শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হয়েও অদম্য ইচ্ছা ফাহিম এখন ফ্রিল্যান্সিং দুনিয়ায়

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। এর পর থেকে দুরারোগ্য এক ব্যাধিতে হাত-পায়ের পেশিগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে। আর এখন তো অন্যের সাহায্য ছাড়া নড়াচড়াই করতে পারেন না। মাগুরার সেই ফাহিমুল করিম এখন টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার, পরিবারের ভরসার নাম।

ছোটবেলায় আর দশটা ছেলের মতো স্বাভাবিকই ছিলেন। স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, পুকুরজুড়ে সাঁতরানো আরো কত কী। পড়ালেখার পাশাপাশি দুষ্টুমিতেও সবাইকে ছাড়িয়ে যেতেন। এ জন্য মা-বাবার কাছে নালিশও কম আসেনি। কিন্তু মায়ের বকুনি, বাবার পিটুনি কোনো কিছুই ফাহিমকে আটকে রাখতে পারত না। স্কুল থেকে ফিরে টেবিলে বইগুলো রেখেই দে ছুট। ফাহিমকে আর পায় কে। এভাবেই চলছিল।

তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন ফাহিম। কয়েক দিন পর বার্ষিক পরীক্ষা। তার আগেই হঠাৎ অচেনা এক অসুখ হানা দেয় তাঁর শরীরে। এ-হাসপাতাল থেকে ও-হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে ফাহিমের বাবা একসময় জানতে পারেন জটিল এক অসুখে আক্রান্ত তাঁর ছেলে। ফিকে হয়ে আসে ফাহিমের স্বপ্ন। দিনভর পাড়া মাতিয়ে রাখা ছেলেটাকে পা টেনে টেনে হাঁটতে হয়। শরীরও দুর্বল হতে থাকে। একসময় সঙ্গী হয় বিছানা। ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে ফাহিমের হাত-পায়ের পেশি। এ অবস্থায়ও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু ২০১২ সালে বলতে গেলে অকেজো হয়ে পড়ে পুরো শরীর। হাতের আঙুলগুলো শুধু সচল। মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এই মেধাবী শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার ইতি ঘটে ওই অষ্টমেই।

মাগুরা শহরের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ফাহিম। বাবা রেজাউল করিম একটি বেসরকারি কম্পানির বিপণন বিভাগে কাজ করেন। মা হাজেরা খাতুন গৃহিণী। একমাত্র বোন স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। রেজাউল করিম জানান, ফাহিমের সমস্যা প্রথম ধরা পড়ে ২০০৬ সালে। বাংলাদেশে বেশ কয়েক দফা চিকিৎসার পর ২০০৮ সালে নিয়ে যান কলকাতায়। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তাঁর ছেলে ডুচেনেমাসকিউলার ডিস্ট্রফিতে আক্রান্ত। ধীরে ধীরে পেশি দুর্বল হয়ে যাবে। বংশগত রোগটির কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা জটিল হতে পারে। চিকিৎসকরা ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দেন। পাশাপাশি ফলোআপের জন্য কয়েক মাস পর আবারও যেতে বলেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে আর চিকিৎসা করাতে পারেননি রেজাউল করিম। ২০১২ সাল থেকে একেবারে বিছানায় ফাহিম।

তবে তিনি থেমে থাকেননি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে জগত্খ্যাত হওয়া বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের কথা জানা ছিল তাঁর। হকিংয়ের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মনের শক্তিকে কাজে লাগাতে থাকেন ফাহিম। কম্পিউটার শেখা শুরু করেন। কম্পিউটার চালানো পুরোপুরি আয়ত্তে এলে একসময় নিজেকে সঁপে দেন ফ্রিল্যান্সিং দুনিয়ায়। অদম্য ইচ্ছা ও অধ্যবসায়ের কাছে হার মানে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। ফাহিম এখন ফ্রিল্যান্সিংয়ে আপওয়ার্কের অন্যতম টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার। তাঁর প্রতি ঘণ্টার রেট আট ডলার।

মাগুরা শহরের মোল্যাপাড়ায় ফাহিমদের বাড়ি। একদিন সেখানে গিয়ে দেখা গেল, বিছানায় বসে আছেন। সামনে ল্যাপটপ। শীর্ণ হাতের আঙুল মাউসে রেখে কাজ করছেন। কথায় কথায় ফাহিম জানালেন, জেএসসি পরীক্ষার দুই-তিন দিন আগে থেকে হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থ শরীর নিয়েই পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পরীক্ষার ফলও ভালো হয়েছিল। কিন্তু শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। ফলে ক্লাস নাইনে আর ভর্তি হননি। বাসায় থাকতে থাকতে সময়গুলো বিরক্তিকর ঠেকছিল। একসময় হতাশা এসে ভর করে। শুরুর দিকে হতাশা কাটাতে বাসার পাশের দুটি ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতেন। এভাবে চলে বছরখানেক। প্রাইভেট পড়ানোর টাকা দিয়ে প্রথমে একটি স্মার্টফোন কেনেন। তারপর ফেসবুকের মাধ্যমে একদিন জানতে পারেন ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে আয় করার নানা উপায়। প্রথমে মোবাইল দিয়েই কাজ শেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওভাবে বেশি দূর এগোনো যাচ্ছিল না। দরকার ল্যাপটপের। মায়ের কাঁথা সেলাইয়ের জমানো টাকা ও ব্যাংক লোন নিয়ে ল্যাপটপ কেনেন ফাহিম।

২০১৬ সালের শেষ দিকে শুরু হয় ফাহিমের গ্রাফিকস ডিজাইনার হয়ে ওঠার লড়াই। গুগল থেকে এবং ইউটিউবে ভিডিও দেখে দেখে কাজ শিখতে থাকেন ফাহিম। শুরুর দিকে মাগুরাসহ বিভিন্ন জেলার অভিজ্ঞদের সহায়তা নেন অনলাইনে-অফলাইনে। ২০১৭ সালে প্রথমে আউটসোর্সিংয়ের ওয়েবসাইট অনলাইন ফাইবারে যোগ দেন। প্রথম দিনেই কাজ পান। পাঁচ ডলারের কাজ। কিন্তু ক্লায়েন্ট খুশি হয়ে বোনাস দেন ১০ ডলার। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এখন ফাইবারে লেবেল টু সেলার আর আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন ফাহিম। গত তিন বছরে পাঁচ শতাধিক প্রকল্পে কাজ করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর সব মিলিয়ে আয় ১০ হাজার ডলারের বেশি। করোনার কারণে বর্তমানে অবশ্য কাজ কমে গেছে। তবু দক্ষতার কারণে একবারে বেকার হয়ে পড়েননি। মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার কাজ করছেন। পাশাপাশি বাসায় ও অনলাইনে কাজ শেখাচ্ছেন অনেককে।

হাতের আঙুলগুলো যার ঠিকমতো কাজ করে না, কিভাবে তিনি এত দূর এলেন? ফাহিমকে দেখলে যে কারো মনে জাগবে এমন প্রশ্ন। এ বিষয়ে ফাহিম বলেন, ‘স্টিফেন হকিং আমার মতো ডিজেবল ছিলেন। আমার মতো মানুষদের জন্য তাঁর একটা কথা ছিল যে ফিজিক্যালি ডিজেবল হও; কিন্তু মানসিকভাবে ডিজেবল হয়ো না। কারণ শারীরিক অক্ষমতা ভালো কিছু করা থেকে আটকে রাখতে পারে না। এ কথাটি সব সময় মনে রেখেছি।’

মাগুরাসহ দেশের অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ চায়। ফাহিম জানান, ফ্রিল্যান্সার হতে হলে অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন। অধৈর্যের কারণে অনেক তরুণ কাজ শুরু করেন ঠিকই; কিন্তু টিকে থাকতে পারেন না। ধৈর্য ধরে টিকে থাকলে এটি আত্মনির্ভরতা ও উন্নত কর্মসংস্থানের অনন্য এক উপায়।

তবে দীর্ঘদিন হয়তো এই কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন না। তাই পরিকল্পনা আছে টাকা জমিয়ে কোনো ব্যবসা শুরু করার, যেখানে আরো বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়। বর্তমানে পরিবারের খরচের বড় একটি অংশের জোগান আসে তাঁর আয় থেকে। আগে ভাড়া বাসায় থাকতে হতো ফাহিমের পরিবারকে। এখন ফাহিমের জমানো টাকায় শহরের মোল্যাপাড়ায় কেনা চার শতক জমিতে বাড়ি করে সেখানে উঠেছেন তাঁরা। তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক গত বছর মাগুরায় সরকারি এক অনুষ্ঠানে এসে ফাহিমের বিষয়টি জেনে তাঁকে একটি ল্যাপটপ দিয়েছেন। হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ দিয়েছে এক লাখ টাকার অনুুদান।

মায়ের সাহায্য ছাড়া নড়তে পারেন না ফাহিম। মা হাজেরা খাতুন জানান, রাত জেগে ফাহিম কাজ করে। সেই সঙ্গে তিনি জেগে থাকেন ফাহিমকে সহযোগিতা করার জন্য। নিজের শরীরের কোনো অংশই এতটুকু সরানোর ক্ষমতা নেই। খাওয়াদাওয়া, গোসল থেকে শুরু করে সব কাজেই ফাহিমকে সহযোগিতা করেন তিনি।

ছেলের চিকিৎসা বিষয়ে রেজাউল করিম জানান, ২০০৮ সালে ভারতে ডাক্তার দেখানোর পর বড় পর্যায়ে আর কোনো চিকিৎসা হয়নি ফাহিমের। এত দিন অর্থাভাবে বিষয়টি চিন্তা করতে পারিনি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের বেঙ্গালুরে নেওয়ার ইচ্ছা আছে।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.