গল্প/কবিতাফটোগ্যালারীভিডিওমুক্তিযুদ্ধসম্পাদকীয়স্বাস্থ্য

এটি শুধু গল্প নয়। নিরব ঘাতক ব্যাধি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করার দায়িত্ববোধ থেকেই এ গল্পের অবতারণা মাত্র


জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে আসার গল্প (পর্ব-১)

২৩ আগষ্ট বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পেড়িয়ে ২৪ আগষ্ট শুক্রবার সকালে প্রতিদিনের অভ্যাসমত সূর্যোদয়ের আগেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রাতক্রিয়া সম্পাদনের জন্য উঠতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। বোধদয় হলো দেহের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেমন যেন অচল হয়ে গেছে। অনুভব করছি অসাড় দেহের সাথে মস্তিস্কের সম্পর্কটা যেন অনেকটাই ছিন্ন।

হঠাৎ করেই মস্তিস্কের মাঝে কেমন একটা ঝড় শুরু হয়েছে। ভাবছি এই বোধ হয় আমার জীবনের শেষ যাত্রা শুরু হলো। চোখ বন্ধ করে পরে আছি। দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরছে শুধু পানি। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। আমার ৬৭ বছর বয়সের যাপিত জীবনরাজ্যের হাজারো অতীত কর্মের সকল স্মৃতিকথা মনের পর্দায় একের পর এক ভেসে উঠছে। শৈশব, কৈশর, যৌবন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর সাথে সন্মুখ যুদ্ধে আহত, শহীদ, সহযোদ্ধাসহ, নদীর পানিতে ভেসে থাকা হাজারো বাঙালি নারী পুরুষ ও শিশুর লাশ (যা সে সময়ে ব্রহ্মপুত্র, যমুনাসহ দেশের অন্যান্য নদীতে ভাসতে দেখে ছিলাম) এবং মৃত বাবা-মা আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধবের ছবিগুলো বন্ধ চোখের পর্দায় এক নিমিশে ধারাবাহিকভাবে ফুটে উঠলো।

জীবন্ত মৃত স্বপ্নের ঘোর কেটে যখন সম্বিত ফিরে পেলাম। নিজের ঘাড়টি কাঁত করে বিছানায় স্ত্রীকে একবার দেখবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘাড়টিকেও নাড়াতে ব্যর্থ হলাম। অবশেষ জোরে চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে শুরু করলাম। দেখতে পাচ্ছি ছেলেমেয়ে স্ত্রী সবাই পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সবার প্রশ্ন কি হয়েছে? আমি নিরব, বোবা। চোখের কোন দিয়ে গড়িয়ে পরছে শুধু পানি। বোবা কান্নাটাই যেন ছিল আমার সে সময়ের ভাষা। অবশেষে অতি কষ্টে বললাম তোমরা আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করো। সবাই বলাবলি করছে ঘুমের মাঝে আমার নাকি মাইনর ষ্ট্রোক হয়ে গেছে। সে কারনে হাত-পা অচল। এমন প্রেক্ষাপটে সেটা ভাবাই স্বাভাবিক। কারন আমার হৃদপিন্ডের একটি নালার ৮০ ভাগ ব্লক হওয়ার কারনে ২০০৮ সালের মার্চ মাসে (১০ বছর আগে) ন্যাশনাল হার্ড ফাউন্ডেশন মিরপুর-২, হৃদপিন্ডে রিং পরানো হয়েছিল। এর পর থেকে প্রতিবছরই চলছিলো নিয়মিত চেকআপ, ঔষধ সেবন। এর পাঁচ বছর পর হই ডায়বেটিক্স আক্রান্ত। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ি হার্ট এবং ডায়বেটিক্স এর ঔষধ সেবন চলমান ছিল।

আমার অবস্থান ঢাকা মিরপুর-১ চিড়িয়াখানা রোড এলাকায়। মেঝো ছেলে আমার সাথে থাকে। সে মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডশনে নেয়ার জন্য উদ্যোগী হলো। কারন হাসপাতালটি আমাদের বাসার কাছাকাছি। আমি মানষিকভাবে প্রস্তুত। হঠাৎ মনে হলো যাবার আগে গোছলটা সেরে নেই। জীবন্ত অবস্থায় এটাই হয়তোবা শেষ গোছল হতে পারে। এদিকে গাড়ীর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলো। আমাকে ধরাধরি করে বাথরুমে ঢুকিয়ে গোছল সম্পন্ন করে গাড়ীতে উঠানো হলো হাসপাতালে নেয়ার জন্য। আমি মত পরিবর্তন করে বললাম ঢাকার উত্তরায় অবস্থানরত আমার বড় ছেলের বাসায় আমাকে নিয়ে যেতে। সেখানে সবাই মিলে বসে চিকিৎসার বিষয়ে সিন্ধান্ত নিতে হবে। সেটাই করা হলো। সকাল ১০ টার দিকে উত্তরায় পৌঁছালাম। তখন পর্যন্ত হাতপায়ের কিছুটা অনুভূতি ছিল।

বিকেলে উত্তরা ৬ নং সেক্টরে অবস্থিত ল্যাব এইডের ডাক্তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আহমেদ সাহেবের এর চেম্বারে আমাকে নেয়া হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য দু’মিনিট সময় ব্যয় করলেন। বললেন, কার্ডিয়াক সমস্যা নয়। (১) ভিটামিন ট্যাবলেট “নিউরো-বি” দুই মাস এবং (২) ঘুমের ঔষধ ট্যাবলেট রিভোট্রিল ০.৫০ মিলিগ্রাম, অর্ধেক ট্যাবলেট ১ মাস খাবার পরামর্শ দিয়ে নিজ প্যাডে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিলেন। ফি নিলেন ৮০০ টাকা। গুরুত্বহীন রোগীদেখার বিষয়টি আমাকে অত্যন্ত পীড়া দিল। রাত ১০ টায় একই হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তারের কাছে আমাকে নেয়ার জন্য সিরিয়াল দেয়া ছিল। ছেলেরা সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যোগি হলে আমি অনিহা প্রকাশ করলাম। ছেলেরা তখন আমাকে দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য নেয়ার প্রস্তুতি হিসেবে আমার পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা লাগানোর প্রক্রিয়া শুরু করে দিল। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের এপোয়েন্টমেন্ট ও চিকিৎসা ব্যায় জানার জন্য ব্যাঙ্ককের বামরুডগ্রান্ড ও ভারতের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ম্যাসেস পাঠালো বড় ছেলে।

চলবে…..

বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার
প্রধান সম্পাদক
শাহজাদপুর সংবাদ ডট কম

তাং- ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ,
০৫ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

একই বিভাগের সংবাদ

Back to top button
x
Close
Close
%d bloggers like this: