ঈদ উপলক্ষে শাহজাদপুরের ডাইভারসিফিকেশন শাড়ি দেশব্যাপী চমক সৃষ্টি করেছে

শামছুর রহমান শিশির, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে : ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু শাহজাদপুর পৌরসদরে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ তাঁত কাপড় বিক্রয়ের হাটে ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ বাংলাদেশ তাঁত গবেষণা কেন্দ্রের তাঁতজাত পণ্যের ডাইভারসিফিকেশন এর মাধ্যমে উৎপাদিত রং-বাহারি শাড়ী ও ড্রেস মেটেরিয়াল। রাজধানীর নামী দামী ষ্টোর থেকে শুরু করে দেশের সকল জেলা উপজেলার শহরের অলিতে গলিতে ভারতীয় সিনথেটিক শাড়ী ও সালোয়ার কামিজে যখন বাজার সয়লাব ঠিক সেই মুহুর্তে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বস্ত্রের বাজার হটাতে বাংলাদেশের বাজারে তাঁত গবেষণা কেন্দ্রের সহায়তায় তাঁতজাত পণ্যের ডাইভারসিফিকেশনের মাধ্যমে এলাকার তাঁতীদের তৈরী শাড়ী, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা ও পাঞ্জাবী দেশের ক্রেতাদের আশানুরূপ সারা জাগিয়েছে।পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকায় বাজারের চাহিদা পুরন করতে ব্যার্থ হচ্ছে তাঁতীরা। পলি-য়েষ্টার, পলি-প্রপাইলিং,পলি-এ্যামাইড,পলি-নোসিক, নাইলন ও এক্রেলিক বেজ্ড ম্যান মেইড ফাইবারগুলোকে ফেন্সি ইয়ার্ন হিসেবে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে ফিউশন করে কৃত্রিমতন্তু উদ্ভাবিত হাজারো রকমের ইয়ার্ন ছাড়াও মেটালিক ইয়ার্ন (জড়ি) ও ফেন্সি ইয়ার্ন দ্বারা তৈরী এ শাড়ী ও ড্রেস মেটেরিয়াল হস্তশিল্পীদের হাতের বিভিন্ন অলংকরনের মাধ্যমে চাকচিক্যময় ভাবে তৈরী করা হয়েছে। তুলনামুলকভাবে তৈরী এ শাড়ী ও ড্রেস মেটেলিয়ালগুলোর মূল্যও যেমন কম তেমনি টেকসইও বটে। এ ছাড়াও এ কাপড় ধোলাই ও ইস্ত্রি করাও সম্ভব। সে কারনের ক্রেতাদের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা ও কদর ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। আজ বুধবার শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে আগত কাপড় প্রস্তুতকারী বেশ কয়েকজন তাঁতী জানান,‘এ ধরনের ম্যানমেইড ইয়ার্ন দ্বারা তৈরী প্রতিপিস শাড়ির সর্ব্বনিম্ন মূল্য ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, জ্যাকার্ড ডিজাইনসহ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং সর্ব্বোচ ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে হস্তশিল্পীদের কারুকার্য মূল্য যোগ হয়ে এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে।’ এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তাঁত গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক মি. মোবারক হোসেন সরকার জানান, ‘বিগত এক দশকে ভারতে ম্যানমেইড ফেন্সি ইয়ার্ন তৈরীর ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। সে ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। ভারতে গবেষণার মাধ্যমে প্রতিবছর কোন না কোন নতুন ম্যান মেইড ইয়ার্ন বাজারে চালু হচ্ছে। ভারতে এ ধরনের ফাইবার বা ইয়ার্ন ম্যানমেইড ফেন্সী ইয়ার্ন হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে এগুলোকে সিনথেটিক সুতা বলো হয়ে থাকে। বাংলাদেশে নন-কটন,নন-সিল্ক বেজ্ড ফাইবার বা ইয়ার্ন নিয়ে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন। সরকারকে তাঁতশিল্প রক্ষায় গবেষণার কাজে এগিয়ে আসতে হবে।’এদিকে, উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁত গবেষণা কেন্দ্রের তাঁতজাত পণ্যের ডাইভারসিফিকেশন এর মাধ্যমে উৎপাদিত রং-বাহারি শাড়ি ও ড্রেস মেটেরিয়াল ইতিমধ্যেই চমক সৃষ্টি করেছে। সল্প সময়ের মধ্যেই দেশে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন,বাহারী ডিজাইনের শাড়ি ও ড্রেস মেটেরিয়াল তাঁতবস্ত্র ব্যাপক সমাদৃত হওয়ায় দেশের তাঁতবস্ত্রের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা ও গ্রহনযোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত চাহিদার বিপরীতে অপেক্ষাকৃত অনেক কম পরিমানে উৎপাদিত হচ্ছে। ভারতীয় সিনথেটিক শাড়ি ও কামিজের পরিবর্তে দেশের এ ধরনের তাঁতবস্ত্র ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারতসহ বহিঃর্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বস্ত্র গবেষণা কেন্দ্রে ব্যাপকভিত্তিতে পরীক্ষা নীরিক্ষা অন্তে প্রতিনিয়ত বস্ত্রের মান্নোনয়ন ও আধুনিকায়ণের মাধ্যমে তাদের দেশে উৎপাদিত বস্ত্র বিশ্ববস্ত্রের বাজারে ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা ও চাহিদা সৃষ্টি করছে। আমাদের দেশে উৎপাদিত বস্ত্রের মান বহিঃর্বিশ্বের কোন দেশের তুলনায় কোন অংশে কম নয়। দেশের সর্ববৃহৎ কুটিরশিল্প, যে শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে কোটিরও উপরের জনমানুষ সেই ঐহিত্যবাহী তাঁতশিল্পকে বিশ্ববাজারে দেশের তৈরি বিশ্বখ্যাত ‘মসলিন’-এর মতো সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং তাঁতশিল্পকে আধুনিকায়ণে, সুরক্ষায়, গবেষণা কাজে সরকারিভাবে ব্যাপক ভিত্তিতে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। আর সরকার এ গবেষণা কাজে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করলে এক সময়ের মসলিনের মতো বা তার চাইতেও উন্নত ধরনের,দৃষ্টিনন্দন বাহারী ডিজাইনের প্রসিদ্ধ শাড়ি প্রস্তুত করা দেশের আত্মনিবেদিত তাঁতীদের পক্ষে মোটেও অসম্ভব কিছু হবে না বলে অভিজ্ঞ মহল জানিয়েছেন।