তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে

শামছুর রহমান শিশির : দেশের ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ কুটির শিল্প হলো তাঁতশিল্প। তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, বেলকুচি, এনায়েতপুর, উল্লাপাড়াসহ প্রায় জেলা ব্যাপি। এ সকল এলাকায় তাঁতীদের মাঝে বর্তমানে দারুন হতাশা বিরাজ করছে। একদিকে তাঁত শিল্পের উৎপাদন কাজের প্রয়োজনীয় কাচামাল সূতা, রং এবং রাসায়নিক দ্রব্যের অস্বাভাবিক মুল্য বৃদ্ধি এবং সেই সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের কাপড়ের বাজারে ক্রয় বিক্রয়ে মন্দাভাব বিরাজ করায় এই জেলার তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে। ইতিমধ্যেই এই এলাকার প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক এবং মালিক বর্তমানে বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই চালু তাঁতগুলোও বন্ধ হয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা রয়েছে। পাবনা সিরাজগঞ্জের তাঁত সমৃদ্ধ অঞ্চলে ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার এবং বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। সিরাজগঞ্জ জেলায় এ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোন তাঁত শুমারী না হওয়ায় নির্ভূলভাবে প্রকৃত তাঁত সংখ্যা না জানা গেলেও মিডিয়া এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সিরাজগঞ্জ জেলায় পাওয়ারলুম, চিত্তরঞ্জন (হ্যান্ডলুম) এবং পীটলুম মিলে প্রায় দেড় লক্ষ তাঁত রয়েছে। এই তাঁতের সাথে এখানকার উৎপাদিত বিভিন্ন বাহারি ডিজাইনে শাড়ী, লুঙ্গী, ধুতি, থ্রি-পিচ এবং গামছা অনেক উন্নত মানের এবং সারা দেশে বিপুল চাহিদা রয়েছে। এখানকার তাঁতের শাড়ী ও লুঙ্গী ভারতের বাজারে বেসরকারী উদ্যোগে রপ্তানী হয় বলে তাঁতীরা জানান। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাহিদা রয়েছে এবং সে মোতাবেক রপ্তানী হয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশের তাঁতজাত সামগ্রী শুল্কমুক্ত হিসেবে বিদেশে রপ্তানী পন্যের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে বলে তাঁত ফ্যাক্টরীর মালিকরা দাবী করেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের সাথে এই সুবিধা থাকলেও এক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা নাই। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে এই এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা বিশেষভাবে তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল উত্তরবঙ্গের বৃহৎ একটি অঞ্চল। তাঁতের কাপড়ের বাজার ভাল থাকলে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভাল থাকে, আর এই বাজারে মন্দাভাব দেখা দিলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও মন্দাভাব দেখা দেয়। বর্তমানে যেমনটি হয়েছে। এই অঞ্চলের তাঁতীদের উৎপাদিত কাপড় বেচাকেনার প্রধান হাটগুলো হচ্ছে শাহজাদপুর, বেলকুচির সোহাগপুর, এনায়েতপুর, আতাইকুলা, পোড়াদহ হাট। এছাড়া টাংগাইল জেলার করটিয়া, জগারচর, বাবুর হাট ও ভূলতা গাউসিয়া হাট। এইসব হাটের মধ্যে সম্প্রতি শাহজাদপুর, সোহাগপুর, এবং এনায়েতপুর হাট ঘুরে ও অন্যান্য হাটের খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাঁতীরা কাপড় বিক্রীর জন্য তাঁতবস্ত্র সাঁজিয়ে বসে আছে কিন্তু হাটে ক্রেতা বা ব্যাপারী ও পাইকারদের দেখা নেই তেমন। ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই বেশী। অথচ ২/১ বছর আগেও এসময়ে শাহজাদপুর, সোহাগপুর, এনায়েতপুর হাট, কাপড়ের ব্যাপারী এবং পাইকার ক্রেতাদের পদচারনায় থাকতো মুখরিত। এসব হাট থেকে নিয়মিত ভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতের শাড়ী, লুঙ্গী, ধুতী, থ্রি-পিচ, গামছা সহ বিপুল পরিমাণ তাঁত বস্ত্র সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে আর সে অবস্থা নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটগুলোতে আগত কাপড়ের ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, শুধু এই এলাকার হাটগুলোরই অবস্থা এরূপ নয়, সারাদেশে একই অবস্থা। তাঁত শিল্পের বর্তমান করুন পরিস্থিতি।
এই অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় তাঁত ফ্যাক্টরীর মালিকদের মধ্যে বাংলাদেশ পাওয়ারলুম ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি হাজ্বী হায়দার আলী, শাহজাদপুর কাপড় হাট তাঁত কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোঃ আলমাছ আনছারী বেলকুচির জামান টেক্সটাইলের মালিক আলহাজ এম.এ.বাকী, রায় প্রোডাক্ট এর জ্যোতি শাড়ীর মালিক বৈদ্যনাথ রায়, ফাইম টেক্সটাইলের মালিক গোলাম কিবরিয়া বাবু সরকার তাঁত ব্যবসায়ীরা জানান, সূতা, রং, কেমিক্যালসহ তাঁত বস্ত্র উৎপাদনের সকল উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সে অনুপাতে উৎপাদিত কাপড়ের মুল্য বৃদ্ধি পায়নি। এরপরেও দেশে খাদ্য সংকট ও বন্যায় সারাদেশ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে না পাড়ায় ও পাশের দেশ ভারত থেকে অবৈধ পথে কম মূল্যের নি¤œমানের কাপড় এসে বাজার দখল করায় দেশে উৎপাদিত উন্নত মানের কাপড়ের বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে। তাঁত ব্যবসায়ীরা দুঃখ করে বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনরূপ নজরদারী নেই। তাঁত বোর্ড নামে যে সংস্থাটির এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখার কথা তার কোনরূপ কর্মকান্ড নেই বললেই চলে শুধুমাত্র কাগজ কলমে তাঁত বোর্ড নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি। এই অবস্থায় এলাকার ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক তাঁতীরা ইতিমধ্যেই তাদের চলতি মূলধন হাড়িয়ে তাঁদের তাঁত বন্ধ হয়ে বেকার হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র অনেক তাঁতী জ্বালানি খড়ির দামে বিক্রি করে দিচ্ছে হস্তচালিত কাঠের তাঁত। অন্যদিকে মাঝারী এবং বড় ফ্যাক্টরী যাদের কারখানায় চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং পাওয়ারলুমে কাপড় উৎপাদিত হয়, তাদের অবস্থাও এখন ভালো নয়। নিরুপায় হয়ে গ্রাম্য সুদী ব্যবসায়ী এবং সুদী সমিতি থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র তাঁতীরা। ক্ষুদ্র তাঁতীদের মূলধনের জন্য বিভিন্ন এনজিও এবং মধ্যম ও বড় তাঁতীরা স্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা পরিচালনা করছিল। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন যাবৎ কাপড়ের বাজারে মন্দাভাব থাকায় উৎপাদিত কাপড় বিক্রী করতে না পারায় গুদাম ভর্তি কাপড় থাকলেও তাঁত শ্রমিকদের মুজুরী ও ব্যাংক, এনজিও ও সমিতির নিয়মিত কিস্তি দিতে না পাড়ায় অনেকেই এখন হতাশ। সেই সাথে সূতা রং ক্রয় করার মত টাকা মহাজনের হাতে না থাকায় তাঁত চালু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে চালু তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের টাকা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহিতাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইতিমধ্যেই ঋণ খেলাপী হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের চাপে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করায় তাঁত ফ্যাক্টরী বন্ধ করে এইসব তাঁত মালিক বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশের প্রাচীন শিল্প হিসেবে তাঁত শিল্প দেশের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় ভাবে মিশে আছে। বংশানুক্রমে চলে আসা তাঁত শিল্পের ধারক ও বাহক অনেক তাঁতী বর্তমান অবস্থায় এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় জড়িত হওয়ার চিন্তা ভাবনা করলেও বাস্তবতার নিরিখে তা সম্ভব হচ্ছেনা। কারণ তাঁতীরা তাঁতের কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে পারদর্শী নয়। তাই এ সকল ব্যবসায়ীরা এখন দারুন ভাবে হতাশাগ্রস্থ।