দুধ নিয়ে বিপাকে শাহজাদপুরসহ বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়ার খামারিরা

নিজস্ব প্রতিনিধি : মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ খামারী পর্যায়ে দুধের দাম কমিয়ে এবং কোঠা পদ্ধতি চালু করে দুধ সংগ্রহ করছে। খামারীদের উৎপাদিত দুধ সংগ্রহে করছেন নানা তাল বাহানা। কোঠা পদ্ধতিতে দুধ সংগ্রহ করায় দুগ্ধ খামারীদের উৎপাদিত দুধ নিয়ে দুগ্ধ শিল্প অঞ্চল খ্যাত শাহজাদপুরসহ বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়ার হাজার হাজার খামারী বিপাকে পড়েছেন। শীত মৌসুমে দুধ উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাইরের বেসরকারি কোম্পানী এবং স্থানীয় ঘোষেরাও দুধের দাম কমিয়েছে। এতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে খামারীরা। মিল্কভিটা কতৃপক্ষের এ রকম সিদ্ধান্তের কারণে এ অঞ্চলের খামারীদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। এমনকি মিল্কভিটার এ ধরনের হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই এই পেশায় নিয়োজিত ব্যাপক বিরাট একটি জনগোষ্ঠি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অবিলম্বে কোঠা পদ্ধতি বাতিল এবং দুধের দাম বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও খামারীদের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত ১২ই জানুয়ারি মিল্কভিটার ব্যাবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মোঃ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে ননিভেদে সমিতি এবং সদস্যদের নিকট থেকে (ষ্ট্যান্ডার্ড ৪.০০) কাচা তরল দুধ লিটার প্রতি ১ টাকা কমিয়ে যথাক্রমে ৩৮.৫০ টাকা এবং ৩৬.৪৫ টাকা নির্ধারণ করে পত্রজারি করে দুধ কেনার জন্য বলা হয়েছে। ওই পত্রে আরও বলা হয়েছে ১৭ই জানুয়ারি থেকে উক্ত আদেশ কার্যকর হবে।
শাহজাদপুর উপজেলার কাকিলামাড়ি দুধ সমিতির সভাপতি মহির উদ্দিন, পোতাজিয়া দুগ্ধ সমিতির সভাপতি শহীদ আলী, মাদলা দুধ সমিতির সভাপতি আজাদ, কায়েমপুর ইউনিয়নের খারুয়া জংলা গ্রামের খামারী খোকা বিশ্বাস, উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের উধুনিয়া গ্রামের আবুবক্কার, বেড়া উপজেলার পেচাকোলা গ্রামের আমানত, সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ী গ্রামের ফরিদ আলী ও ফরিদপুর উপজেলার কালিয়ানি গ্রামের শামস উদ্দিনসহ বাঘাবাড়ী মিল্কশেড এরিয়ার বিভিন্ন দুগ্ধ সমিতির সভাপতি, ম্যানেজার এবং প্রায় শতাধিক খামারি এ প্রতিনিধিকে অভিযোগ করে জানায়, দফায় দফায় গো-খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে খামারীরা দুধের দাম বাড়ানোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। খামারীদের সেই দাবি পূরণ না করে উল্টো মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ গত ১ সপ্তাহের ব্যবধানে কোঠা পদ্ধতি চালু এবং দুধের দাম কমিয়েছে। এতে খামারীরা ব্যপক লোকশানের মুখে পড়েছে। এ ছাড়াও এর আগে অতিরিক্ত ধারণ ক্ষমতার অযুহাতে মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ খামারীদের কাছ থেকে ২ দিন দুধ সংগ্রহ বন্ধ রাখে। কোঠা পদ্ধতি চালু করায় খামারীরা তাদের উৎপাদিত সম্পূর্ণ দুধ মিল্কভিটায় বিক্রি করতে পারছেনা। অবশিষ্ট দুধ বেসরকারি কোম্পানী এবং স্থানীয় ঘোষদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এ সুযোগে বেসরকারি কোম্পানী ও ঘোষেরাও দুধের দাম কমিয়ে দিয়েছে। এতে খামারীদের ব্যাপক লোকশান হচ্ছে। মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের উপায় খুঁজছে তারা।
কোন ব্যক্তি বা দলের অনুগত্য প্রকাশ না করে দল মত নির্বিশেষে দুগ্ধ শিল্পকে বাঁচানোর জন্য ঐক্যাবদ্ধ হচ্ছে এ অঞ্চলের খামারিরা। তারা আরও জানান, তাদের উৎপাদিত দুধের টাকায় মিল্কভিটা আজ বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ের একমাত্র লাভজনক শিল্প ও সুশৃঙ্খল সমবায় সমিতি হিসেবে পরিচিত। এ কারণে তাদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ ধরণের একটা নৈতিক মনোবল নিয়ে তারা (দুগ্ধ খামারী) মাঠে নামার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদ জানান, মিল্কভিটার দুধের দাম কমানো এবং কোঠা পদ্ধতি চালুর বিষয়ে তাদের কিছু করণীয় নেই। তবে এ বিষয়ে এরই মধ্যে খামারীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে ঘি, ছানা ও দই সহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যা থেকে দুগ্ধ খামারীরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী, উল্লাপাড়া, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর ও চাটমোহর উপজেলা নিয়ে গড়ে উঠেছে বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়া। এ অঞ্চলে প্রায় ১২’শ প্রাথমিক দুগ্ধ সমিতি এবং প্রায় ২০ হাজার গো-খামার রয়েছে। এছাড়া এ অঞ্চলের প্রতিটি কৃষক পরিবারেই গরু পালন করে দুধ উৎপাদন করে থাকে। আগের তুলনায় দুধের উৎপাদন বেড়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর সিংহভাগ দুধ মিল্কভিটা ক্রয় করে থাকে। মিল্কভিটার পাশাপাশি প্রাণ ডেইরি, আকিজ ডেইরি, আফতাব ডেইরি, ব্র্যাক ডেইরি ফুড (আড়ং) ও অ্যামো ফ্রেশ মিল্কসহ বেশকিছু বে-সরকারি দুগ্ধজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ঘোষেরা খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে দুধ ক্রয় করে। এ ব্যাপরে মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষের মতামতের জন্য মিল্কভিটা ব্যবস্থাপনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ লাভলুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘শীতের এই মৌসুমে খামারীদের দুধ উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় মিল্কভিটার ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তাই পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো এই সিদ্ধান্ত করে যা এখনো এবারও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এটি অস্থায়ী একটি নির্দেশনা। আগামী ব্যবস্থাপনা কমিটিতে এই ধরণের সিদ্ধান্ত যাতে আর বাস্তবায়িত না হয় সে ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনা রাখা হবে, খামারীদের উৎপাদিত দুধ দিয়ে কোনো সময়ই যেন মিল্কভিটা বিপাকে না পড়ে সেজন্য নতুন করে বিক্রয় কেন্দ্র বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকায় ১শ’টি এবং উত্তরবঙ্গসহ সাড়া দেশে আরও ১শ’টি বিক্রয় কেন্দ্র শুরু করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি দুগ্ধ সংগ্রহ ও শীতলিকরণ কেন্দ্রে আমাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। আশা করি এতে মিল্কভিটার এই দৈন্য দশা দূর হয়ে যাবে। ’

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.