বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল, কীসের আলামত?  

বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছর বজ্রপাতে নিহত হয়েছিলেন ১৮৬ জন। সেই অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি। চলতি বছরের মে পর্যন্ত বজ্রাঘাতে মারা গেছেন ১৩৬ জন। এরমধ্যে কেবল এপ্রিলেই মারা গেছেন ৭০ জন। মে মাসে ৬০ জন।

ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বজ্রাঘাতে মোট ৭৩ জন মারা গিয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন ২৮ জন। আর এ বছর শুধু তিন মাসেই মৃত্যু ১৩০ ছাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডাব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়।

বছরে দেড়শ`র মতো লোকের মৃত্যুর খবর সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা পাঁচশ` থেকে এক হাজার। কিন্তু কেন বজ্রপাতে এত মৃত্যু? কীসের আলামত দিচ্ছে এই মৃত্যুর মিছিল?

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আগেও হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটা বেড়ে গেছে। গত দুই-তিন বছরে গড়ে ৩০০-৪০০ লোক মারা গেছে। অতীতে এমন হয়নি। প্রধানত দু`টি কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আবহাওয়া ও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় পরিবর্তন হয়েছে। কালবৈশাখি বেশি হচ্ছে। আর বজ্রপাতের সংখ্যা বা পরিমাণ বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে আগে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর উঁচু গাছ ছিল। তাল গাছ, বটগাছ প্রভৃতি। স্বাভাবিক নিয়মে বজ্রপাত হলে এসব উঁচু গাছ তা টেনে নিতো। কিন্তু এখন তা না থাকায় যখন খোলা মাঠে বজ্রপাত হয় তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শহরে গাছ না থাকলেও উঁচু উঁচু ভবন আছে। ফলে শহরের মানুষ এই মত্যু থেকে রেহাই পাচ্ছে। কিন্তু গ্রামে সেটা হচ্ছে না। বায়ুদূষণও অতি বজ্রপাতের একটি কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বজ্রপাতের প্রতিকার হিসেবে বছর দুয়েক আগে সরকার সারাদেশে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে তালগাছ নয়, তার বদলে লাগানো হয়েছিল ২৮ লাখ তালের আঁটি। এই ২৮ লাখ আঁটির থেকে ১০ হাজার গাছও হয়েছে কিনা কিংবা এখনও টিকে আছে কিনা তা এক বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বজ্রপাত এবং এত মৃত্যু আমাদের এটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। নয়তো পরিবেশ আমাদের উপর চড়াও হয়ে উঠবে।

প্রকৃতি যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে করোনা আমাদের সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ঠিক সেভাবেই অতি বজ্রপাতও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আলামত বহন করছে। এজন্য আমাদের এখনই সতর্ক হওয়া উচিত এবং বেশি বেশি করা গাছ লাগানো উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.