বেপরোয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসদের হাতে গত ১০ বছরে রোগী ও তার স্বজনদের লাঞ্ছিত হওয়ার শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার স্ত্রীর মরদেহ ওয়ার্ডে রেখে মারধর করা হয়েছে এক মুক্তিযোদ্ধাকে। এরপর তার ছেলেকে তুলে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে। এটিকে চরম অমানবিক বলছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। আর এ নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী গত বুধবার স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, ওয়ার্ডে কোনো সিনিয়র চিকিৎসক ছিলেন না। ইন্টার্নদের ডেকেও পাননি। কয়েক দফায় ইন্টার্নদের ডাকাডাকি করা হয়। কাউকে পাওয়া যায়নি। ওয়ার্ডে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তার স্ত্রী। এরপর মরদেহ হাসপাতালের ওয়ার্ডে রেখে তাকে ও তার ছেলেকে মারধর করে ইন্টার্নরা। গত বুধবারের ঘটনায় আবারও আলোচনায় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ইন্টার্ন চিকিৎসদের এমন আচরণকে চরম অমানবিক বলছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সুশাসন বিশ্লেষক সুব্রত পাল জানান, যেভাবে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বার বার এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাতে আগামীতে অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি আহমদ শফি উদ্দিন বলেন, গত ১০ বছর ধরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের রুদ্রমূর্তি দেখছি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনার অবসান হওয়া দরকার। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ বছর ধরে চলছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য। কথায় কথায় রোগী ও স্বজনদের মারধর, হুমকি আর চলে কর্মবিরতি। প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না গণমাধ্যমকর্মীদের। রীতিমতো হাসপাতালে ত্রাসের রাজত্ব ইন্টার্নদের।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাকে আটকে মারধরের ঘটনা তদন্তে কমিটি করেছে কর্তৃপক্ষ। যদিও সেই কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর মৃত্যু এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তানের ওপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে।

গতকাল সকালে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে মানববন্ধনের আয়োজন করে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের রাজশাহী জেলা ও মহানগর ইউনিট কমান্ড। মানববন্ধনে মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর মৃত্যু এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তানের ওপর হামলার ঘটনাটি ঘটিয়েছেন ইন্টার্ন নামের কিছু চিকিৎসক। এ হামলার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আর বিচার না হলে মুক্তিযোদ্ধারা শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করবেন। আগুন জ¦লবে পুরো রাজশাহীতে।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মহানগর শাখার সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ডা. আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১ রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান উজ্জ্বলের সঞ্চালনায় মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যু এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তানের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। বক্তারা বলেন, রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনা তদন্তে যে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে এটি নিরপেক্ষ না। তদন্ত কমিটির সদস্যরা সবাই চিকিৎসক।

এ কারণে তারা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের রক্ষা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। অচিরেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা না হলে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন। যেসব ইন্টার্ন চিকিৎসকরা হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আর এটি না হলে আমরাই তাদের বিচার করব।

মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, ভালো চিকিৎসক হওয়ার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। কিন্তু চিকিৎসকরা চিকিৎসাসেবা দেন না। শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই নন, দেশের সাধারণ মানুষও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। কিছু চিকিৎসককে মনে হয়, এরা মাফিয়া গ্যাংয়ের সদস্য। আর হাসপাতালের পরিচালক মাফিয়া সর্দার। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তার সহযোগী।

তারা বলেন, রামেক হাসপাতালে বর্তমানে দুর্নীতি চরমে পৌঁছেছে। আর এ দুর্নীতি আড়াল করতেই হাসপাতালে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেন না পরিচালক। আমরা অবিলম্বে রামেক হাসপাতালে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চাই। হাসপাতালের দুর্নীতি সাংবাদিকরা প্রকাশ করেন। জাতি জানতে চায়, চিকিৎসক নামধারী স্বাস্থ্য প্রশাসকরা দেশের অর্থ কীভাবে লুট করছে।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- মুক্তিযুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার শফিকুর রহমান রাজা, কবিকুঞ্জের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক, মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান, রবিউল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম, হাকিম আতাউর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর মোর্শেদ রঞ্জু, মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন মোল্লা, নাজিম উদ্দিন প্রমুখ।

পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার জন্য সোমবার বেলা ১১টায় রাজশাহী মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলেও মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাকে মারধরের বিচার নিশ্চিত করেই তারা ঘরে ফিরবেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

তথ্য সুত্রঃ বিডি প্রতিদিন