গোবরে পদ্মফুল-০৩ : ডেইরি ফার্ম থেকে ব্যাপক আয়ের উৎস দুগ্ধ নয়, গোবর !—মডেল খামারী এলিজা খান

শামছুর রহমান শিশির : শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা গ্রামে ২০১২ সালে স্থাপিত ‘মিসেস এলিজা খান ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট’-এর স্বত্ত্বাধিকারী মিল্কভিটা’র সাবেক চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুনের সুযোগ্য সহধর্মীনি, শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান,মডেল খামারী এলিজা খান বলেছেন,একটি গো-খামার থেকে ব্যাপক আয়ের উৎস গো-খামারে উৎপন্ন দুধ নয় ! কারণ গো-খামার থেকে প্রাপ্ত দুধ একটি নির্দিষ্ট আর্থিক মানদন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু একটি গো-খামার থেকে প্রাপ্ত গোবর বহুমুখী ও ব্যাপক আয়ের উৎস হতে পারে যদি কেউ তার ওই মডেল ডেইরী ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্টের অনুকরণ অনুসরণ করেন। গো-খামারে উৎপন্ন দুধ বিক্রি করে সীমিত আয় অর্জন সম্ভব। কিন্তু একটি গো-খামারের পাশে যদি একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয় তাহলে নিজেদের বৈদ্যুতিক ও জ্বালানীর মোট চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসাবে মিথাইল বায়োগ্যাস বিক্রি ও উৎকৃষ্টমানের জৈবসার বিক্রির মাধ্যমে বহুমুখী বহুগুণে বাড়তি আয় সম্ভব। তাই মডেল গো-খামারী এলিজা খানের মতে একটি ডেইরি ফার্মে আয়ের উৎস হিসাবে শুধু দুধ প্রাপ্তি ও বিক্রি এমন ধারনা আর নয়,বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে নিজেরাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানী উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত গতিতে ভাগ্যের চাকাকে সুপ্রসন্ন ও দ্রুত গতিতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও লাভবান হওয়া সম্ভব।
দেশের একমাত্র মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট পরিদর্শণকালে উপরোক্ত কথাগুলো বলেন মডেল ও সফল গো-খামারী এলিজা খান। তার ওই ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সাথে এবং বিশেষজ্ঞ মহলের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নিউজিল্যান্ড,অষ্ট্রেলিয়াসহ বহির্বিশ্বের দুগ্ধ উৎপাদনকারী খ্যাতমান দেশসমূহে ডেইরি ফার্ম সংলগ্ন এলাকায় বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে গো-খামারীরা পরনীর্ভরতা দূরীভূত করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তারা দুগ্ধ উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন করে রীতিমতো তাদের ভাগ্যের চাকাকে দ্রুত গতিতে ঘোড়াতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের একমাত্র মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট পরিদর্শনে মাঝে মধ্যেই দেশ বিদেশের বিভিন্ন টিম শাহজাদপুরের রাউতারা গ্রামে এসে থাকেন। তারা দেশের একমাত্র ওই মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট পরিদর্শণ করে অভিভূত হন এবং সারাদেশের গো-খামারীদের মাঝে এই পদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়ার আশাবাদ ব্যাক্ত করেন। কিন্তু ওই আশাবাদ শুধু অন্ধকারেই রয়ে গেছে। কারণ, সরকারিভাবে প্রত্যেক এলাকায় ওই মডেল ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা না নেয়ায় কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। ব্যক্তি পর্যায়ে দেখাদেখিতে অনেকেই ওই ধরনের প্লান্ট স্থাপন করছেন। সফল গো-খামারীদের ভাষ্যমতে, দুধের চেয়ে গোবরের আর্থিক মূল্য মোটেও কম নয়। এজন্য প্রয়োজন যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা আর ব্যাপক ভিত্তিতে দেশের গো-খামারীদের সচেতন করে তোলা। দেশের গো-খামারীরা মডেল গো-খামারী এলিজা খানের এ পদ্ধতি অনুসরণ করে খুব দ্রুত স্বাবলম্বী ও লাভবান হতে পারেন। এজন্য গো-খামারীদেরকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। গোবর ব্যবহার করে বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে বহুমুখী আয়ের ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হওয়া খুবই প্রয়োজন। ইন্টারনেট ব্যবহার করলে উন্নত বিশ্বের উন্নত জাতের গবাদীপশু লালন পালন,প্রজনন ও বায়োগ্যাস প্লান্ট সম্পর্কে ব্যাপক ধারনা অর্জন হবে। এই ধারনাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের গো-খামারীরা অতিদ্রত তাদের ভাগ্য বদলাতে সক্ষম হবেন।’ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান ও মিল্কভিটার সবেক সফল চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুন বলেন,‘আমাদের দেশের গো-খামারীরা শুধু দুধ উৎপাদনের ওপর সবচাইতে বেশী গুরুত্বারোপ করে থাকেন। কিন্তু দুধের চাইতে গোবরের অর্থনৈতিক,পরিবেশগত,কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্ব যে অপরীসিম তা সম্পর্কে দেশের গো-খামারীরা অবগত নন। অথচ দেশের সকল গো-খামারীদের মধ্যে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে যদি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় ও সচেতন করে তোলা সম্ভব হয় তাহলে দেশের গো-খামার সেক্টরে ও জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট এক বিপ্লব ঘটে যাবে।’
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে,‘একটি ডেইরি ফার্ম নির্মাণ ও গবাদীপশু লালন পালন করে দুগ্ধ উৎপাদন ও বাছুরের প্রজনন করা ছাড়াও যে গবাদীপশুর মলমূত্র থেকে ব্যাপক পরিমান অর্থ আয় করা সম্ভব,সেই দূরহ,অসাধ্য,সাফল্যমন্ডিত কাজটিই বাস্তবে রূপদানে সক্ষম হয়েছেন এলিজা খান নামের মডেল এক গো-খামারী। ডেইরি ফার্মে দুধ উৎপাদন ও বাছুরের প্রজনন কাজের মাধ্যমে প্রতি বছরে একজন গো-খামারী যে পরিমান অর্থ আয় করেন তার চেয়েও বহুগুণে বেশী অর্থ আয় করা সম্ভব গো-খামারের পাশে একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করে। বহির্বিশ্বের গবাদীপশু বিশেষজ্ঞ ও গুণী অর্থনীতিবিদগণও মনে করেন একটি ডেইরি ফার্ম নির্মাণ করে দুগ্ধ উৎপাদন করাটা মোটেও মুখ্য বিষয় নয়। আর্থিক দিক বিবেচনা করলে একটি ডেইরি ফার্ম থেকে সংগৃহিত দুধের মূল্যমানের তুলনায় বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করে বিদ্যুৎ,বায়োগ্যাস,উৎকৃষ্টমানের জৈবসার উৎপাদন করে রীতিমতো এ খাতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিরাট বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তাই ‘ডেইরি ফার্ম থেকে ব্যাপক আয়ের উৎস দুগ্ধ নয়,গোবর!- সফল মডেল গো-খামারী এলিজা খানের এ বক্তব্য বিশ্বের বিশেষজ্ঞ গুণীজন সমার্থিত, বাস্তব সম্মত ও সর্বজনস্বীকৃত।

এখানে মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.