উপ-সম্পাদকীয়


কোন পেশাই ছোট নয়, সব পেশাকে সম্মান করুন

মানুষের প্রয়োজনে দুনিয়ায় কত শত পেশা যে তৈরি হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই । দেখুন না, জুতা সেলাই থেকে জাহাজ তৈরি কিংবা টিকা তৈরি থেকে মহাকাশগমণ কত রকমফেরের পেশার মানুষ দরকার । এমনতর হাজারো ক্ষেত্র উল্লেখ করা যায় । বলা বাহুল্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই পেশার সাথে পেশার, পেশাজীবীর সাথে পেশাজীবীর নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে অর্থাৎ একটি ছাড়া অন্যটি অচল ।

মুচির জুতা সেলাইয়ের কথাই ধরুন, আগে দরকার জুতা- সুতা, গাম আরো কত কি। কিন্তু জুতা তৈরি হবে তো আবার চামড়া থেকে, চামড়া আসবে পশু থেকে, চামড়া প্রসেসে লবন দরকার। শুধু কি তাই ? জুতার জন্য প্রয়োজন ডিজাইন, মেশিন- ফ্যাকটরি আরো কত কি। দেখুন এক মুচির জুতা সেলাই এর জন্য কত কাহিনী ? দেখুন মুচির সাথে কত শিল্পের, কত ধরণের পেশাজীবী মানুষের নিবিড় যোগসূত্র। কোথায় মুচির জুতা সেলাই, আর কোথায় কৃষক, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার – এ যেন মশা মারতে কামান দাগা। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। তাই জাহাজ তৈরি কিংবা টিকা তৈরি বা মহাকাশগমন বলুন সকল ক্ষেত্রে বাস্তবতাটা এমনই।

আদিকাল থেকে শুরু করে সভ্যতা উৎকর্ষের সাথে সাথে পেশার সাথে পেশার, পেশাজীবীর সাথে পেশাজীবীর যোগসূত্র আরও ঘনিষ্টতর হয়েছে। প্রতিটি পেশাজীবী মানুষ তার নিজ পেশাকে (তার কাজকে) ভালবাসে, প্রিয় মনে করে- যা অবশ্যই ভালো দিক এবং যৌক্তিক। আবার এটাও ঠিক বিভিন্ন সময়ে পেশাজীবীরা তাঁদের নিজেদের স্বার্থে আন্দোলন সংগ্রাম করে, অন্য পেশার লোকদের সাথে হানাহানিতে লিপ্ত হয়। কিন্তু এক পেশার পেশাজীবী অন্য পেশার মানুষকে অসম্মানিত করে, ছোট করে এমন নীচতা উন্নত বিশ্বে কেন, আমাদের পিছিয়ে পরা এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোতেও বিরল ঘটনা।

এবার একটু স্বদেশের দিকে নজর ফেরাই ………

আমার পরিচিত এক বড় ভাই, তিনি বেশ মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। কিছুদিন পূর্বে বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, এই পোড়ার দেশে কিভাবে থাকি বল। আমার উৎসুক জিজ্ঞাসা কেন ভাই কি হয়েছে? তাঁর ক্ষোভমিশ্রিত উত্তর; শালার সব ফক্কিনির পুতেরা ইঞ্জিনিয়ার না হতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু সাইন্স না, আর্টস/কমার্স পড়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে যেভাবে ক্ষমতার দম্ভ দেখায়, আর ছড়ি ঘুরায় তাতে কেমন করে এখানে থাকি বল। আমি বললাম, ভাই দেশ ছাড়বেন কেন? আপনি ইঞ্জিনিয়ার, আপনি তো ইঞ্জিনিয়ার লাইনেই কাজ করছেন, অসুবিধা কি? অন্যরা ওনাদের লাইনে কাজ করছে, করুক না ? বড় ভাইয়ের ঝাঁঝাঁল উত্তর, মেধাহীনদের উন্মত্ত ক্ষমতার দম্ভ দেখার জন্য ইঞ্জিনিয়ার হইছি নাকি মিয়া ? আমি তাঁর ক্ষোভের মাত্রা দেখে আর কথা বাড়াই নাই।

আমার এক বন্ধু চোখের ডাক্তার, আমার সাথে আলাপচারিতা হয় প্রায়শই। এই কয়েকদিন আগে এক প্রসঙ্গে বলছিল- বন্ধু জান একজন ডাক্তার হতে কি পরিমাণ কষ্ট করতে হয়, কত টাকা খরচ করতে হয়, আমি মাথা নাড়লাম। আমার উত্তরে সে বোধ হয় খুশি হতে পারল না। আমাকে আহত করতে ক্ষোভের সুরে বলল, যারা মেডিক্যালে পড়ে নাই- তাদের পক্ষে ওসকল বুঝা দায়। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার নির্লিপ্ত ভাবে তাঁর ক্রোধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। সুযোগ বুঝে আমি বললাম, এই জন্যই আমাদের দেশে ডাক্তার সাহেবদের এতো ডিমান্ড। এমন কথায় সে ক্ষোভের ঝাঁপি খুলে শুরু করলো, বন্ধু জান তো মেধাবী ছেলে-মেয়রা ডাক্তার হয়? দেখ, ডাক্তাররা শহরের জৌলুস জীবন ত্যাগ করে গ্রামে-গঞ্জে যায়, কম ভিজিট নিয়ে রাতদিন রোগী দেখে, তবু ডাক্তারদের উপর মানুষের ক্ষোভের অন্ত নাই- যত সব অপদার্থ।

উত্তরে আমি জি দোস্ত বলে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলাম, আমার কথা কেঁড়ে নিয়ে ধমকের সুরে বলল- তোমার তো আবার খোঁচাখুঁচির স্বভাব আছে, দেখ বন্ধু, না বুঝে কথা বল না। আমি গলা ঝেড়ে বললাম, দোস্ত তোমাদের পেশাটাই তো মানবসেবার, তোমরা দিনরাত অনেক খাটছ বলে তোমাকে অভিবাদন। তবে দোস্ত, আমাদের দেশের শয়ে-শয়ে মানুষ কেন জানি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যায় একটু আধটু কাশি হলেও, কথিত আছে আমাদের উপজেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে সপ্তাহে দুইদিনও ডাক্তারের দেখা পায় না মানুষ (নিন্দুকে বলে উপজেলা সদরের ডাক্তাররা নাকি মাসে দুই /তিন দিন এসে সারা মাসের হাজিরা দিয়ে চলে যায় ঢাকা)। আমার বন্ধুর অসন্তোষ ভরা চোখ, আমি বললাম নিন্দুকেরা বলে আমাদের সরকারি ডাক্তাররা নাকি সরকারি হাসপাতালে বসে প্রাইভেট প্রাকটিস করে, কথিত আছে তাঁরা সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে তাঁদের প্রাইভেট প্রাকটিস করা হাসপাতাল / ক্লিনিকে ভর্তি করায়। আমি আরও কিছু বলতে উদ্যত হলে, আমার বন্ধু বলল দোস্ত আজ চলি, কাজ আছে।

সত্যি বলতে কি, প্রতিটি পেশার নিজস্ব কিছু নিয়মনীতি ও ধরণ আছে এবং ওই পেশার পেশাজীবীগণ পেশার ধরণ বুঝেই ওই পেশায় যান। পুলিশ বাহিনী কষ্ট করে রাতে -দিনে দেশের মানুষের নিরাপত্তা বিধান করবেন- এটাইতো স্বাভাবিক। ডাক্তার মহামারী কিংবা অন্য দুর্যোগে যথাসাধ্য পরিশ্রম করবেন- এটাইতো স্বাভাবিক।

শুধু পুলিশ- ডাক্তার নয় সকল পেশার মানুষের জন্য তাঁদের পেশার নিজস্ব নিয়মনীতি ও ধরণ মানাটাই তো তাঁদের কর্তব্য।
অনুরূপভাবে আরেকটি প্রসঙ্গে বলি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি পুলিশকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছাত্র পড়ান, দেখি কেমন হিম্মত। আবার বিমানের পাইলট যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে বলেন, বিমানের ককপিঠে বসে বিমান চালান, দেখি কেমন হিম্মত- এমন কথাগুলো সত্যি বলতে কি পাগলের প্রলাপ, তাই নয় কি?

ঠিক একইভাবে ইঞ্জিনিয়ার যদি ডাক্তারকে বলে, ইঞ্জিনিয়ার না হতে পেরে তোমরা ডাক্তার অথবা ডাক্তার যদি সাংবাদিককে বলে ডাক্তার না হতে পেরে তোমরা দুই টাকার সাংবাদিক- এতে যে শুধু ওই ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তারদের রুচিহীনতার প্রকাশ ঘটে তাই নয়, সমাজের দৈন্যতাও ফুটে ওঠে। দেশে কাঠমিস্ত্রির যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি প্রয়োজন রয়েছে রাজমিস্ত্রির। একথা মানতেই হবে সকল পেশাই সম্মানজনক, যদিও কোন কোন সময় কোন কোন পেশার পেশাজীবীরা অন্ধ অহমিকায় তা ভুলে যান- যা ওই পেশাজীবী/দের অজ্ঞতা-দৈন্যতা, ওই পেশার তাতে কিছু আসে যায় না ।

আমাদের দেশে ইদানীং একটি বিষয় খুব ন্যাকারজনক ভাবে দেখা যাচ্ছে, তাহলো ক্ষমতার দাপট। কিছু থেকে কিছু হলে সবাই নিজের বুদ্দ্বি-বিবেচনার তোয়াক্কা না করে তাঁর বাবা কে ছিলেন, মামা কে- কি করেন, জ্যাঠা কে- কি করেন বা কে কত বড় ক্ষমতার কাছাকাছি এই ভেদবুদ্বিহীন বাক্যের তুবড়ি ছোটান- যা দেশের মানুষের সামন্তবাদি মানসিকতার প্রতিফলন। আবার কিছু সুযোগ সন্ধানী লোক আছেন যারা ভেদবুদ্বিহীন অজ্ঞান লোকদের আক্রমন করতে গিয়ে সচেতনভাবে তাদের (ভেদবুদ্বিহীন অজ্ঞান লোকদের)বাবা-চাচা-মামা’র কীর্তিকে অবজ্ঞা করে এবং মনে মনে বিকৃত সুখ পায়।

সকলের প্রতি সকলের সম্মান অটুট থাকুক। সবাই নিজের পেশাকে সম্মান করার পাশাপাশি অন্যের পেশাকেও সম্মান করুক- তবেই দেশের মঙ্গল।