চলনবিল অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী স্বকীয়তা ও মাতৃভাষা হারাতে বসেছে

শামছুর রহমান শিশির : বেঁচে থাকার অধিকার যখন বিপন্ন। তখন মাতৃভাষা হারাবে, সে আর অবাক হওয়ার মতো কী। আর এই মাতৃভাষা হারাবার ঠেলায় পড়েছেন সমতটের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি। আর উত্তরের চলনবিল অঞ্চলের গ্রাম-গহিনে বসবাসরত বেশ কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি মাতৃভাষা হারাতে বসেছে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ তেমনটি না থাকায়। এমন হওয়ার কারণ আগের মতো এক জায়গায় গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবে থাকতে না পারায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাদের একথার প্রমান মেলে এ অঞ্চলে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ থেকে। সেটি হলো-‘পুংরউহালি-মুন্ডুমালা, একেক গায়ে একেক….’। মাতৃভাষা রক্ষায় পৃথক স্কুল ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিগুলোর। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তাদের দাবী পূরন হয়নি।
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি বহু ভাষা, জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, সম্প্রদায়ের মহামিলনক্ষেত্র। বাংলাদেশে সিলেট অঞ্চলের চা বাগানসমূহে প্রায় ১১০টি, উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় ৬৪টি এবং অন্যান্য অঞ্চলের পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে মোট তিন শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। এদের সবাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি।
ভাষা গবেষকেরা বলে আসছেন, একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রথমতঃ নির্ভর করে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের ভাষা সংরক্ষণ জরুরী। ক’জন গবেষক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকে, চাটমোহরী, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ, রায়গঞ্জ, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, আটঘরিয়া, ঈশ্বরদী উপজেলা ও পাবনা জেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০টির মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষ বসবাস করত। এখনো মাহাতো, লহড়া, মুন্ডা, রাজবংশী, মালো, বাগদি, বিন্দু, মালপাহাড়িসহ বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীর লক্ষাধিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষ বাস করছেন। তাঁরা কৃষিকাজ, মাছধরা ও কৃষিতে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। তবে যথাযথ সংরক্ষণ ও চর্চার সুবিধে না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে তাঁদের মাতৃভাষা।
আগে চলনবিল এলাকায় প্রায় ৮০/৯০ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষের বসবাস ছিল। অনেকেই ভিটে ছেড়ে অনত্র চলে গেছেন এদের মধ্যে উড়াও, মাহাতো, রাজবংশী, রবিদাস, কনকদাস, মাহালি ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির নারী-পুরুষ রয়েছেন। এক সময় এসব সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ বন-জঙ্গলে ঘুরে শিয়াল, খরগোশ, বেজি, কচ্ছপসহ নানা ধরনের প্রাণি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আবার যখন চলনবিলে দেশী ধানের আবাদ হতো। তখন আবাদ শেষে জমির মাঝে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করতো। কোন কোন সম্প্রদায় মাছ শিকার করে চলতেন। অনেকে ছিলেন কৃষি শ্রমিক। এখন সময় বদলে গেছে। বনবাদাড় উজাড় হয়ে পড়ায় তাদের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সংসার চালাতে তারা কৃষি ও ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ বেছে নিয়েছে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক সংলগ্নতা থাকতে হবে এবং নিজেদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হিসেবে বোধ করতে হবে। সংগ্রামের মাধ্যমে এ বৈশিষ্ট্যসমূহ ক্রমাগত বিকশিত হতে থাকে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া এবং বিকশিত হতে সহযোগিতা করা। জীবনে জীবন মেলাবার আয়োজন করা। কিন্তু সে আয়োজন নেই বলেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বিপন্নতা বোধ করেন। নানা মাত্রিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এখানে কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির সংক্ষিপ্ত জীবনধারা বিধৃত হলো।
পাহানঃ- পুরুষ কিংবা মহিলা যেই হোক না কেন নামের শেষে পাহান টাইটেল ব্যবহার করেন। বিয়ের সময় বর তার বউ আর শ্বাশুড়ীকে একটা করে শাড়ি দেন। সাথে থাকে নগদ ১২ টাকা। পরে আরেকটা শাড়ী নগদ দেয়া হয় নতুন বউকে। কিন্তু সময় এখন অন্যরকম। বাঙ্গালীদের দেখাদেখি এখন ছেলেরাই যৌতুক চাইতে শুরু করেছে। ইতিহাস বলে ভরতের নাগপুর থেকে এখানে পাহানদের জঙ্গল কাটার শ্রমিক হিসেবে নিয়া আসা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে।
ওঁরাওঃ- রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর বগুড়া ও সিরাগঞ্জ জেলায় বাস করা ওঁরাও রা একমাত্র দ্রাবিড় আদিবাসী। সাঁওলতাল এবং ওঁরাও, এই দুইজাতি বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে বাস করা সব থেকে বড় আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বলা হয়ে থাকে যে, এই দুইজাতিই ভারতবর্ষে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। ওঁরাও দের ভাষা কুরুক হলেও এর কোন বর্ণমালা নাই। কুরুক এখন প্রায় মৃতপ্রায় ভাষা এবং শুধুমাত্র কিছু বয়স্ক মানুষ এই ভাষা ব্যবহার করে। অন্যরা (প্রায় সব আদিবাসী সম্প্রদায়) সাদ্রী ভাষায় কথাবার্তা বলে। সাদ্রী হলো হিন্দি, কুরুক ও বাংলা ভাষার মিশ্রজাত এক ভাষা। ওঁরাও রা ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী-মার্চ) মাসের শেষ দিন ফাগুয়া উৎসব পালন করে। এসময় বিভিন্ন গাছের ডাল মাটিতে পুতে তার উপর শুকনা খড় বিছানো হয়। রাতের বেলায় এই ডালপালা পুড়িয়ে মানুষ আনন্দ করে। এটাকে ধারিত্রী মাতার মৃত্যুর চিহ্ন বলে মনে করা হয়। চৈত্র মাসে (মার্চ-এপ্রিল) আসে বসন্ত উৎসব সাহরুল, যখন তারা বৃষ্টি কামনা করে। গ্রাম প্রধানের বাড়ির উঠানে পানি ভর্তি কলসী রাখা হয়। মেয়েরা এর চারপাশ ঘিরে নাচে এবং নাচ শেষে বৃষ্টি সময়মত আসবে এই বিশ্বাসে ওদের মাথায় পানি ঢালা হয়। যদি এলাকায় খুব বেশী খরা হয়, গ্রাম প্রধান ও তার স্ত্রীকে পাশাপাশি বসিয়ে আকাশ আর পৃথিবীর মধ্যে বিয়ের চিহ্ন হিসাবে ওদের কপালে সিঁদুর লেপে দেয়া হয়। যখন কলসি থেকে ওদের মাথায় পানি ঢালা হয়, সবাই বৃষ্টি কামনায় বরষো বরষো বলে চিৎকার করে।
মাহালিঃ- বাঁশের তৈরী কুলা, মাল-পত্র বহন কিংবা খাদ্য শস্য সংরক্ষণ করার বিভিন্ন রকম ঝুড়ি বানানাটাই মাহলি মানুষদের মূল পেশা। বৃহত্তর রাজশাহী জেলার বিভিন্ন স্থানে এই মানুষেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের পূর্ব পুরুষরা ভারতের রাঁচি, ডুমকা, ছোটনাগপুর, মাটিপাহাড়, হাজরীবাগ এবং পুকুরিয়া এলাকা থেকে এসছিলো। কারন ওখানে ছিল খাবারের অভাব, দূর্ভিক্ষ আর খাজনা আদায়কারীদের অত্যাচার। আনুমানিক পাঁচ হাজার মাহালি বাংলাদেশে আছে বলে ধারণা করা হয়। সহজ জীবন যাপন করলেও এই সম্প্রদায়ের মানুষের বেঁচে থাকা ততটা সহজ নয়। কারমা ও জিতিয়া এই দুই হচ্ছে এদের প্রধান উৎসব। কারমা অবিবাহিত মেয়েদের অনুষ্ঠান যেখানে শুধু ওরাই অংশ গ্রহণ করতে পারে। জিতিয়া উৎসবে পাঠা বলি দিয়ে অপদেবতার দুষ্ট গ্রহ থেকে মুক্তি কামনা করা হয়। যদিও অনেকেই এখন খৃষ্টান। আদি পুরুষের পূজা-পার্বণ এখনও মহিলাদের জীবনের একটা বড় বিষয় বলে বিবেচিত হয়। এই সমাজে ৪ টি গোত্র বিদ্যামান। পরিবার জীবনে মাহালি নারীরাই সংসারের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। কারণ, ‘পুরুষেরা মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পছন্দ করে।’ এ সম্প্রদায় শান্তিপ্রিয়। একজন মাহালি অন্য এক মাহালিকে খুন করেছে এমন ঘটনা বলতে পারবে না।
খাসিঃ- ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যর সীমান্তর্বতী কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন চা-বাগান ও গ্রামে খাসি মানুষের বসবাস। খাসিরা লাজুক, শান্তিপ্রিয় এবং পানপাতা চাষের জন্য সবার কাছে পরিচিত। এ সমাজে পণ প্রথার কোন চল নেই। মেয়েরা বাবার বিষয় সম্পত্তির সিংহভাগ পেয়ে থাকে এবং যখন কোন মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর বাড়ী যায়, তার পণের বিষয়াদি ভাইরাই দেখাশোনা করে। ব্রান্ড খাসিয়া ৪৫ বছর আগে মৌলভী বাজারে কালিনজি পুঞ্জী প্রতিষ্ঠা করে। এই সমাজে কেউ খালার মেয়ে বা মামার মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না। কারন এরা সবাই রক্ত সম্পর্কিত।
মনিপুরীঃ- ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বাহক হিসাবে মনিপুরীর পরিচিত এবং মনিপুরী নাচ সারা বিশ্বে সমাদৃত। আদি পুরুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এই সব নাচ আর গানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়। লোককাহিনী মতে স্বর্গের অধিপতি আতিয়া গুরু সিদবারের নির্দেশে আসিবা গুরু পৃথিবী সৃষ্টি করে। যখন আসিবা গুরু কাজ শুরু করে, হরাবা লইথিংগা নামের এক দুষ্ট দেবতা তার কাজে প্রতিন্ধকতা সৃষ্টি করছিল। স্বর্গের অধিপতি তখন নংথা লইমা নামের এক দেবীকে জীবন দান করে যে তার নাচ দিয়ে দুষ্ট দেবতাকে মোহিত করে রাখে। এভাবেই পৃথিবী তৈরীর কাজ শেষ হয়। রাস মনিপুরীদের সব থেকে বড় উৎসব। এর মধ্য দিয়ে দেবতা কৃষ্ণের বন্দনা করা হয়। কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো পূজা মন্ডপে অবিবাহিতা মেয়েরা মধ্য রাত থেকে ভোর পর্যন্ত শিশু রাধা ও কৃষ্ণের চারপাশ ঘুরে ঘুরে নাচে এই উৎসবে। গ্রামের শিশুদের মধ্য থেকে কৃষ্ণ ও রাধাকে আগে থেকেই নির্বাচন করা হয় এবং এই নাচের মহড়া কমপক্ষে এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে।
গারো/মান্দিঃ- মাতৃসূত্রীয় পরিবার ব্যবস্থার জন্য মান্দিরা পরিচিত। মেয়েরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় এবং একই গোত্রের মধ্যে বিয়ের কোন চল নেই। মান্দিরা কয়েক ডজন মাচং(গোত্র)এ বিভক্ত । প্রতিজন তার মায়ের বংশের নামে পরিচিত হয়। পুরুষ কিংবা মহিলা, সে যেই হোক না কেন। বিয়ের পর বর তার স্ত্রীর গ্রামে গিয়ে বসবাস করে। একজন পুরুষ ইচ্ছা করলে তার শ্বশুর বাড়ীতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগই এক বা দু’বছর পর আলাদা করে বাড়ি তৈরী করে। এটা আশা করা হয় যে, বাবা-মা যতদিন জীবিত থাকবে, এক মেয়ে তার স্বামী নিয়ে পরিবারে সাথে বসবাস করবে। অতীতে এরকম চল ছিল যে, যে মেয়ে এই নিয়ম মেনে চলত, দায়িত্ব পালনের পুরস্কার হিসাবে অস্থাবর সম্পত্তি, খাদ্য-শস্য এবং বাড়ী পেত। যে মেয়ে বা মেয়েরা আলাদা করে নিজের বাড়ী করে জীবন শুরু করে-মা, বোন এবং পরবর্তী সময়ে নিজের মেয়ের কাছাকাছি থাকার জন্য সে একই গ্রামে তৈরী করে। একত্রে থাকার এই প্রবণতা একজন মান্দি নারীকে অনেক নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। শ্বশুর বাড়ীতে যা থেকে বঞ্চিত হতে পারত। আত্মীয় স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের বাড়িতে বেড়াতে যাবার জন্য একজন মান্দি নারীর তার স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির উন্নয়নে কাজ করলেও তাঁদের ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়নি। তাই এসব সংরক্ষণের জন্য সরকারকেই যথাযথ উদ্যোগ নেয়া দরকার-এমনটাই জানিয়েছেন এ অঞ্চলের বিজ্ঞমহল।