শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জে ক্রমাগত মুক্ত মৌমাছি মৌচাক ও ফসলের উৎপাদন কমছে

শামছুর রহমান শিশির : তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বসবাসের উপযোগী পরিবেশের অভাব, ফসলে কীটনাষকের অতিমাত্রায় প্রয়োগ, আনারি মধু সংগ্রহকারী দ্বারা মৌচাকে ধোয়া সৃষ্টির জন্য অপরিকল্পতিভাবে অগ্নিসংযোগ করে মৌমাছিকে পুড়িয়ে মারা, খাদ্যের অভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ বহুবিধ কারণে ফসলে পরাগায়নের মুখ্য ভূমিকা পালনকারী মুক্ত মৌমাছির সংখ্যা কালের আবর্তে সময়ের পরিধিতে উদ্বেগজনক হারে ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া মৌমাছির প্রজননও মারাত্মকভাবে বিঘ্ননিত হচ্ছে। ফলে দিন দিন মৌমাছির আনাগোনার হার এতটাই কমছে যে গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন ফলবান বৃক্ষে বর্তমানে আর আগের মতো মুক্ত মৌমাছি মৌচাক বা বাসা বাধছে না। প্রতিকূল আবহাওয়া ও মনুষ্যসৃষ্টি বহুমূখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে মুক্ত মৌমাছির একটি বৃহৎ অংশ হয়ে পড়ছে বাক্সবন্দী। বিশেষ করে নানা সমস্যায় জর্জরিত এসব মৌমাছি তীব্র খাদ্য সংকট আর উপযুক্ত বাসযোগ্য পরিবেশের অভাবে একটি বিশেষ এলাকা কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পূর্বঅঞ্চল এলাকা থেকে মুক্ত মৌমাছি ফুলের অভাবে মধু আহরণ করতে না পারায় চলে যাচ্ছে সুন্দরবনে। মৌমাছির প্রজনন বিঘ্নিত ও সংরক্ষণের অভাবে যে হারে উত্তরাঞ্চলসহ উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পূর্বঅঞ্চল এলাকা থেকে মুক্ত মৌমাছি দক্ষিণ এলাকায় চলে যাচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবন এলাকা ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মুক্ত মৌমাছি ও মৌচাকের দেখা পাওয়াটাই দূরহ হয়ে পড়বে বলে বিজ্ঞমহল মনে করছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে সরাসরি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি নীর্ভর অঞ্চলগুলোতে। এতে এসব অঞ্চলে খাদ্যশষ্য, ফলমুল, সবজিসহ প্রায় সব ধরনের ফসলের উৎপাদন (ধান,গম ব্যতিত) সফল পরাগায়নের অভাবে বহুলাংশে কমে যাবে। এ অবস্থা রোধে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চল এলাকায় মুক্ত মৌমাছি সংরক্ষণে ব্যাপক ভিত্তিতে ফুল গাছ রোপনের কোন বিকল্প নেই বলে কৃষি বিশেষজ্ঞগণ মতামত ব্যক্ত করেছেন।
এ অঞ্চলের মধু সংগ্রহকারী মৌচাষীরা জানিয়েছেন, অতীতে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরসহ ৯টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আম, জাম, কাঠাল, কাঠ, বিভিন্ন বুঁনো ফুলগাছসহ বিভিন্ন ফসলের ফুলের মধুর ওপর ভিত্তি করে প্রচুর মৌমাছির বাস (মৌচাক) ছিল। ওই সময় মুক্ত মৌমাছি বিভিন্ন বৃক্ষে মৌচাক তৈরি করে মধু সংগ্রহ ও প্রজননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি ঘটাতো। মাত্র দুইযুগ আগেও এমন কোন গ্রাম খুঁজে পাওয়া যেতো না যে গ্রামে অন্তত একটি মৌমাছির চাক পরিলক্ষিত হয়নি। বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পূর্বঅঞ্চল এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায়, শুষ্ক প্রতিকূল আবহাওয়া ও বৈরি জলবায়ুর কারণে মৌমাছিদের বসবাস ও বংশবৃদ্ধিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে অপেক্ষাকৃত জলীয় আবহাওয়া বিরাজিত অঞ্চলে দিন দিন চলে যাচ্ছে মৌমাছি। অতীতে আম, জাম, কাঠালসহ বিভিন্ন ফলবান বৃক্ষ পরিলক্ষিত হলেও ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার প্রবল তোড়ে এসব গাছপালা ও বনাঞ্চল কেটে উজাড় করে ফেলার ফলেও মৌচাক আর দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় অনেক অজ্ঞ কৃষকেরা অতিমাত্রায় কীটনাষক ফসলী জমিতে ব্যবহার করছেন। ফসলী জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাষকের ব্যবহারের ফলে মৌমাছি কীটনাষক পানে মারা যাচ্ছে। এছাড়া আনাড়ি মধু সংগ্রহকারীদের ধারনা, ‘মৌচাক থাকলেই মধু পাওয়া যাবে’। তাদের এ ভ্রান্ত ধারনায় মধু সংগ্রহ করতে তারা মশাল জ্বালিয়ে মৌচাকের নিম্নভাগে ধোয়া সৃষ্টি করতে নিয়ে মৌমাছি পুড়িয়ে মেরে ফেলছে। ফলে মৌমাছির বংশবৃদ্ধি মারাত্বকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যার সরাসরি কু-প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতে। এতে কৃষিজ উৎপাদন কমে যাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। যার নীরব মাশুল গুঁণছেন কৃষকেরা।
বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদগণের ভাষ্য,পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে মৌমাছি সুন্দরবনের গেওয়াসহ বিভিন্ন বুঁনো ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহে সুন্দরবনমূখী হয়ে পড়েছে। জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত খাবার আর বসবাসের উপযোগী আবহাওয়ার অভাবে যেসব মৌমাছি সুন্দরবনে গিয়ে নতুন করে মৌচাক বাঁধছে তা আর এ অঞ্চলে পুনরায় ফিরে আসছে না। ফলে সময়ের আবর্তনে কালের পরিধিতে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পূর্বঅঞ্চল এলাকায় মৌমাছির আনাগোনা ও মৌচাকের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। কৃষিপ্রধান দেশে প্রায় সব ধরনের ফসলের উৎপাদনের শতকরা ৩০-৪০ ভাগ মৌমাছির সফল পরাগায়নের ওপর (ধান,গম ব্যাতীত) নীর্ভর করলেও মৌমাছির অভাবে ফসলের ফুলে সফল পরাগায়নের হার উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পেয়ে ফসল উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধির পরিবর্তে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ খায়রুল ইসলাম (অবঃ) এর মতে, ‘ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বসবাসের উপযোগী পরিবেশের অভাব, ফসলে কীটনাষকের অতিমাত্রায় প্রয়োগ, আনারি মধু সংগ্রহকারীদের দ্বারা মৌচাকে অগ্নিসংযোগে মৌমাছিকে পুরিয়ে মারা, খাদ্যের অভাবসহ বহুবিধ কারণে কৃষিপ্রধান দেশের এ অঞ্চলে ফসলের ফুলে সফল পরাগায়নে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা পালনকারী মুক্ত মৌমাছি ও মৌচাকের সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে কমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকেরা কৃষিখাত থেকে ফসলের সর্বোচ্চ ফলন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দিন দিন এ অঞ্চল থেকে যে হারে মুক্ত মৌমাছি অন্যত্র (সুন্দরবন) চলে যাচ্ছে তা এ অঞ্চলের কৃষিখাতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের জন্য রীতিমতো চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । এজন্য এ অঞ্চলে রাস্তার ধারে পরিবেশের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর ইউক্যালিপ্টাস, ইপিলইপিল জাতীয় বৃক্ষ রোপনের পরিবর্তে অবিলম্বে ফলবান বৃক্ষ রোপণ এবং ব্যাপক ভিত্তিতে ফুলচাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। আর এর ব্যাত্যয় ঘটলে এ অঞ্চল থেকে কালক্রমে মুক্ত মৌমাছি, মৌচাক হারিয়ে যাবে এবং কৃষিখাতে এর সরাসরি চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যা জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধ পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে ।’