্চলের প্রতিনিধি,পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ হ্যান্ডলুম এ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ হায়দার আলী জানান,‘শাহজাদপুরসহ দেশের তাঁতসমৃদ্ধ এলাকায় রোজার ঈদকে সামনে রেখে বর্তমানে উৎপাদিত ঐতিহ্যবাহী তাঁতের কাপড়ের উৎপাদনের মোট অংশের শতকরা ৪০ ভাগ কাপড় শাহজাদপুর কাপড়ের হাট থেকে শুধুমাত্র ভারতে রফতানি হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও তাঁতের শাড়ির ব্যাপক কদর রয়েছে।’ এ সময় তিনি অতীতে এদেশের তাঁতীদের তৈরি বিশ্ববিখ্যাত মসলিন শাড়ি উৎপদনের সময়ে বিখ্যাত ইংরেজী পর্যটক র‌্যালফ্ ফিশের করা মন্তব্যটি প্রসঙ্গে বলেন,‘ওই সময় বিখ্যাত পর্যটক র‌্যালফ্ ফিশ বস্ত্র উৎপাদনকারীরা ভবিষ্যতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী হবে বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আমাদের দেশের তাঁতে তৈরি শাড়ি একসময় যেমন বিশ্বখ্যাত হয়েছিল তেমনি সরকারিভাবে বিশ্বের প্রতিটি দেশে দেশীয় তাঁতবস্ত্র রফতানির উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের অর্থনীতি যেমন চাঙ্গা হবে তেমনি র‌্যালফ্ ফিশের করা মন্তব্যটি বাস্তবে পরিণত হবে।
সরেজমিন শাহজাদপুর কাপড়ের হাট পরিদর্শন করে ও অসংখ্য তাঁতিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ, নরসিংন্দী, ঢাকার মিরপুরের বেনারসী, সোঁনারগাঁ’র জামদানী, যশোরের মোমিননগর নওদ গ্রামে তৈরি হস্তচালিত ও বৈদ্যুতিক পাওয়ারলুলে উৎপাদিত তাঁতের শাড়িসহ দেশের তাঁতসমৃদ্ধ প্রায় সকল এলাকা থেকে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁতের শাড়ি ক্রয় বিক্রয়ের জন্য শত শত ব্যবসায়ী সপ্তাহের দুটি হাটে শাহজাদপুরে আসছেন। আবার অনেকে শো-রুম নিয়ে স্থায়ীভাবে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁতের শাড়ি কাপড়ের ব্যবসা করে আসছেন। দেশের তাঁতসমৃদ্ধ জনপদের প্রায় সব জায়গারই তাঁতের শাড়ি বিক্রির শো-রুম রয়েছে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে। শাহজাদপুর একটি উপজেলা শহর হলেও উত্তরাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসায় সফল এলাকা হওয়ায় এখানে সরকারি ব্যাংকগুলোর শাখা’র পাশাপাশি বেসরকারি ডাচবাংলা ব্যাংক,ওয়ান ব্যাক,আল আরাফা ব্যাংক,সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক,ইসলামী ব্যাংক,ন্যাশনাল ব্যাংক,উত্তরা ব্যাংকসহ বিভিন্ন তফশীলি ব্যাংকের শাখা রয়েছে। ফলে সব ধরনের ব্যাংকিং লেদনের সুযোগ থাকায় ব্যাপারী পাইকারদের শাড়ির ব্যাবসা করতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। উত্তর জনপদের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে সপ্তাহে দুইদিন ভারত থেকে প্রায় অর্ধশতাধিকেরও বেশী ব্যাপারী পাইকার ঈদকে সামনে রেখে হাজার হাজার জোড়া তাঁতের শাড়ী ক্রয় করছেন। সুবিধাজন আধুনিক সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা গ্রহনের সুযোগ থাকার ফলে শাহজাদপুর কাপড়ের হাট থেকে সপ্তাহের দ্ইু দিনের প্রতি হাটে কোটি কোটি টাকার দেশীয় তাঁতে উৎপাদিত তাঁতের শাড়ি ভারতে রফতানি হচ্ছে। ভারতীয় বস্ত্রের বাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত তাঁতের শাড়ির ব্যাপক কদর ও চাহিদা থাকায় বর্তমানে দেশে উৎপাদিত মোট শাড়ীর শতকরা ৪০ ভাগ রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। ভারতের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহনের ফলে ওই বিপুল পরিমান দেশীয় তাঁতের শাড়ি ভারতে রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক তাঁতীদের অভিমত। এজন্য দেশের সর্ববৃহৎ কুটিরশিল্পখ্যাত তাঁত শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত লক্ষ লক্ষ তাঁতী ভারতে প্রতি সপ্তাহের দুইদিন রোববার ও বুধবারে শাহজাদপুর কাপড়ের হাট থেকে কোটি কোটি টাকার দেশীয় তাঁতের শাড়ি রপ্তানি করতে পারায় সরকারের যুগোপুযোগী কার্যকর পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছে। একইভাবে দেশের হ্যান্ডলুম ও
পাওয়ারলুমে উৎপাদিত বিশ্বমানের তাঁতের শাড়ি বিশ্বের প্রতিটি দেশে র রফতানির জন্য যথাযথ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জোড়ালো দাবির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের তাঁতের শাড়ি তৈরিতে তাঁতীদের ব্যাপকভিত্তিতে প্রশিক্ষন প্রদান কর্মসূচী অবিলম্বে প্রচলনেরও দাবি জানিয়েছেন।