অর্থ-বাণিজ্যকরোনাবন্যাবিশেষ প্রতিবেদনশাহজাদপুরশিল্প ও সাহিত্য

পুঁজির যোগান দিতে না পারায় শতকরা ৭০ ভাগ তাঁত বন্ধ


করোনা ও বন্যায় শাহজাদপুরে লক্ষাধিক তাঁতী ও শ্রমিকের মানবেতর দিনযাপন

করোনা ও বন্যায় দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক তাঁত মহাজন ও শ্রমিকেরা মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। করোনা ও বন্যা ছাড়াও বৃষ্টিপাতজণিত কারণে পুঁজি সংকটে কারখানায় তাঁতবস্ত্র উৎপাদন বন্ধ, তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের সকল কাঁচামাল ও উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে বেঁচাকেনায় চরম মন্দাভাব, বিভিন্ন এনজিও, সুদখেকো সুদ ব্যবসায়ী, সমিতি ও ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বোঝা বহন, ক্রয়-ক্ষমতা হ্রাস, তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের নায্য মজুরি প্রাপ্তিতে বঞ্চিতসহ নানাবিধ কারণে শাহজাদপুর উপজেলার চির অবহেলিত, চির পতিত, চির অপাংক্তেয় প্রায় লক্ষাধিক তাঁত মহাজন ও শ্রমিকের বুক ফাঁটলেও মুখ ফোঁটেনা। এসব তাঁতী ও শমিকের বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদছে। দেখার কেউ নেই। নেই পাশে কেউ।
জানা গেছে, শাহজাদপুর উপজেলার পৌর এলাকাসহ ১৩টি ইউনিয়নে প্রায় দেড় লাখ তাঁত রয়েছে। তন্মদ্ধে প্রায় ১ লাখ পাওয়ারলুম ও প্রায় ৫০ হাজার হ্যান্ডলুম ও প্রায় ১ লাখ শ্রমিক রয়েছে। লকডাউন ঘোষিত সময়কালে শাহজাদপুরের সকল তাঁত কারখানা বন্ধ ছিলো। এ দীর্ঘ সময়ে এলাকার তাঁতীরা কোনরূপ তাঁতবস্ত্র উৎপাদন বা উৎপাদিত বস্ত্র হাট বাজারে বিক্রি করতে পারেনি। এ সময় বাধ্য হয়ে তাঁত মালিকেরা অনেকেই পুঁজি ভেঙ্গে ফেলেছেন আবার অনেকেই ঋণপানে জর্জরিত হয়েছেন। লকডাউন তুলে নেয়ার পর তাঁত মালিকেরা তাদের তাঁত কারখানা চালু করার অনুমতি পেলেও পরবর্তীতে পুঁজি না থাকায় তা চালু করা সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ ধারদেনা করে তাঁত কারখানায় বস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা করলেও উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র হাটে বিক্রি করতে না পেরে পুনরায় তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। গত কয়েক মাস ধরে বিরাজমান করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তীব্র পুঁজি সংকটে পড়ে এলাকার প্রায় ৬০ ভাগ তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে তাঁতী মহাজন। বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁত কারখানার হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে তারা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তার পরেও ‘মরার ওপর খারার ঘা’ এর মতোই চলমান করোনা সংকটের সাথে ভয়াবহ বন্যায় এলাকার অসংখ্য তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব কারখানার তাঁত শ্রমিকদের জীবনজীবীকার প্রশ্নে তারা চরম অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
শাহজাদপুর পৌর এলাকার রূপপুর নতুনপাড়া মহল্লার রাকিব উইভিং ফ্যাক্টরির মালিক হাজী ওমর, আজাদ উইভিং ফ্যাক্টরির মালিক আজাদ জানান,‘লকডাউনের পর থেকে হাজী ওমরের তাঁত কারখানার মোট ১৪টি পাওয়ারলুম ও ৪টি হ্যান্ডলুম এবং তার ভাই আব্দুস সালামের তাঁত কারখানার মোট ১০টি পাওয়ারলুম ও ৪টি হ্যান্ডলুম ও তাঁতী আজাদের আজাদ উইভিং ফ্যাক্টরির ৯টি পাওয়ারলুম ও ৩৭টি হ্যান্ডলুমে তাঁতবস্ত্র উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে লকডাউন তুলে নেয়া হলেও পুঁজি না থাকায় এ ৩ কারখানার সবগুলো তাঁতই বন্ধ রয়েছে।’ তারা আরও বলেন,‘শ্রমিকেরা কারখানায় কাজ করতে আসলেও লকডাউনের আগে মজুদকৃত তাঁতবস্ত্র হাটে বিক্রি করতে না পারায় শ্রমিকদের মজুরী দেয়া সম্ভব নয় বলে উৎপাদনে যেতে পারছি ন।’
শাহজাদপুর কাপড়ের হাট তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি আলমাছ আনসারী বলেন, ‘দীর্ঘ সময় উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শাহজাপদুর কাপড়ের হাটে লেনদেন বন্ধ থাকার পর লকডাউন তুলে নেয়ার পরও স্বাভাবিক মাত্রায় ব্যাপারী পাইকার হাটে না আসায় তাঁতীরা তাদের তাঁতবস্ত্র বিক্রি করতে পারছে না। এতে তাঁতীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়েছে।’
শাহজাদপুর তাঁত শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাঁতী ওমর ফারুক ও সাধারন সম্পাদক আল-মাহমুদ জানান, ‘করোনার সাথে বৃষ্টি-বন্যাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন উর্ধ্বগতিতে তাঁত শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যায় বৃদ্ধি, নায্য মজুরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত, ঋনের কিস্তির ঘানি টানাসহ বহুবিধ কারণে শাহজাদপুর উপজেলায় কর্মরত প্রায় ১ লাখ তাঁত শ্রমিকের সিংহভাগই অতিকষ্টে দিনযাপন করছে। ইতিমধ্যেই করোনা ও বন্যার প্রভাবে তীব্র পুঁজি সংকট সৃষ্টি হওয়ায় সিংহভাগ তাঁত কারখানার মালিকেরা চোখে মুখে রীতিমতো সর্ষের ফুল দেখায় তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। সইসাথে বেকার তাঁত মহাজন ও শ্রমিকদের সংখ্যাও উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে।’
বাংলাদেশ স্পেশালাইজ টেক্সটাইল মিলস এন্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স এসোসিয়েশনের পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হায়দার আলী জানান, ‘অতীতে দেশীয় তাঁতে তৈরি ঢাকাই মসলিন জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলো। বৃট্রিশ বোনিয়ারা মসলিন তৈরির পথকে চিরতরে রূদ্ধ করতে তাঁতীদের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করে। এরপর থেকে তাঁতশিল্পের গৌরব ও ঐতিহ্য ম্লান হতে থাকে। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁতশিল্প নতুন করে ঘুড়ে দাঁড়াতে শুরু করে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তাঁতীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প বেশ সম্ভাবনাময় শিল্পে উপনীত হয়। সারাদেশে তাঁতবস্ত্রের চাহিদা মিটিয়ে ভারত, ইংল্যাড, ইটালীসহ বর্হিঃবিশে^র বিভিন্ন দেশে তাঁতবস্ত্র রফতানীর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রচুর পরিমান বৈদশিক মুদ্রা অর্জিত হতে থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ক্রান্তিকালে ও ভয়াবহ বন্যার প্রভাবে এলাকার অসংখ্য তাঁতকারখানা বন্ধ থাকায় তাঁতীরা তীব্র পুঁজি সংকটে পড়ে। লকডাউন উঠে গেলেন পুঁজির যোগান দিতে না পারায় শাহজাদপুরের শতকরা ৭০ ভাগ তাঁত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেড় লাখ তাঁত মালিক ও শ্রমিকদের ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় কালো মেঘের ঘণঘটা।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড শাহজাদপুর বিসিক শাখার টিএফসি ব্যবস্থাপক মোঃ শরীফ আল মাহমুদ বলেন,‘করোনার প্রভাবে পূঁজি হারানো ২’শ ৭৯ জন প্রান্তিক তাঁতীর আবেদনের প্রেক্ষিতে তাঁতী প্রতি দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা ৫% সরল সুদে ৩ বছর মেয়াদে ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে, লক্ষাধিক প্রান্তিক তাঁতীর মধ্যে মাত্র ২’শ ৭৯ জন প্রান্তিক তাঁতীকে পুঁজির যোগান দেয়া হলে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে চলমান সংকট কতটুকু লাঘব হবে, তা নিয়ে এলাকার তাঁত মহাজন ও শ্রমিকেরা সংশয়ে পড়েছে।

একই বিভাগের সংবাদ

Back to top button
x
Close
Close
%d bloggers like this: