চক্ষু বিশেষজ্ঞ ইউনুস আলী খান সহ আড়াই মাসে ৫৩ জন চিকিৎসকের মৃত্যু

ফাইল ছবি

মো. ইউনুস আলী, শহীদুল আনোয়ার, এস এম সাইফুল ইসলাম, ফিরোজা বেগম

বুধবার সন্ধ্যা থেকেই একটার পর একটা মৃত্যুর খবর আসছিল। মৃত্যুর খবরগুলো এমন মানুষদের, যাঁরা নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে করোনায় আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। বুধবার রাতেই মারা যান তিন চিকিৎসক। মন খারাপ করা এমন খবর শুনতে হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও।

গত বুধবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে আরও চারজন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। এ নিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে মোট ৫৩ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হলো। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন এবং করোনার উপর্সগ নিয়ে ৬ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে।

গত ৮ মার্চ দেশে করোনায় সংক্রমিত প্রথম রোগী শনাক্ত হন। প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ১৮ মার্চ। আর করোনায় দেশে কোনো চিকিৎসকের মৃত্যুর প্রথম ঘটনাটি গত ১৫ এপ্রিলের।

বিএমএর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশের ১ হাজার ২৬৮ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকা জেলার চিকিৎসকেরা। এই জেলায় গতকাল পর্যন্ত ৫৩৮ জন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ঢাকার তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালেরই ৩৪৭ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭১ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২০ জন ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে আছেন ৫৬ জন।

ঢাকায় এত চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিএমএর করোনা প্রতিরোধ ও সহায়তাসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় হাসপাতাল-ক্লিনিক ও রোগী—দুটোই বেশি। তাই দেশের অন্য এলাকার চেয়ে ঢাকায় বেশি চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যেও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল পর্যন্ত ১ হাজার ১৯৯ জন নার্স এবং ১ হাজার ৬২৮ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন।

করোনা থেকে বাঁচার জন্য চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি এ–সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও জরুরি। কিন্তু এ দুটিতেই এখনো ঘাটতি আছে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও নাগরিক সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের গবেষণাতেও বিষয়টি উঠে এসেছে। গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত দেশের ৩৮টি জেলার ৪৭টি হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২২ দশমিক ২ শতাংশ হাসপাতালের চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ সবাই করোনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আর ২ দশমিক ২ শতাংশ হাসপাতালের কেউই প্রশিক্ষণ পাননি। গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ২৫ শতাংশ হাসপাতালের সব চিকিৎসক ও ৩৪ শতাংশ হাসপাতালের সব নার্স ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী (পিপিই) পাননি বলে জানিয়েছেন।

এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৬৮ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত। গত বুধবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত চার চিকিৎসকের মৃত্যু।

বিএমএর কাছে আক্রান্ত চিকিৎসকের হালনাগাদ হিসাব থাকলেও তাঁদের মধ্যে কতজন চিকিৎসাধীন আছেন এবং কতজন সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন, তার সঠিক হিসাব নেই। তবে বিএমএ বলছে, আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়েছেন এবং তাঁদের প্রায় সবাই আবার কাজে যোগ দিয়েছেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সেবা করার সময় গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আক্রান্ত হয়েছিলেন হাসপাতালটির চিকিৎসক এ আর এম খায়রুল আলম সিদ্দিক। তিনি বলেন, করোনায় আক্রান্ত এক শিশুর চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন।

চার চিকিৎসকের মৃত্যু

বিএমএর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ মারা যাওয়া চার চিকিৎসক হলেন ইউনুস আলী খান, ফিরোজা বেগম মিনু, এস এম সাইফুল ইসলাম ও শহীদুল আনোয়ার।

তাঁদের মধ্যে বুধবার সকালে মারা যান চক্ষু বিশেষজ্ঞ ইউনুস আলী খান। ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ এই চিকিৎসক করোনায় সংক্রমিত হয়ে রাজধানীর ইমপালস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে শাহজাদপুরের সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছিলেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ফিরোজা বেগম গতকাল (বৃহস্পতিবার) ভোরে মারা যান। তিনি রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এস এম সাইফুল ইসলাম। তিনি রাজধানীর আল-মানার হাসপাতালের পরিচালক ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।

অন্যদিকে গত বুধবার রাতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীদুল আনোয়ার নামে আরেক চক্ষুবিশেষজ্ঞের মৃত্যু হয়েছে। ষাটোর্ধ্ব শহীদুল আনোয়ার চট্টগ্রামের চান্দগাঁওতে বণি হাসান চক্ষু হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ছিলেন। নগরের জামালখান এলাকায় ব্যক্তিগত চেম্বারেও তিনি রোগী দেখতেন। তাঁর বাড়ি ফটিকছড়ি এলাকায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আফতাবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৬ মে শহীদুল আনোয়ার হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি হন। এর আগে তিনি বাসায় চিকিৎসা নেন। চার দিন আগে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে তিনি মারা যান।

চিকিৎসকদের মধ্যে সংক্রমণ রোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএমএর দপ্তর সম্পাদক মোহা. শেখ শহীদ উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন, এটি ধরে নিয়ে সব রোগীর চিকিৎসা দিতে হবে। হাসপাতালে যেসব রোগী আসবেন, তাঁদের অবশ্যই মাস্ক পরে আসতে হবে। তিনি বলেন, সব চিকিৎসকের জন্য আসল এন–৯৫ মাস্ক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের যথাযথ প্রক্রিয়ায় পিপিই পরতে ও খুলতে হবে, প্রয়োজনে অনলাইনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।