অপরূপ সাজে সেজেছে শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ি

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ আগামী মঙ্গলবার রবি কবির ১৫৭তম জন্ম তীথি। এ উপলক্ষে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারি বাড়িকে সাজানো হয়েছে নব সাজে। আল্পনায় ভরে গেছে কাছারিবাড়ি অঙ্গণ। আলোক সজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে কাছারিবাড়ির মূল ভবন সহ আশপাশ এলাকা। তোরণে তোরণে ছেয়ে গেছে গোটা শাহজাদপুর। হাইস্কুল মাঠে বসানো হয়েছে গ্রামীণ মেলা। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন ৮ ও ৯ মে এ দুইদিন ব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। চলছে শেষ বারের মত অনুষ্ঠান মালার রিহার্সেল। তাই বাংলা সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুর কাছারি বাড়ি হয়ে উঠেছে উৎসব মুখর।
স্থানীয়রা জানান, বিশ্বকবির নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে শাহজাদপুরের এই কাছারি বাড়ীতে। আর তাই তো দেশÑবিদেশ থেকে প্রতিদিন রবি ভক্তরা ছুটে আসে রবীন্দ্র কাছারি বাড়িতে। তাদের পদ চারণায় প্রতিদিন মুখর হয়ে ওঠে শাহজাদপুরের এই কবির স্মৃতি ধন্য কাছারিবাড়ি। কবির ১৫৭তম জন্ম তীথিকে ঘিরে প্রতিদিন এখানে পর্যটকদের আগমন বেড়ে গেছে। কলকাতার বিখ্যাত জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্ম নেয়া এই কবি ৩০ বছর বয়সে বিলেত থেকে লেখাপড়া শেষ করে ফিরে (১৮৯০Ñ৯৬) সালে জমিদারী তদারকির জন্য ছায়াছন্ন খালবিলে ভরা পূর্ব বাংলার অনেকাংশ শিক্ষা সভ্যতা বিবর্জিত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আসেন। তিনি সাধারণত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ হয়ে নৌকা যোগে শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরে আসতেন। এর পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর নাটোরের রাণী ভবানীর নিকট থেকে তের টাকা দশ আনায় শাহজাদপুরের জমিদারী কিনে নেন।
আর এই জমিদারী দেখা শুনার জন্যই ১৮৯০-৯৬ সাল পর্যন্ত শাহজাদপুরে নিয়মিত আসা যাওয়ার পাশপাশি এখানে সাময়িক ভাবে বসবাস করেছেন। এর পূর্বে রবীন্দ্র কাছারিবাড়ির দুটি ভবন ছিল ইংরেজ নীলকর সাহেবদের। নীলকর সাহেবরা ইন্দোÑইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীতে এখানে দুটি ভবন নির্মাণ করেন। এর মধ্যে পশ্চিমের ভবনটি একতল ও পূর্ব দিকের ভবনটি দ্বিতল। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার নির্যাতনের স্বাক্ষী কাছারিবাড়ির পশ্চিমের ভবনটিতে কখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যাওয়ার কথা শোনা যায়নি। আর পূর্ব আঙ্গিনার দ্বিতল ভবনটিতে রবীন্দ্রনাথ এসে থাকতেন। বর্তমানে এ ভবনটিই রবীন্দ্র স্মৃতি যাদুঘর হিসেবে পরিচিত।
কবি জীবনের নানা স্মৃতি আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে সংরক্ষিত আছে এই জাদুঘরে। শাহজাদপুরে অবস্থানকালিন সময়ে কবি এর প্রকৃতি, পরিবেশ, ঘটনা প্রবাহ নিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান রচনা করেছেন যা রবীন্দ্র সাহিত্য ভান্ডার প্রমান করে। শাহজাদপুরে বসে তিনি “সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, পঞ্চভূতের ডায়েরী, ছিন্নপত্র, সমাপ্তি, তত্ত্ব ও সৌন্দর্য্য, মানসী, অসময়, শেষ কথার মতো উলে¬খযোগ্য গ্রন্থ্য রচনা করেছেন। যদিও বিশ^ কবি শিলাইদহ ও পতিসরের চেয়ে শাহজাদপুরে কম সময় অবস্থান করেছেন তবুও শাহজাদপুরের যমুনা, বড়াল, হুরাসাগর, করতোয়া,গোহালা,ধলাই, ইছামতি নদী রবীন্দ্র সাহিত্যের বিশাল স্থান দখল করে আছে। এখানে রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত খাট, পালকি, খরম জুতা, চশমা, তোষক, চেয়ার , পানির ট্যাপ, টেবিল , আলনা, ড্রেসিং টেবিল, থালা, বাসন, বদনা সহ নানা সামগ্রী।
১৯৬৯ সালে এই কাছারি বাড়ীকে পরিছন্ন করে সরকার প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষনের উদ্যোগ নেয়। এবং ১৯৯৯ সালে কাছারিবাড়ির পশ্চিম আঙ্গিনায় ৫০০ আসন বিশিষ্ট উত্তর বঙ্গের সবচেয়ে নান্দনিক অডিটরিয়াম নির্মাণ করে। প্রতি বছর ২৫,২৬,২৭ বৈশাখ কবির জন্মবার্ষিকী সরকারি ভাবে উদযাপন করা হলেও এ বছর একদিন কমিয়ে দুইদিন করা হয়েছে। এর ফলে কবির ভক্ত অনুরাগীরা অনেকটাই হতাশ হয়েছেন। এ ব্যাপারে নবাগত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নাজমুল হুসাইন খাঁন জানান, দুইদিন ব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজক সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন। তাই আমার পক্ষে বলা সম্ভব না কি কারণে দুইদিন ব্যাপী অনুষ্ঠান মালার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতি বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৫, ২৬ ও ২৭ বৈশাখ তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠান মালার পাশাপাশি বসে গ্রামীণ মেলা। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবি ভক্তরা ভীড় করে কবির কাছারিবাড়িতে। বর্তমানে কাছারিবাড়িটি আধুনিকতার আবহে বাহারী গাছ ও ফুলের সমারোহে সুসজ্জিত করার ফলে পর্যটকদের দারুন ভাবে আকৃষ্ট করে।
এই রবীন্দ্র কাছারিবাড়িকে কেন্দ্র করে শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবীতে এখানকার মানুষ দীর্ঘ আন্দোলন শুরু করলে তাদের দাবীর মুখে সরকার রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ নামে শাহজাদপুরে বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেয়। গত ১৭ এপ্রিল থেকে শাহজাদপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের নব নির্মিত একটি ভবনে অস্থায়ীভাবে এ বিশ্ব বিদ্যালয়ের ক্লাসও শুরু হয়েছে। অচিরেই শাহজাদপুরের বাথান এলাকায় কবির জমিদারির নিজস্ব ভূমিতে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এর দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস নির্মাণ কাজ শুরু হবে । সেই আনন্দে ভাসছে শাহজাদপুরবাসী।