শতকোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই ভাই আর ক্যাডার নিয়ে মিরু গড়ে তোলেন সাম্রাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভার প্রায় শতকোটি টাকার কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রথম থেকেই তৎপর ছিলেন মেয়র হালিমুল হক মিরু। এজন্য রীতিমতো তিনি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। যাতে প্রতিদ্বন্দ্বি কেউ তাঁর ‘সাম্রাজ্যে’ প্রবেশ করতে না পারে। তাঁর ভাই আর ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া দেখে অভ্যস্ত এখানকার মানুষ। শুধু তা-ই নয়, মেয়র মিরু, তাঁর ছোট দুই ভাই হাবিবুল হক মিন্টু ও হাসিনুল হক পিন্টু চলাফেরা করতেন ভাড়া করা সশস্ত্র লোকজন নিয়ে। চাউর আছে, পাবনা থেকে ভাড়া করা সর্বহারা দলের সদস্যদের হাতে ছিল তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব। এতদিন ভয়ে যারা মিরুর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করেনি এখন তারা মুখ খুলছে অবলীলায়। এলাকায় বোমাবাজি, গুলিবর্ষণ, লুটপাট, দখল, টেন্ডারবাজি, মারধরসহ তিন ভাইয়ের নানা অপকর্মের তথ্য উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের কথায়। কয়েক দিন আগেও মিরুর যে বাড়ি ছিল সরগরম। এখন যেন তা ভূতের বাড়ি। এদিকে সাংবাদিক শিমুলের মাথায় বিদ্ধ গুলির সঙ্গে মেয়র হালিমুল হক মিরুর শর্টগানের গুলির মিল পাওয়ায় শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ এখন মিরুর বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। পুরো শাহজাদপুর এলাকা ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়ে ছেয়ে ফেলা হয়েছে মেয়র মিরুর ছবির সঙ্গে ফাঁসির দড়ি লাগানো ছবি দিয়ে। সেখানে তাঁকে খুনি আখ্যায়িত করে ফাঁসির দাবি জানানো হয়েছে। বিচার চাওয়া হচ্ছে তাঁর দুই ভাইয়েরও। মেয়র মিরুর ঘনিষ্ঠ এক সহচর জানান, তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল জাসদের রাজনীতি দিয়ে। সেটি ১৯৮০ সালের কথা। ১৯৯২ সালে অল্পসময়ের জন্য বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। তবে দলে যোগ দেওয়ার পরপরই উচ্চাভিলাষী মিরু নতুন চিন্তা শুরু করেন। বিএনপি ছেড়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। দলে যোগ দিয়েই ১৯৯৬ সালে নৌকার বিরুদ্ধে (বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে) ভোট করায় প্রথমবার ও ২০০৪ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দ্বিতীয়বার সংগঠন থেকে বহিষ্কার হন। পরবর্তী সময়ে দলে ফিরে আসেন সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের আশীর্বাদে। এখন পর্যন্ত লতিফের খাস লোক হিসেবে পরিচিত মিরু। এসব কারণেই মিরু জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগান খুব সহজেই।নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহজাদপুরের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, পৌর মেয়র মিরু হলেও পৌরসভা চালাতেন তাঁর ছোট দুই ভাই মিন্টু ও পিন্টু। পৌরসভার বিভিন্ন কক্ষে সশস্ত্র অবস্থায় ছিল তাঁদের বিচরণ। তাঁদের কথার বাইরে গেলেই হুমকি-ধমকি ও লাঞ্ছিত হতে হতো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর মেয়াদে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নগর পরিচালনা অবকাঠামো উন্নতীকরণ প্রকল্পে (আইজিআইআইপি) শাহজাদপুর পৌরসভায় ১৯টি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর নির্বাচনে তিনি হেরে গেলে মেয়র মিরু ফের দরপত্র আহ্বান করেন। সেই দরপত্রে তাঁর ভাইদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাহান ট্রেডার্স কাজ পায়। সেই দরপত্রে পৌর এলাকায় যে রাস্তা তৈরি হয় সেগুলো কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক রাস্তা না করেই প্রলেপ দিয়ে কাজ শেষ করা হয়। অনেক জায়গায় বক্স কালভার্ট করা হলেও সংযোগ রাস্তা করা হয়নি। যদিও ওই কাজের ৬০ শতাংশ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি বিল তোলার প্রক্রিয়াও এগিয়ে গেছে বহুদূর। একই প্রকল্পে দুটি প্যাকেজে আরো ১৬ কোটি টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় ৮ ফেব্রুয়ারি। এই কাজটিও নিজেদের কবজায় নিতে সব পরিকল্পনা করে রেখেছিল মিরু বাহিনী। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে আইজিআইআইপির সব মিলিয়ে শত কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করার আছে শাহজাদপুর পৌরসভাকে ঘিরে।স্থানীয় লোকজন জানায়, ছোট দুই ভাই মেয়র মিরুর কুকর্মে নতুন মাত্রা যোগ করেন। মেয়রের লাইসেন্স করা শটগান ব্যবহার করতেন তাঁরা। সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রও থাকত একাধিক। ঘটনার দিন (২ ফেব্রুয়ারি) উপজেলার মণিরামপুর কালীবাড়ি মোড় থেকে শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যান মেয়রের ভাই পিন্টু। মেয়রের বাড়িতে নিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। ওই সময় সেখানে মেয়রের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা ছিল। তাদের অনেকের বাড়ি পাবনায়। বিজয়ের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল বিগত পৌর নির্বাচনের সময় থেকে। সর্বশেষ বিজয়দের বাড়ির সামনের রাস্তা মেরামত ও সংস্কারকাজ অসমাপ্ত রাখা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ওই রাস্তার কাজটি পেয়েছেন পিন্টু ও মিন্টুর অনুগত ঠিকাদার। তাঁদের ওপরে কেউ কখনো যাতে মাথা উঁচু না করে সে কারণেই এই পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটায়।