এখানে আমার লেখার যে ভাব আসে, তা অন্য কোথাও না -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য ‘সাজাদপুর’

শামছুর রহমান শিশির : ঊণবিংশ শতাব্দির বাংলা সাহিত্য গগণে ও বিশ্বের জ্ঞান পরিমন্ডলে ভারস্যাটাইল জিনিয়াস খ্যাত (বহুমূখী প্রতিভাসম্পন্ন) নোবেল জয়ী বিশ্ব কবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারী দেখাশোনার কাজে সাময়িকভাবে শাহজাদপুরের কাছাড়িবাড়িতে বসবাস করতেন। তিনি স্থায়ীভাবে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে থাকতেন। শাহজাদপুরে বসবাসকালে তিনি অসংখ্য দুর্লভ সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। কবিগুরু তাঁর স্বহস্তে লেখা একটি ছিন্নপত্রে উল্লেখ করেছিলেন, “এখানে (সাজাদপুরে) আমার লেখার যে ভাব আসে, অন্য কোথাও তা না।” এতেই শাহজাদপুরের মাটি মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি কবিগুরুর নিঃখাদ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অনুমান করা যায় । শাহজাদপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কবিগুরুর অনেক অম্লান স্মৃতিচিহ্ন! তারই একাংশ-
১). কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুরের কাছাড়িবাড়ি। এটি ইন্দো ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলিতে নির্মিত দ্বিতল ভবন। ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন নীলকর সাহেবরা। বর্তমানে ভবনটির নীচতলায় কবিগুরুর স্বহস্তে অঙ্কিত ও দেশি বিদেশি গুণীজনদের সাথে ওঠা চিত্রকর্ম সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আর দ্বো-তলায় কবিগুরুর ব্যবহার সামগ্রী, তৈজসপত্র, আসবাবপত্রসহ নানা সামগ্রীর সমাহারে ‘রবীন্দ্র স্মৃতি যাদুঘর’ এ রূপদানের চেষ্টা করা হয়েছে।
২). কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী, মৃত্যুবার্ষিকী পালনসহ নানা অসুষ্ঠান পালনের জন্য কাছারিবাড়ির অভ্যন্তরে সুবিশাল ‘রবীন্দ্র মিলনায়তন’ ।
৩). ‘তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’- কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে কবিগুরুর স্মৃতিধন্য তাল গাছ আজও কালের স্কাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
৪). কবিগুরুর স্মৃতিধন্য ছোটনদী স্থানীয়ভাবে খোনতারের জোলা হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে এ জোলা ব্যবহার করে কবিগুরু নৌপথে চলাচল করতেন। অযত্ন অবহেলায় জোলাটির প্রাণ রূদ্ধ হয়েছে বহু আগেই প্রভাবশালীদের দখলে।
৫). কাছারিবাড়ি অভ্যন্তরে নীলকরদের পরিত্যাক্ত নীলকুঠি। ইংরেজ শাসনামলে নীরিহ কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করতে এখানেই ধরে এনে অমামনবিক নির্যাতন করা হতো যা কালের বিবর্তনে সময়ের পরিধিতে ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
৬). কবিগুরুর কালজয়ী সৃষ্টি ‘রতন’ চরিত্রের রতনদের উত্তরসূরী পালকি বাহক শাহজাদপুরের আদিবাসী বাগদিরা।
৭). কবিগুরুর ব্যবহৃত কুঁপিবাতি ও সিলমোহর।
৮). কবিগুরুর স্বহস্তে অংকিত অসাধারণ তৈলচিত্রের একাংশ!
সাজাদপুরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারী তদারকিকালে এ অঞ্চলে গবাদী পশু লালন পালনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা অাঁচ করতে পেরে সুলতান ও হরিয়ানা থেকে বেশ কিছু উন্নতজাতের ষাঁঢ় সাজাদপুরে এনে স্থানীয় জাতের গাভীর সাথে ক্রস ঘটান। এরপর থেকেই এ অঞ্চলে উন্নতজাতের সংকর গাভীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গবাদিপশু লালন পালনের জন্য তিনি তার জমিদারী এলাকার ইটাখোলা, ভুরভুরা, কাওয়াক, হারনিসহ বিস্তৃর্ণ বাথান এলাকায় কয়েক হাজার বিঘা জমি স্থানীয় গো-খামারিদের কল্যাণে পাট্টার মাধ্যমে লিখে দেন (রবীন্দ্র স্বাক্ষরিত অর্ডার বুক)। পরবর্তীতে, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ অঞ্চলের বিশাল গো-সম্পদের ওপর ভিত্তি করে বাঘাবাড়ীতে মিল্কভিটা কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন।