চলনবিলে অর্ধশত দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি’র পথে; জেলে পরিবারে চলছে দুর্দিন


‘চিরায়ত মাছে ভাতে বাঙালি’ কথাটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কল্পবাক্যে

শামছুর রহমান শিশির, বিশেষ প্রতিবেদক : দেশের সবচেয়ে বড় বিল চলনবিল। এ বিলকে দেশের সর্ববৃহত মাছের খনি বলা হতো। নদী-নালা, খাল-বিলে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় বর্তমানে শাহজাদপুরহ চলনবিল অঞ্চলের নদীনালা, হাওর বাওর, খালবিল বর্তমানে প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। ‘চিরায়ত মাছে ভাতে বাঙালি’ কথাটি ধীরে ধীরে কল্পবাক্যে পরিণত হচ্ছে। শাহজাদপুরসহ চলনবিল অঞ্চলে বর্তমানে চলছে মাছের আকাল। এ অঞ্চলে বিলুপ্ত প্রায় হয়ে পড়েছে প্রায় ৫১ প্রজাতির দেশীয় মাছ।
সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার ১৪ টি উপজেলার নীচু এলাকা নিয়ে চলনবিল অঞ্চল গঠিত। ভারতের মরুকরণ প্রক্রিয়ার কু-প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিল শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীবক্ষে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় জেলেদের মৎস্য শিকারের স্থানের পরিধি একেবারেই কমে গেছে। নদ-নদী, খালবিলে যে টুকু পানি আছে তাতে শাহজাদপুরসহ এ অঞ্চলের জেলেরা দিনভর মেহনত করেও তেমন একটা মাছ ধরতে পারছে না। ফলে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মৎসজীবী পরিবারের সদস্যরা খেয়ে না থেয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন।
প্রতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের বিস্তৃর্ণ এলাকার নদীনালা, খালবীল, হাওর, বাওর ও জলাশয় শুকিয়ে যায়। ফলে কৃষি খাতে এর বিরুপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি মৎস খাতেও বিরুপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। ফলে এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে দেখা দেয় মাছের দু:®প্রাপ্যতা। অথচ পুষ্টি চাহিদা পূরনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকের বিবেচনায়ও দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করা অতীব জরুরী।
জানা গেছে, বিলুপ্ত হওয়া দেশীও প্রজাতির মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শংকর, ভেদা, পাশা, পানিরুই, বাটাকাতল, শিলং, দুই প্রজাতির টেংরা। স্থানীয় জেলেরা জানান,আগে দেশীয় প্রজাতিসহ বিভিন্ন প্রকারের মিঠা পানির মাছ চলনবিলাঞ্চল থেকে তারা সংগ্রহ করতেন। বোয়াল থেকে শুরু করে রুই কাতলা, টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রচুর পরিমানে পাওয়া যেতো। নদীগুলো শকিয়ে নদীবক্ষে ধুঁ-ধুঁ বালির চর পড়ায় বর্তমানে মাছের দু®প্রাপ্যতা দেখা দিয়েছে। এতে এ অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে পরিবারে বর্তমানে বিরাজ করছে কালো মেঘের ঘটঘটা। পিয়াজ, চাল, ডাল, আটা, তরকারি, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি বর্তমানে ওইসব জেলে পরিবারের ভরনপোষন প্রশ্নে তারা চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। মৎস্য দু®প্রাপ্যতায় তাদের ভাগ্যাকাশে দেখা দিয়েছে দুর্যোগের ঘনঘটা। তাদের অন্য কাজ না থাকায় এ সময় তাদের শুয়ে বসে কাটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,নদ-নদীতে পলি ও বালি জমে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ বাধ নির্মান, জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাষকের ব্যবহার , দেশীয় মাছ চাষে অনীহা, অসময়ে অতিরিক্ত মাছ ধরা, মৎস আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াসহ নানা কারনে চলনবিল অঞ্চল থেকে মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলেও নানা কারণে তা সফলতার মুখ দেখতে ব্যার্থ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘চলনবিল অঞ্চলে বিলুপ্ত হওয়া মাছকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হয়তো আগের মতো মাছ চলনবিলে পাওয়া যাবে না। তবুও যে কোন উপায়ে এ অঞ্চলকে মাছের অভয়াশ্রম হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশে মাছের ও পুষ্টির চাহিদা পুরনের জন্য দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও মাছচাষ স¤প্রসারন অত্যন্ত জরুরী। এজন্য দেশীয় প্রজতির মাছ সংরক্ষন ও মাছ চাষ স¤প্রসারন অভিযানকে আরও জোড়দাড় করা উচিত।
মৎস বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সর্ববৃহত বিল চলনবিলে মাছ চাষ করে দেশের মাছের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত অংশ বিদেশে রফতানি করা যেতে পারে। কেননা মিঠা পানির মাছের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নোনা পানির মাছের চাইতে অনেক বেশী। পরিকল্পিতভাবে মৎচাষের মাধ্যমে শাহজাদপুরসহ চলনবিল অঞ্চলের হাজার হাজার জেলেদের আয়ের পথ সুগম হওয়ার পাশাপাশি তাদের কর্মস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর বিদেশে বিপুল পরিমান মিঠা পানির মাছ রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভীতকেও আরও সুসংগঠিত ও চাঙ্গা করে তোলা সম্ভব হবে। এজন্য মৎসখাতে অপার সম্ভাবনাময় চলনবিল অঞ্চলে ব্যপকভিত্তিতে মাছচাষের উদ্যোগ হাতে নেওয়া উচিত বলে বিজ্ঞমহল মনে করেন।

মন্তব্য