মাদকের অন্ধকার থেকে ৫ যুবকের আলোর জীবনে পদার্পণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, শাহজাদপুর : ‘মাদক যখন সেবন করেছি, তখন মানুষ খুন করা ছাড়া এমন কোন অপরাধ নাই যা করতো নূন্যতম দ্বিধাবোধ করেছি। সঙ্গ দোষে, শখের বশে ক্রমেই মাদকে জড়িয়ে পড়ি। তখন দিনে রাতে সর্বক্ষণে কেবল মাদকের অর্থের যোগান ও সেবনের কথাই ভেবেছি। মাদকের ভয়াল গ্রাসে ও মোহে আবদ্ধ হয়ে বুদ্ধি-বিবেক, শারীরীক ও মানষিক সক্ষমতা সব হারিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ সমাজের নিকট ক্রমেই নিন্দিত-ঘৃণিত হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। মাদক সেবনের অর্থ যোগাতে নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ি। এক পর্যায়ে মাদক বিক্রেতাদের সহযোগী হিসেবে ও পরবর্তীতে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ি। পিতার টাকা-পয়সা, জমি-জমা, বসতভিটা, সহায়-সম্বল সব হারিয়ে যখন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলাম ও প্রহর গুণছিলাম ঠিক সেই সময়ে ডিটিসি’র নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান শাহীন ভাইয়ের সানিধ্য লাভ আমাদের জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার আলো জ্বালে। নতুন করে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ে শাহজাদপুর উপজেলার বিসিক বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে (ডিটিসি) ভর্তি হই। দেখতে দেখতে ৫ বন্ধুর মাদকমুক্ত ১ বছর পেরিয়ে গেলো। এখন উপলব্ধি করতে পারছি, মাদকের মোহে জীবনের কী সর্বনাষই না করেছি ! আগের মতো এখন আর কেউ আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে না। সবাই ভালোবাসছে। আত্মীয়-স্বজনেরা পাশে দাঁড়িয়ে নতুনভাবে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ যে কতটা মধুর, কতটা তৃপ্তিময় ও উপভোগ্য তা আমাদের চেয়ে কে আর ভালো বলতে পারেন ?’ গতকাল সোমবার রাতে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার একমাত্র সরকারি তত্বাবধানে পরিচালিত মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্র ডিটিসি কার্যালয়ে ৫ মাদকাসক্ত যুবকের মাদকমুক্ত ১ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন ১ বছর ধরে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী ৫ যুবক আবু সাঈদ, জুয়েল সরকার, জাকারিয়া আজাদ, সাইদুল ইসলাম ও সবুজ মিয়া। ডিটিসি’র নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান শাহীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাপ্তাহিক প্রান্তিক সংবাদ’র সম্পাদক মুস্তাক আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, প্রগতি সংঘের সভাপতি ও তাঁতবস্ত্র রফতানীকারক এনামুল হাসান মোজমাল, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন আসলাম, কেন্দ্রীয় তাঁতী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল আলীম মিলন, স্থানীয় যুবলীগ নেতা আশিকুল হক দিনার, ডিটিসি’র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মীর জাহাঙ্গীর কবির, আবুল কালাম তালুকদার প্রমূখ। বক্তারা বলেন, ‘মাদকাসক্তদের ঘৃণার দৃষ্টিতে না দেখে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়ে ও যথার্থ চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে তাদের সুস্থ্য করে তোলা অতীব জরুরী। এইডস থেকেও মাদকের ভয়াবহতা সুদুরপ্রসারী। মাদকাসক্তদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা না হলে পরিবার, সমাজ ও দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এজন্য যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এসব দিক বিবেচনায় ডিটিসি সেই মহতী কাজটি করে চলেছে। তাদের ভবিষ্যতেও মাদকবিরোধী সকল কর্মকান্ডে সার্বিক সহাযোগীতা প্রদান করা হবে।’ পরে ডিটিসি কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত শাহজাদপুরে বিভিন্ন মাদকবিরোধী কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকায় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মুস্তাক আহমেদ ও বিশেষ অতিথি এনামুল হাসান মোজমাল এবং সাজ্জাদ হোসেন আসলামসহ মাদকের অন্ধকার থেকে আলোর জীবনে প্রবেশ করা ৫ যুবকের হাতে ডিটিসি’র পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান শাহীনসহ অতিথিবৃন্দ বিশেষ সম্মাননা পদক তুলে দেন। উক্ত অনুষ্ঠানে ডিটিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসারত মাদকাসক্তরাসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।