ঈদ উপলক্ষে শাহজাদপুরের তাঁতপল্লী সরগরম; ব্যতিব্যস্ত তাঁতী- শ্রমিক

শামছুর রহমান শিশির : রোজার ঈদকে সামনে রেখে দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের তাঁতপল্লী সরগরম হয়ে উঠেছে। তাঁতী-শ্রমিকদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য আর ব্যতিব্যস্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের কর্মব্যস্ততা আর খটখট শব্দে মুখরিত ও প্রাঞ্জলিত হয়ে উঠেছে তাঁতসমৃদ্ধ এ জনপদ। তাঁতী ও শ্রমিকরা বাড়তি আয়ের জন্য হস্তচালিত ও বৈদ্যুতিক স্বয়ংক্রিয় তাঁতে তাঁতবস্ত্রের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। দেশে তাঁতে উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার চাহিদার সিংহভাগ তাঁতবস্ত্রই উৎপাদিত হয় শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জ জেলায়।এখানে উৎপাদিত তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার কদর রয়েছে গোটা দেশে ও দেশের বাইরে। সারা বছরের এ সময়ে দেশীয় তাঁতবস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা দেখা দেয়। আর সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে তাঁতী ও শ্রমিকরা বাড়তি একটু আয়ের জন্য কোমড়ব বেঁধে কাজ করে চলেছেন। তাদের কর্মব্যস্ততায় সরব হয়ে উঠেছে শাহজাদপুর উপজেলার তাঁতপল্লী অঞ্চল।
তাঁতীরা জানান, প্রতি বছরের এই সময় দেশে ও দেশের বাইরে শাহজাদপুরের তাঁতে তৈরী শাড়ি, লুঙ্গির ব্যাপক চাহিদা দেখা দেয়।
জানা গেছে, শাহজাদপুর পৌরসদরের রুপপুর, মণিরামপুর, পুকুড়পার, তালতলা, আইকবাড়ী পাড়কোলা, ইসলামপুর রামবাড়ীসহ পৌরসদরের বাইরে পোতাজিয়া ,হাবিবুল্লাহনগর, পোরজনা, কৈজুরী, খুকনী, জালালপুর, বেলতৈল, রুপবাটি ও গালা ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সচল তাঁত কারখানায় পুরোদমে তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের কাজ চলছে। স্থানীয় তাঁতীরা তাঁতবস্ত্র উৎপাদন করতে গিয়ে সারা বছরে ঋনপানে জর্জরিত হয়ে পড়েন। এ মৌসুমে তারা তাদের উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র বিক্রি করে সারা বছরের ঋণের অর্থ পরিশোধ করে থাকেন । এ জন্য এ সময় তারা অতি ব্যতিব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন।

তাঁতীরা জানান, রোজার ঈদকে সামনে রেখে শাহজাদপুর উপজেলার তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত প্রায় আড়াই লাখ তাঁতী, শ্রমিক নারী পুরুষ দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

অফসিজনের চেয়ে বর্তমানে তারা একটু বাড়তি উপার্জনের আশায় দিনরাত ওই অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।ঈদ এলেই আনন্দ আর খরচ বৃদ্ধির পালা। আর সেই বর্ধিত খরচের টাকার যোগান দিতেই তাঁতীরা কোমড় বেঁধে বাড়তি কাজ করছেন। তারা অফসিজনের তুলনায় বাড়তি পরিশ্রম করলেও বাড়তি আয়ের কথা মনে করে ,ঝিমিয়ে না পড়ে অতিরিক্ত পরিশ্রমেও ক্লান্তবোধ করছেন না। কারণ, অতিরিক্ত আয়ের অর্থ দিয়ে ঈদে তাদের পরিবারের সদস্যসহ প্রিয়জনদের নতুন জামা কাপড় কিনে দেবেন। আর ঈদের দিনে পায়েশ পোলাও ফিরনিসহ সবাইকে নিয়ে একটু ভালো খেতে বাড়তি আয়ের এ অর্থ ব্যয় হবে। তারা জানিয়েছে, এতেই তাদের সুখ ,এতেই তাদের শান্তি। এই সুখ শান্তি ভাগাভাগি করে নিতে তারা এই বাড়তি পরিশ্রমে মেতে উঠেছেন। প্রতিবছর মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরী বাহারী ডিজাইনের ও মনকাড়া রঙের শাড়ি, লুঙ্গি,গামছাসহ নানা ধরনের তাঁতবস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ সময় তাঁতবস্ত্রের চাহিদা ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত বেশী দেখা যায়। শাহজাদপুর উপজেলায় উৎপাদিত তাঁতের শাড়ি লুঙ্গি দেশের মোট চাহিদার ৪০ ভাগ পূরণ করে আসছে। এ চাহিদা পূরণে শাহজাদপুর উপজেলার পৌরএলাকা সহ ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় অধিকাংশ গ্রামে ছোট বড় অসংখ্য তাঁত কারখানা রয়েছে। তাঁতের সংখ্যা প্রায় লাখ খানেক হবে। এর মধ্যে পিটলুম, হ্যান্ডলুম, পাওয়ারলুম রয়েছে। এসব তাঁত কারখানায় সম্পৃক্ত থেকে প্রায় আড়াই লাখ তাঁতী ও শ্রমিক জীবীকা নির্বাহ করছেন। এর মধ্যে লক্ষাধিক শ্রমিক সরাসরি তাঁত বুনোনের কাজে নিয়োজিত। বাকিরা সূতা রঙ, জ্যাকেট ডিজাইন তৈরী, সূতা পারি, চরকা কাটা , সানা বও তৈরী, কাপড় ভাঁজ করা, কাপড় লেবেলিং করা , হাটবাজারে কাপড় পৌঁছে দেয়া, কাপড় বিক্রিসহ নানা কাজ করে থাকেন। তাঁতের শাড়ি লুঙ্গির সূতা ডাইং প্রসেসিং করার জন্য ২০টির মত ছোট বড় ডাইং প্রোসেসিং মিল ও অর্ধশত সূতা রঙ করার কারখানা রয়েছে। তাঁতের সূতার চাহিদা পূরণের জন্য শাহজাদপুরের হাট বাজারে প্রায় ২ শতাধিক পাইকারী ও খুচরা সূতার দোকান রয়েছে। এছাড়া তাঁতের তৈরি শাড়ি, লুঙ্গি,গামছা বিক্রির জন্য শাহজাদপুরে দেড় শতাধিক কাপড়ের আড়ৎ ও প্রায় দশ হাজার তাঁতের শাড়ি ও লুঙ্গি বিক্রির পাইকারী ও খুচরা দোকান ও শো-রুম রয়েছে। সপ্তাহের দুই দিন রোববার ও বুধবার শাহজাদপুরের দ্বারিয়াপুর বাজারে তাঁতের শাড়ি লুঙ্গি বিক্রির সর্ববৃহৎ হাট বসে। এ হাটে দেশের প্রায় সকল স্থান থেকে পাইকার আসে তাঁতের শাড়ি লুঙ্গি কিনতে। ফলে এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আড়াই লক্ষ নারী পুরুষ কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করছেন। শ্রমিকের গড় আয় ১’শ ৫০ থেকে ২’শ টাকা। তাদের আয়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবাদিসহ আনুসাঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ করা শ্রমিকদের পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়েছে। দিন দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধিতে তাঁত শ্রমিকরা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। কারণ, পন্যের দাম বাড়লেও তাদের মজুরী বাড়ছে না। আর যে শ্রমিক দিনে দুইটি কাপড় বুনতে পারেন তার পক্ষে তিনটি কাপড় বুনন সম্ভব হচ্ছেনা। এ জন্য সার্বিক দিক বিবেচনায় একটু বাড়তি আয়ের জন্য তারা সবাই একটু বেশী সময় ধরে ঈদের বেচাকেনা উপলক্ষে তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা তৈরীতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাঁতসমৃদ্ধ শাহজাদপুরের তাঁতপল্লী দিনে রাতে কর্মব্যস্ততায় সরগরম হয়ে উঠেছে। নাওয়া খাওয়ার সময় এদের হাতে এখন নেই। গভীর রাত জেগে এরা এ কাজ করছে। এ কাজে বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও বড়দের কাজে সহযোগীতা করছে। ফলে ছোট বড় সবাই তাঁতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাঁতীরা জানিয়েছে, বাজারে সূতা, রঙসহ অন্যান্য কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তাঁত শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি পায়নি। এমনকি তাঁতে তৈরি শাড়ি লুঙ্গির দামও বৃদ্ধি পায়নি। তাই স্বল্প আয় আর অল্প মজুরি বাড়াতে তাদের বেশী বেশী পরিশ্রম করতে হচ্ছে!