বিনোদন

বিস্ময়ের অপর নাম মহানায়ক উত্তম কুমার

বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী অভিনেতা মহানায়ক উত্তম কুমার। সদা মায়াময় হাসি এবং রোমান্টিক ও প্রাণবন্ত অভিনয়ের এই জাদুকর বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ‘মহানায়ক’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি একাধারে ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক। চলচ্চিত্রে অভিনয় ছাড়াও উত্তম কুমার সফলভাবে মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন।

আজ ২৪ জুলাই মহানায়ক উত্তম কুমারের ৪০তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৮০ সালের এইদিনে শুটিংরত অবস্থায় হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। অগণিত বাঙালির মনে স্বপ্নের নায়ক হয়ে চির উজ্জ্বল হয়ে আছেন বিস্ময়কর এই অভিনয় প্রতিভা।

১৯২৬ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং চপলা দেবীর ছোট্ট সংসারে জন্ম নেয় অরুণ। সেই অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ই পরবর্তীতে বাংলার সিনেপর্দা কাঁপিয়ে হয়ে ওঠেন মহানায়ক উত্তম কুমার। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৪২ সালে কলকাতার সাউথ সাবারবান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর গোয়েন্কা কলেজে ভর্তি হন তিনি। সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে এসে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা পেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। সংসারে আর্থিক অনটনের জন্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করেই তাকে ছুটতে হয় চাকরির সন্ধানে।

কলকাতা পোর্টে মাত্র ২৭৫ টাকা মাইনাতে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই যাত্রা-থিয়েটারে তার ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। ১৯৩৬ সালে চক্রবেড়িয়া স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গয়াসুরের ভূমিকায় অভিনয় করে রীতিমত হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ছোট্ট অরুণ। সেই থেকে রূপালী পর্দায় কাজ করার স্বপ্ন -মনে লালন করতে থাকেন তিনি। অচিরেই মিলে গেল সেই সুযোগটি। ১৯৪৭ সালে তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায় ভোলানাথ আঢ্যের ‘মায়াডোর’ নামক হিন্দি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। প্রথম দিকে দৈনিক পাঁচ সিকি পারিশ্রমিকে পাঁচদিন কাজ করেন। তবে উত্তম কুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল ‘দৃষ্টিদান’।

১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে নায়কের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এরপর একে একে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেও সাফল্য না পেয়ে সিনেমাপাড়ায় তার নাম বনে যায় ফ্লপমাস্টার। কে জানতো এই ফ্লপমাস্টারই হয়ে উঠবেন বাংলার মহানায়ক। তখন সিনেমার রোজগারে সংসার চালানো সম্ভব হয়ে উঠছিলো না। তাই অভিনয়ের পাশাপাশি চাকরিও চালিয়ে যান। ১৯৪৮ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ভালোবেসে বিয়ে করেন গৌরি গাঙ্গুলিকে।

নায়ক চরিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন ১৯৪৯-এ ‘কামনা’ ছবিতে উত্তম চট্টোপাধ্যায় নামে এবং ১৯৫১ সালে উত্তম কুমার নামে অভিনয় শুরু করেন ‘সহযাত্রী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ঠিক ঐ বছরই জন্ম নেয় তার একমাত্র পুত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায়। জনপ্রিয়তার খাতিরে পাহাড়ি স্যান্নাল তার নাম বদলে রাখেন উত্তম কুমার। সব ছেড়ে সিনেমায় মন দেবেন বলে মনস্থির করেন উত্তম। অবশেষে ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ ছবিতে কাজ করে অভাবনীয় সাফল্য পান উত্তম কুমার। সেই সাথে বাংলা চলচ্চিত্র পায় অভিনয় জগতের এক নতুন নক্ষত্র। “বসু পরিবার” ছিল তার প্রথম হিট ছবি। এই ছবির সাফল্যের পর চাকরি ছেড়ে তখন পুরোপুরি অভিনয়ে নেমে পড়েন উত্তম। সময়ের সাথে সাথে ঝলসে ওঠেন উত্তম কুমার।

তার পরের বছর ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে-চুয়াত্তর’ মুক্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন ইতিহাস রচনা শুরু হয়। কেননা, এ ছবির মাধ্যমেই বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল উত্তম-সুচিত্রা জুটির সূত্রপাত হয়। শুরু হয় কিংবদন্তী এই জুটির একসাথে পথচলা; সাথে রচিত হতে থাকে উত্তম কুমার নায়ক থেকে মহানায়ক হওয়ার অনন্য অধ্যায়। ১৯৫৪-এ জনপ্রিয়তার সব রেকর্ড ভেঙে দিল উত্তম-সুচিত্রার ‘অগ্নিপরীক্ষা’। ষাটের দশক পুরোপুরিভাবে অসাধারণ প্রশংসিত বেশ কিছু ছবি উপহার দিয়ে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে মাতিয়েছেন উত্তম-সুচিত্রা। যার মধ্যে ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরী’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘বিপাশা’, ‘জীবন তৃষ্ণা’ এবং ‘সাগরিকা’সহ অনেক ছবিতে তাদের জীবন্ত-প্রাণবন্ত অভিনয়গুণে ‘রোমান্টিক’ জুটির শীর্ষস্থানে পৌঁছে যান উত্তম-সুচিত্রা। যা আজও বাঙালির কাছে একইভাবে জনপ্রিয়।

উত্তম কুমার বহু সফল বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। তার অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে- ছোটিসি মুলাকাত, অমানুষ এবং আনন্দ আশ্রম অন্যতম। রোমান্টিক নায়ক ছাড়াও বিভিন্ন চরিত্রে তার সুঅভিনয় ছিল বিস্ময়কর। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় দু’টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রথমটির নাম ‘নায়ক’ এবং দ্বিতীয়টি ‘চিড়িয়াখানা’। ‘চিড়িয়াখানা’ চলচ্চিত্রে তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় অভিনয় করেন।

১৯৫৬ সালে ‘নবজন্ম’ ছবিতে নিজের কণ্ঠে প্রথম গান গেয়ে নতুন চমক সৃষ্টি করেন উত্তম। ১৯৫৭ সালে অজয় কর পরিচালিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে অভিনয় করে সমগ্র ভারতজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন। সে বছর ‘হারানো সুর’ পেয়েছিল রাষ্ট্রপতির সার্টিফিকেট অফ মেরিট। এরপর ১৯৫৭-এ বাংলা ভাষার প্রথম সম্পূর্ণ রঙিন ছবি ‘পথে হলো দেরী’তে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে করেন আরেকটি রেকর্ড।

১৯৬০ সালের দিকে সাফল্য পায় উত্তম- সুপ্রিয়ার ‘শুন বনোরাণী’ সিনেমা। সুপ্রিয়া দেবী তখন বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির ধর্মপত্নী। বিয়ের পর সুপ্রিয়াকে বাধ্য করা হয় অভিনয় ছাড়ার জন্য। তিনি বেশ কিছুকাল পর্দার আড়ালেই কাটান। স্বামীর সাথে ডিভোর্সের পর তিনি আবার রূপালী পর্দায় ফিরে আসেন। তখন থেকে উত্তম কুমারের সাথে বন্ধুত্ব এবং ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। দুজনের ব্যক্তিজীবনের শূন্যতা থেকে জন্ম নেয় প্রেম।

১৯৬৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পৈতৃক বাসভবন ছেড়ে উত্তম কুমার চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা রোডের ফ্ল্যাটে। জীবনের বাকি সময় তিনি সুপ্রিয়া দেবীর সাথেই কাটান। গৌরি দেবীর সাথে আইনত ডিভোর্স না হওয়ায় রেজিস্ট্রি করতে পারেননি সুপ্রিয়া দেবীকে। কিন্তু সুপ্রিয়া দেবীর ভাষ্যমতে, ১৯৬২ সালের ২রা ডিসেম্বর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় বিয়ে হয় তাদের।

১৯৬৭ সালে ‘এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার (তখন এই পুরস্কারের নাম ছিল ‘ভরত’) পেয়েছিলেন উত্তম কুমার। এছাড়া তিনি নিউইয়র্ক, বার্লিন চলচ্চিত্র প্রভৃতি সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসবে অতিথি হওয়ার সম্মানও অর্জন করেছিলেন। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্মৃকৃতিসরূপ তিনি পেয়েছিলেন বহু পুরস্কার সম্মান না। পরবর্তীতে উত্তম কুমারের শ্রদ্ধার্ঘ্যে কলকাতা মেট্রো টালিগঞ্জ অঞ্চলের স্টেশনটির নামকরণ করা হয় ‘মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন’।

উত্তম কুমার পরিচালক হিসেবেও ছিলেন সফল। ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ (১৯৮১), ‘বনপলাশীর পদাবলী’ (১৯৭৩) এবং ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬) ছবির সাফল্য তারই প্রমাণ। কর্মজীবনে সফল এই অভিনেতার ব্যক্তিজীবন অতোটা কোমল ছিল না। তার খ্যাতির সাথে সাথে লোকমুখে গুঞ্জন এবং রটনাও বাড়তে থাকে উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়ে। এমনি পরিস্থিতিতে স্ত্রী গৌরি দেবী তার অভিনয়ে আপত্তি না করলেও উত্তম-সুচিত্রার মেলামেশায় আপত্তি জানান, যার ফলে বাড়তে থাকে তাদের দূরত্ব। একটা সময় অভিনয়ও ছাড়তে বলেন গৌরি। কিন্তু উত্তমের পক্ষে সম্ভব হয়নি রক্তে মেশা অভিনয়ের নেশা ছাড়া।

মহানায়ক হয়ে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই মৃত্যুবরণ করেন বাঙালির এই সিনেনক্ষত্র। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তার অভিনীত ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ সিনেমার শুটিংরত অবস্থায় হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন উত্তম কুমার। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টায় কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিকে ভুবনভোলানো হাসিমাখা এই মহান অভিনেতা সবাইকে কাঁদিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার অনবদ্য অভিনয় দেখলে কখনো মনেই হয় না- তিনি আমাদের মাঝে নেই। মাত্র ৫৪ বছরের ক্ষণজন্মা কিংবদন্তী এই মহানায়ক মাত্র ৩২ বছরের অভিণয় কেরিয়ারে আমাদের যা দিয়ে গেছেন তা অতুলনীয়। সৃষ্টিশীল মানুষ চলে গেলেও ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকেন। উত্তম কুমার যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, সেটি বাঙালির অন্তর জুড়ে অমলিন থাকবে যুগ থেকে যুগান্তর।

একই বিভাগের সংবাদ

Back to top button
x
Close
Close
%d bloggers like this: