উপ-সম্পাদকীয়

বিমূর্তরীতি: নাট্যচর্চার জগতে অশনি সংকেত

সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, ইস্কাইলাস, মার্লো, শেক্সপিয়ার, গ্যাটে, ইবসেন, চেকভ, বার্ণার্ড শ, পিসকাটর, ব্রেশট, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সবাই বলেছেন নাট্য মঞ্চায়নের একটি উদ্দেশ্য থাকতে হবে। কিন্তু কিছু ব্যক্তিরা বলতে চান নাটক মানে শিল্পসাধনা। শিল্পসাধনা ছাড়া ভিন্ন লক্ষ্য থাকার দরকার নেই। নাট্যকার গার্সিয়া লোরকা সবকিছু দেখে শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারার নাট্যচিন্তা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলো নাট্যব্যক্তিত্বদের নিজেকে হাজির করবার ও দম্ভ প্রকাশ করবার জায়গা। দর্শকদের আনন্দদানের জন্য সেখানে কিছুই ছিল না। নিরীক্ষার নামে নাট্য প্রযোজনা একপর্যায়ে এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল শুধুই মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ এবং দর্শকদের ভুলে গিয়ে শিল্পীরা শুধু নিজেদের মধ্যে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে দুর্বোধ্য কথা বলতেন। নাট্যব্যক্তিত্বরা ধরে নেন তাঁরা যা বলবেন যা কিছু করবেন বা দেখাবেন দর্শক যেন তাই দেখতে বাধ্য থাকবে। রূপকধর্মী, নাটকীয় ভঙ্গি, প্রকাশবাদ, পরাবাস্তববাদ, ভবিষ্যতবাদ প্রভৃতি ভঙ্গি নাট্যকর্মীদের ক্রমশ অন্তর্মুখী করে তোলে। স্বভাবতই দর্শক এ ধরনের নাট্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো।

বিশ শতকের নাট্যপ্রচেষ্টার বিভিন্ন পর্ব সিম্বলিজম বা রূপকভঙ্গি, থিয়েট্রিক্যালিজম বা নাটকীয় ভঙ্গি, এক্সপ্রেসনিজম বা অভিব্যক্তিবাদ ও সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সময়ে, বিশের দশক থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের আপাতসুস্থ দেহে অবক্ষয়ের চিহ্ন দেখা গিয়েছিল। টাকা ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অসুস্থতা, উদার মানবতাবাদের অপমৃত্যু, বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ক্ষতিকর প্রভাব কিছু চিন্তাবিদ বা নাট্যকারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। কিন্তু তাঁরা সমাজের এইসব ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতে ব্যর্থ হলেন। নাটকে শুধু তাঁদের ক্ষোভ ধরা পড়লো। সেখান থেকেই নাট্যকারদের পুরানো ধ্যান-ধারণা বা বিশ্বাসের জগতে ভাঙন দেখা দেয়, ভাঙন থেকে বিভ্রান্তি; সেই বিভ্রান্তি থেকেই জন্ম নিলো স্বপ্নের জগতে পলায়নবাদিতা, বিমূর্ত অবাস্তবতার দরজায় প্রবেশ। কিছু কিছু শিল্প-সাহিত্য বা নাটক হয়ে উঠলো শিল্পীর বিচ্ছিন্নতাজনিত নিঃসঙ্গতার একান্ত প্রকাশ। সমাজের বৃহত্তর মানুষের সাথে যোগাযোগের যে দায়বদ্ধতা এতোদিন শিল্পের ছিল, সেটা হয়ে গেল তখন অপ্রাসঙ্গিক। বিমূর্তবাদীরা সমাজ-রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমশই তাঁরা অবাস্তব বা বাস্তব-বিপরীত সমাজ সম্পর্কহীন মানসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বিশ শতকের শুরুতে রূপকধর্মী, নাটকীয় ভঙ্গি, প্রকাশবাদ, পরাবাস্তববাদ, ভবিষ্যতবাদ, ডাডাইজম; এই যে বিভিন্ন ধারা দেখতে পাওয়া যায় এর সমর্থকরা সকলেই শেষ পর্যন্ত শিল্পের জন্য শিল্প তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং তার পক্ষে প্রচার চালাতে থাকেন নানারকম নিরীক্ষার নামে। ভবিষ্যতবাদীরা যাবতীয় পুরানো নাট্যরীতি ধ্বংস করে যুক্তিবিহীন, ঐতিহ্যহীন, নান্দনিকতাবিহীন যে নাট্যরীতি নির্মাণের কথা বলেছেন তার লক্ষ্য হবে দর্শকদের উত্তেজিত করা, দর্শকদের স্নায়ুকে নির্মমভাবে আঘাত করা। নাট্যশালাকে একটি ব্যায়ামাগারে পরিণত করা। গতি ও যান্ত্রিক কলাকৌশলে যে নাট্যধারা গড়ে উঠবে তার কোনো নির্দিষ্ট রূপ থাকবে না, অথবা হবে বহু রকমের সমন্বিত রূপ। ভবিষ্যতবাদীদের পাশাপাশি দেখা মিললো ডাডাইস্টদের। রাজনৈতিক নাট্যচিন্তার পথিকৃত পিসকাটর নিজেও প্রথম এই ডাডাইস্টদের সাথে ছিলেন। সবকিছুতেই অবিশ্বাস ছিল ডাডাইজমের দর্শন। ডাডাইস্টরা নিজেদের আদর্শ সম্পর্কে বলেছেন যে, ডাডা হচ্ছে যুক্তিকে বিলুপ্ত করা, স্মৃতিকে বিলুপ্ত করা, ভবিষ্যৎকে বিলুপ্ত করার জন্য। ডাডাইস্ট নাটকে ছিল না কোনো যুক্তিবহ আখ্যান, ছিল উদ্ভট, অর্থহীন ও অবোধ্য সংলাপ। মানুষের আত্মানুসন্ধানে খুবই নেতিবাচক পথ ধরে অগ্রসর হয়েছিল ভবিষ্যতবাদী ও ডাডাইস্টদের নাটকগুলো। পিসকাটর পরবর্তীকালে লিখেছেন, এদের নাটকগুলো ছিল ভীষণভাবে প্রতিক্রিয়াশীল।

বিমূর্ত যে নাট্যধারা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে ঝোঁকের সূত্রপাত, সে-ধারার নাটক নির্মাণের বিপুল জোয়ার দেখা যায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই শোনা যায় অস্তিত্ববাদী নাটক, ক্রুদ্ধ নাটক, যন্ত্রণার নাটক এবং অ্যাবসার্ড বা উদ্ভট বা কিমিতিবাদী নাটকের নতুন নতুন নাম। বর্তমান কাল পর্যন্ত তার বিস্তার। কিমিতিবাদ মূলত শিল্পীর বিচ্ছিন্নতাজনিত নিঃসঙ্গতার একান্ত ব্যক্তিগত প্রকাশ। সমাজের বৃহত্তর মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগের যে দায়বদ্ধতা এতোদিন শিল্পের ছিল, এখন সেটি অপ্রাসঙ্গিক। শিল্পী আর সমাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান না।

বিমূর্ত, বেখাপ্পা বা এই অসম্ভব নাটকটি আসলে কী? ইয়োনেস্কো যিনি এই নাট্যধারার পথিকৃতদের একজন, তিনি নিজে এই বেখাপ্পা বা অসম্ভব নাটকের একটি সংজ্ঞা দিতে চেষ্টা করেছেন। সে সংজ্ঞা অনুযায়ী, এঁরা প্রত্যেকেই নাটকের জগতে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণ দুটি ক্ষেত্রেই যাঁরা কোনো যৌক্তিকতার ধার ধারেন না। সেই বিশ্বাস থেকে বেখাপ্পা নাটকের দর্শন শূন্যতার দর্শন, অবক্ষয়ের দর্শন। উদ্দেশ্যহীনতাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার লিখছেন, ‘আমি কোনো দর্শকের কথা মনে রেখে নাটক লিখি না। আমি শুধু লিখি নিজের তাগিদে।…যদি কেউ আকস্মিকভাবে সেই নাটকে অংশগ্রহণ করে সেটা নেহাতই দুর্ঘটনা।’ নাটক এঁদের হাতে উদ্দেশ্যহীন অবাস্তবতায় পরিণত হলো।

দুটো বিশ্বযুদ্ধকে এঁরা দেখেছেন মৃত্যুর ইতিহাস হিসাবে। বিশ্বযুদ্ধগুলো শুধু মৃত্যুর ইতিহাসই ছিল না, সেটা ছিল মানুষের বেঁচে থাকারও ইতিহাস। কোটিকোটি মানুষের বাঁচার উদ্যমকে না দেখে তাঁরা শুধু তার মধ্যে মৃত্যু আর হতাশা খুঁজেছেন। বিশ্বের কোটিকোটি মানুষের মুক্তি সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। সমাজ বিজ্ঞানকে তাঁরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। বিমূর্ত রীতির নাট্যকাররা তাই মানুষের যে চিত্র এঁকেছেন সেখানে মানুষ খুব ক্ষুদ্র জীব, সর্বদা অনিশ্চিতের মধ্যে বিরাজমান। এডওয়ার্ড এলবীর “চিড়িয়াখানার গল্প” নাটকে দেখা যায় নায়ক মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে অবশেষে আত্মহননের বাসনায় উদ্বেল হয়। স্যামুয়েল বেকেট তাঁর “গডোর প্রতীক্ষায়” নাটকে দেখান, মানুষের জীবনে সত্যিকার কখনো কিছু ঘটে না, মানুষ যার জন্য অপেক্ষা করে সে আসে না। শুধুমাত্র এভাবে হতাশার কথাই ব্যক্ত করেছেন তাঁরা, ইতিবাচক দিকে দৃষ্টি ফেরাননি। ইতিবাচকভাবে মানুষ যে শ্রম দিয়ে, সংগ্রাম করে বিশ্বকে সচল রেখেছে; এই সত্য যেন তাঁদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। তাঁরা দেখতে পান না সে মানুষকে, যে মানুষ আপন ভাগ্যকে শ্রমের হাতে নির্মাণ করে চলেছে। স্যামুয়েল বেকেটের চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নাটক কিংবা মানবিক নাটক বলতে চায় মানুষের সুখ, স্বাধীনতা, সৃজনী প্রতিভা দিনে দিনে বিকশিত হচ্ছে। জীবন সেখানে অর্থহীন নয়।

মানুষ তার মেধা কর্ম শ্রম ও চিন্তার দ্বারাই গুহামানব থেকে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে, তথাপি বিমূর্ত ধারার নাট্যকারদের কাছে বিশ্ব এক সীমাহীন শূন্যতার মুখোমুখি দণ্ডায়মান। জর্জ টমসন মনে করেন, নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম সমাজের বিকাশকে না বোঝার ব্যর্থতা থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিবাদীরা এই নাট্যধারাকে সমর্থন করতে এগিয়ে এসেছিল এই লক্ষ্য থেকে যে, যদি নাট্যকাররা সমাজের সব ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন তাহলে সেটা পুঁজিবাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিণাম বয়ে আনবে। কারণ নাট্যকাররা ধনীকতন্ত্রের চরিত্র এবং চেহারা নাটকে প্রকাশ করতে থাকলে সমাজ বিপ্লব ঘটে যাবে। ফলে সমাজ বিপ্লবকে ঠেকাতে কিমিকিবাদী নাটককে তারা উৎসাহ জোগালেন, টাকা সরবরাহ করলেন। কিমিতিবাদীরা নাটকের নামে উদ্ভট সব বিষয়ের আমদানি করলেন, যার মধ্যে থাকলো যৌন সম্পর্ক নিয়ে বাড়াবাড়ি। কিমিতিবাদী নাটকের নামে এলো ভঙ্গি নিয়ে নানারকম চমক, বিশৃঙ্খলা, মঞ্চে দাপাদাপি।

যখন বিমূর্ত নাট্যধারার উদ্ভব ঘটে তখন সেটা ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত একটি প্রবণতা। যাঁরা সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারেননি, তাঁরাই হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছিলেন। বিমূর্ত ধারার উদ্ভব সেখান থেকেই। পুঁজিবাদীরা এই নাট্যধারাকে তাঁদের শ্রেণীস্বার্থে ব্যবহার করার কথা ভাবলেন। বিমূর্তবাদের উদ্ভট নাট্যরীতিকে যুক্তিবাদী ও রাজনৈতিক নাট্যধারার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইলেন। বিমূর্তধারা টাকা ও প্রচার দুটোই পেলো পুঁজিবাদী পৃষ্ঠপোষকতার বদৌলতে। সেজন্য কিছুদিন তারা শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারলো নাট্যাঙ্গনে, যদিও তাদের পেছনে বৃহৎ দর্শক গোষ্ঠীর কোনো সমর্থন ছিল না। সাধারণ দর্শকরা প্রথম থেকেই ঐসব দুর্বোধ্য নাটক বর্জন করলো। দর্শকদের ধরে রাখতে তাই বিমূর্ত নাটককে নিত্য নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হলো। সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিণামে বিমূর্ত নাট্যশালা যৌনতা-নগ্নতা আর মাদকদ্রব্যের আখড়ায় পরিণত হলো।

নাট্য ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের একটি গ্রন্থ থেকে বিমূর্ত নাট্যরীতির একটি বর্ণনা এখানে তুলে ধরা যাক। নাটকটি ফরাসী দেশের জ্যঁ-জাক লেবেল পরিচালিত। নাটকের ঘটনা হচ্ছে, দুটি নগ্ন নারী দেয়ালে ছবি আঁকছে আর পরিচালক লেবেল নিজে মেয়ে দুটির নিতম্বে ছবি আঁকছেন। টি-ডি-আর পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে লেবেল এটাকে বললেন, নতুন নাট্যশালার আবির্ভাব। ভিন্ন একটি নাটকের বর্ণনা পাওয়া যায় এই গ্রন্থেই। দর্শকদের বলা হলো, ঘণ্টা বাজলেই সবাই উঠে দাঁড়াবেন, সব কাপড়-জামা খুলে ফেলবেন, উলঙ্গ হয়ে নাচবেন, তারপর পাশের ঘরে যাবেন। দর্শকরা তাই করলেন। পাশের ঘরে গিয়ে দেখলেন পর্দায় একটি নগ্ন নারীর চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে আর কক্ষের মধ্যস্থলে সেই নারীই সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় নৃত্য করছে।

কিমিতিবাদীদের বিভিন্ন নাটকে এভাবেই যু‌ক্তিবাদ‌কে, মানবিকতাকে বাদ দিয়ে যৌনতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিমিতিবাদী নাট্যকারদের বিভিন্ন নাটকে তাঁর উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিমিতিবাদী নাট্যকার ইয়োনেস্কো তাঁর শিক্ষাদান নাটকে দেখাচ্ছেন যে, নায়ক তার ছাত্রীকে অসংলগ্নভাবে বিবিধ বিষয় পড়াতে পড়াতে তাকে উদভ্রান্ত করে তুলে সঙ্গমের পথে নিয়ে যায়, তাকে ভোগ করে এবং অতঃপর তাকে হত্যা করে পরবর্তী ছাত্রীর জন্য মঞ্চে অপেক্ষা করে। পিকাসোর “আঙুলবদ্ধ বাসনা” নাটকে দেখানো হয় নারীর স্বমৈথুন-ক্রিয়া। নাটকের দুটো চরিত্রের নাম, বুড়ো আঙুলের মাথা এবং হোঁৎকা উদ্বেগ। যবনিকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে তরুণী অভিনেত্রী এসে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বসে এবং পুরো পাঁচ মিনিট ধরে কোনো একান্ত গোপনীয় শরীরধর্ম পালন করে। উৎপল দত্তের মতে, এই হচ্ছে তাদের নাটক, যাদের কাছে বেশ্যালয় আর নাট্যশালায় কোনো পার্থক্য নেই। নাটকের নামে এভাবেই পুঁজিবাদী দুনিয়ায় চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সুস্থ মানুষের দেখা মেলে না এঁদের নাটকে। মানুষকে সুস্থভাবে চিন্তা করতে দিতে চায় না এরা। ইয়োনেস্কোদের উদ্দেশ্যে ছিলো সমাজতান্ত্রিক দেশের বলিষ্ঠ নাট্য আন্দোলনের পথ রোধ করা, যাতে পশ্চিম ইউরোপে ব্রেশটদের রাজনৈতিক নাটকের প্রভাব ছড়িয়ে না পড়ে। বিকৃত যৌনতা প্রদর্শন করে রাজনৈতিক নাটকের বিরুদ্ধে নিজেদের নাটকগুলিকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন। মনে করা হয়েছিল, যুব সমাজকে এভাবেই যৌনতায় মাতিয়ে রাজনীতি থেকে বিপথগামী করা যাবে। বাস্তবে ব্যাপারটা তেমন সাফল্য পায়নি। কথা হলো, নাটক আর ‘সেক্সসোপ’ তো একরকম হতে পারে না। নাটক নিশ্চয় ভিন্ন কিছু।

কিমিতি-জ্যামিতি-দুর্মতি প্রভৃতি নানা দুর্বোধ্য নামের আড়ালে বিমূর্তবাদীরা বলতে চাইলেন; নাটকের কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য থাকা উচিৎ নয়। ইয়োনেস্কোরা বলেছিলেন, নাটক অর্থহীন হবে, বেকরা বলেছেন নাটকে ভাষাই থাকবে না। তাঁরা বললেন যে, যুক্তিবাদ বা বিজ্ঞাননিষ্ঠার কারণে শিল্প স্বনিয়মে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না, তার ওপর আরোপিত হয় আনুশাসন বা নিয়ন্ত্রণ, হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাস ও কল্পনা থেকে শিল্প দূরে সরে যায়। বিমূর্তরীতির সমর্থক বেক ও মালিনা বলতে শুরু করলেন, নাটকের কথাই হচ্ছে শিল্পের বাধা, সুতরাং কথা বাদ। তার পরিবর্তে চিৎকার, গোঙানি, বিদঘুটে ঘোৎকার, এইসব হবে নাটকের ভাষা। আর অভিনেতারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে নানা আকৃতি সৃষ্টি করবেন মঞ্চে, সেটাই হবে অভিনয়। সেইজন্যই জুলিয়ান বেকের নাটকে দর্শক দেখতে পেল, মঞ্চে এক অভিনেতা দাঁড়িয়ে আছে এবং আধ ঘণ্টা সে নির্বাক নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো। মঞ্চ ভর্তি সব লাশ। জুলিয়ান বেকের দার্শনিক চিন্তা এক মঞ্চভর্তি মৃতদেহে পরিণত হোলো। নাটক এখানেই শেষ।

নাট্যকার বোঝাতে চাইলেন পৃথিবীতে মৃত্যুই সব, মানুষ মৃত্যুতে রূপান্তরিত হবে। মৃত্যুই বাঁচবার পথ, মৃত্যুই আনবে অনন্তর বার্তা। মানুষ চতুর্দিকে অসম্ভবের প্রাচীরে বন্দী, অসম্ভবের পায়ে সে মাথা খুঁড়ে মরছে। মৃত্যুই জীবনের একমাত্র সত্য স্বরূপ, মৃত্যুই হলো জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা। যার অর্থ দাঁড়ায় মানুষ যা কিছু করছে সব কিছু অর্থহীন। সব কর্মের ফল শূন্য। মৃত্যুই শুধু সত্যি। দুঃস্বপ্ন, ভয়, আতংক এবং মৃত্যু ছাড়া পৃথিবীতে এঁরা আর কিছুই দেখতে পান না। মানুষের বিশাল কর্মের জগতের প্রতি এঁদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। উদ্ভট নাটকের জগৎ জড়, নিষ্ক্রিয়, হতোদ্যম মানুষের জগৎ; বিরাট বিশ্বপ্রকৃতির মাঝখানে যারা জন্মসূত্রেই অভিশপ্ত, কোণঠাসা আর হতাশ। অস্তিত্বের জটিল ঘূর্ণাবর্তে যারা কক্ষচ্যুত জ্যোতিষ্কের মতো উদভ্রান্ত এবং অসহায়। মানুষকে এভাবেই বিচার করেন এঁরা। মানুষের বিপুল কর্মযজ্ঞ এঁদের চিন্তার বাইরে থাকে বলেই পৃথিবীতে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই এঁদের নজরে আসে না। সেজন্য মানুষকে তাঁরা মৃত লাশ বলেই মনে করেন এবং সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য সংগ্রাম থেকে মানুষের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখতে চান, যে কাজটি পূর্বে গির্জার মাধ্যমে ঘটতো।

গির্জা মানুষকে মনে করতো স্রষ্টার ক্রীড়নক এবং ধর্মীয় নাটকগুলোতে তখন তাই প্রচার করা হতো। স্রষ্টার ক্রীড়নক মানে মানুষের নিজের কোনো শক্তি নেই সকলকে সেটা বিশ্বাস করতে অনুপ্রাণিত করা। মানুষ‌কে সংগ্রাম থে‌কে বিমুখ ক‌রে রাখার প্র‌চেষ্টা ছিল সেটা। ম‌নে করা হ‌তো মানু‌ষের ভ‌বিষ্যত পূ‌র্বেই লি‌খিত হ‌য়ে অা‌ছে, মানু‌ষের ভা‌গ্যে ঈশ্ব‌রের বিধা‌নে ভালমন্দ কিছু একটা ঘট‌বে। মানু‌ষের নি‌জের যেন তার বিপরী‌তে কিছুই করার নেই। বিমূর্তরীতির নাট্যধারাও সেই একই কাজ করে চলছে। মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনাকে সে অস্বীকার করে বসে আছে। ধর্মীয় নাটকে তবু আশার বাণী ছিলো, এদের নাটকে সেটুকুও নেই। মৃত্যু ছাড়া মানব জন্মের পেছনে এঁরা আর কিছুই দেখতে পান না। কিন্তু মানুষের ইতিহাস কখনই আত্মহননের ইতিহাস নয়। কিমিতিবাদী নাটক-এর প্রবক্তারা যতোই অগ্রগামিত্বের দাবি করুন না কেন, এর মূল তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে এর মধ্যে ভাব এবং রূপ উভয় ক্ষেত্রেই যা প্রকট হয় তাকে অনিবার্যভাবেই প্রতিক্রিয়াশীলমনস্ক বলতে হয়। পশ্চিমী দুনিয়ার এই কিমিতিবাদী শিল্পীরা বলেন, বিচ্ছিন্নতাবোধ কি বাস্তব নয়, সত্য নয়? মানুষ কি আজ একা হয়ে পড়ছে না এই যন্ত্রসভ্যতায়?

রাজনৈতিক নাট্যচিন্তকরা মনে করেন, নাটকের লক্ষ্য হবে দর্শকের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনা সৃষ্টি নি‌জের ভাগ্য পাল্টাবার জন্য। বিমূর্ত নাটকের প্রধান চরিত্ররা মানুষ বটে, সেই মানুষ নির্জন নিঃসঙ্গ নির্বাসিত; যারা কামুর “আউটসাইডার”-এর চরিত্র। কোনো ধরনের সংগ্রামেই তাই তাঁদের আস্থা নেই। মৃত্যুই সেখানে বাঁচবার পথ। কিমিতিবাদের এই হচ্ছে মূল দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার। নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রেও তাদের বক্তব্য একই রকম, বিশেষ করে স্যামুয়েল বেকেট, ইউজীন ইয়োনেস্কো, আর্থার আদামভ, জাঁ জেন্যে এবং হ্যারল্ড পিন্টার; এরাঁ প্রত্যেকেই নাটকের জগতে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণ দুটি ক্ষেত্রেই তাঁদের চিন্তাধারাকে স্বাধীনতা দানে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। সে স্বাধীনতার অর্থ তাঁরা কোনো যৌক্তিকতার ধার ধারেন না, পূর্ব-অভিজ্ঞতারও কোনো মূল্য নেই তাঁদের কাছে। নিজেরা তাঁরা নাটকে কোনোরকম কোনো উদ্দেশ্য প্রচারের যেমন বিরোধী, তেমনি অন্যরা কিছু প্রচার করুক তারও তাঁরা বিরোধী। নিজেদেরকে তাঁরা প্রমাণ করতে চান নিরপেক্ষ।

মূল সত্য হচ্ছে প্লেখানভ যা বলেন, বক্তব্যবিহীন শিল্পকর্ম বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। কিংবা যে কথা লুনাচারস্কি বলেছিলেন, শিল্পকর্ম জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সর্বদা লেখকের শ্রেণী-মনস্তত্ত্ব‌কে প্রতিফলিত করে। মনে রাখতে হবে, বাণিজ্যিক স্বার্থে বা নিছক বিনোদন দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাস্য-কৌতুককে যখন নাটক হিসাবে চালানো হয়, নিশ্চয় শিল্প হিসাবে বিবেচিত হয় না। কিন্তু কিমিতিবাদীদের ক্ষেত্রে একথা খাটবে না। কারণ কিমিতিবাদীরা শিল্প সৃষ্টি তো করেই না, পাশাপাশি শিল্প সৃষ্টির বিরুদ্ধে এক ধরনের দর্শন প্রচার করে। খুব জোরেসরে তারা বলছে, নাটকের কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না। নাটক যদি কথা না বলে, নাটক যদি মুক হয়ে থাকে শাসকদের বিরুদ্ধে বা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হবে না। শাসকরা এবং ধনীকরা নিরাপদে থাকবে।

একই বিভাগের সংবাদ

Back to top button
x
Close
Close
%d bloggers like this: